আলোকিত গ্রাম গড়ছে ওরা ১৩ জন

আপডেট : ০৫ জুলাই ২০১৩, ১৮:০৫
সৈয়দপুরের পার্শ্ববর্তী কিশোরীগঞ্জের গাড়াগ্রাম ইউনিয়নের পূর্ব দলিরাম গ্রাম। দেখতে আর দশটা সাধারণ গ্রামের মতোই। তবে এই গ্রামের বিশেষত্ব অনেক। এই গ্রামের স্কুলে যাওয়ার উপযোগী প্রতিটি শিশুই স্কুলে যায়, প্রতিটি বাড়িতে স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা ব্যবহার করা হয়, শিশুরা যে কোনো কাজের আগে ও পরে ভালো করে হাত ধুয়ে নেয়। অসহায়-অসামর্থ্যকে সহায়তা করা হয়। তবে এ অভ্যাস একদিনে তৈরি হয়নি। এর পেছনে রয়েছে গ্রামের ১৩ জন তরুণের মেধা ও শ্রমের সম্মিলিত প্রচেষ্টা। প্রতিটি উপযোগী শিশুকে স্কুলগামী করা, স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা ব্যবহার নিশ্চিতকরণ, শিশুদের ভালোভাবে হাত ধোয়া শেখানোর পাশাপাশি অসহায়-দুস্থদের পাশে দাঁড়ানো এবং বাল্য বিবাহ রোধে বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন ওই ১৩ তরুণ। সরেজমিনে জানা গেছে, উপজেলার গাড়াগ্রাম ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ডের পূর্ব দলিরাম গ্রামের মিশুক, রিগান, ইমাম, মিশন, রিমন, রিয়ন, আল-আমিন, ইমাম, জাকির, লায়ন, মিলু, সাইফুল ও রাকিব মিলে ২০১০ সালে স্থাপন করেন শ্রম কল্যাণ পাবলিক পাঠাগার। সপ্তাহের প্রতি শুক্রবার সন্ধ্যায় পাঠাগারের সদস্যরা উপস্থিত থেকে বিভিন্ন পরিকল্পনা নিয়ে নিজেরা আলাপ- আলোচনা করেন। সবার সম্মতিতে গৃহীত হয় কর্মপরিকল্পনা। তারা গ্রামের বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, স্কুলে যাতায়াত বিষয়ে খোঁজ-খবর নেন। এছাড়া হতদরিদ্র পরিবারের সন্তানদের লেখাপড়া নিশ্চিত করতে বিনামূল্যে কোচিং প্রদান, শিক্ষা খরচ বহন করা হয়ে থাকে পাঠাগারের পক্ষ থেকে। আলাপকালে পাঠাগারটির সভাপতি ও বর্তমানে নওগাঁ পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটে দ্বিতীয় সেমিস্টারের ছাত্র তৌফিকুল ইসলাম মিশুক জানান, তাদের আলোকিত যাত্রার শুরুর কথা। তিনি জানান, তারা সবসময়ই কিছু একটা করার চিন্তা করতেন। এক পর্যায়ে পাঠাগার প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত হয়। তাদের সাহায্য করতে সবার আগে এগিয়ে আসেন গ্রামের বড় বোন মুক্তা আপা। তিনি পাঠাগারে বই রাখার জন্য একটি র্যাক দেন। এরই ধারাবাহিকতায় তারা ১৩ জন শ্রমিক সেজে গ্রামে বিভিন্ন জনের জমির ধান কেটে ১৩ হাজার টাকা সংগ্রহ করেন। পরে সাইকেল যোগে রংপুর শহর থেকে ওই টাকায় বই কিনে পাঠাগারের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করেন। পাঠাগারের উদ্বোধন করেন তাদের শিক্ষক ফজলুল হক। পাঠাগারের সাধারণ সম্পাদক ও নীলফামারী সরকারি কলেজের অনার্স পড়ুয়া ইমাম হোসেন জানান, শুরুটা ১৩ জন দিয়ে হলেও পাঠাগারে বর্তমানে সদস্য ৭০ জনের মতো। সদস্যদের কাছ থেকে মাসিক ১০ টাকা হারে চাঁদা নিয়ে সঞ্চিত টাকায় পাঠাগার উন্নয়নের পাশাপাশি স্থানীয় দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের শিক্ষা ব্যয়, দুস্থদের সাহায্য, বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা উপকরণ বিতরণ ছাড়াও ঈদ উত্সবে হতদরিদ্র পরিবারগুলোর মাঝে সেমাই চিনি দেয়া হয়। এছাড়াও লেখাপড়ায় উত্সাহ বাড়াতে গ্রামের কৃতী শিক্ষার্থীদের দেয়া হয় সংবর্ধনা। এবার ২০ জন শিক্ষার্থী প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনীতে ভালো ফলাফল করায় তাদের সংবর্ধনা দেয়া হয়েছে। পাঠাগারের সদস্যরা জানান, প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত পাঠাগার খোলা থাকে। তবে নিজস্ব জায়গা না থাকা, পাঠাগারে বসার ব্যবস্থা অপ্রতুল, পর্যাপ্ত বই না থাকা সর্বোপরি আর্থিক সঙ্কটের কারণে পাঠাগারটি দাঁড়াতে পারছে না পূর্ণাঙ্গভাবে। সরকারিভাবে চলতি বছরের ১৯ ফেব্রুয়ারি গণগ্রন্থাগার থেকে পাঠাগারটি নিবন্ধিত হয়। পাঠাগার সদস্যদের প্রশিক্ষণ, যুব ফোরাম গঠন এবং এলাকার বাল্য বিবাহ রোধে সহায়তা ও পরামর্শ দিচ্ছে স্থানীয় উন্নয়ন সংস্থা আরডিআরএস। স্থানীয়ভাবে শিক্ষা প্রসার, রাস্তাঘাট পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা রাখাসহ আর্ত-মানবতার সেবায় আলোর পথ দেখাচ্ছে শ্রম কল্যাণ পাবলিক পাঠাগার। সংশ্লিষ্ট ও শুভাকাঙ্ক্ষী সবার প্রত্যাশা ১৩ অদম্য তরুণের এই মহত্ উদ্যোগকে আরো এগিয়ে নিতে সমাজের বিত্তবানরা এগিয়ে আসবেন।