প্রবল বৃষ্টির দিনে মুম্বাইয়ের সবজির দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে এক হাতে ছাতা এবং অন্য হাতটি দিয়ে নববিবাহিত স্ত্রী শ্রাদ্ধা মেশারামকে জড়িয়ে ধরে রেখেছিলেন ভিশাল নালাওয়াদে। মাত্র তিন মাস আগে বিয়ে করা এ দম্পতি বৃষ্টি কমার পর যা শোনাচ্ছিলেন, তাতে মন খারাপ না হয়ে উপায় নেই, পরিবারের সঙ্গে তাদের কোনো যোগাযোগ নেই। কেউ তাদের দেখতে আসে না। এমনকি টেলিফোনে পর্যন্ত খোঁজখবর নেয় না। আসলে উভয়ের পরিবারের কেউই তাদের বিয়েটা মেনে নেয়নি। এর একমাত্র কারণ, তারা ভিন্ন জাতিবর্ণের। এই তথাকথিত অপরাধে তাদের বিয়েতে কোনো আনুষ্ঠানিকতা ছিল না; রেজিস্ট্রি অফিসে বিয়ের কাজ সম্পন্ন হয়েছিল গুটিকয়েক শুভাকাঙ্ক্ষীর উপস্থিতিতে। এ নিয়ে এখনো আফসোস করেন ভিশাল ও শ্রাদ্ধা।
ভিশাল ওয়েভ ডেভলপার এবং শ্রাদ্ধা একটি বেসরকারি অফিসের গণসংযোগ শাখায় কাজ করেন। কিন্তু বিয়ের প্রসঙ্গ আসার এই যোগ্যতা উভয় পরিবারের কেউ কানে তোলেনি, বিশেষত শ্রাদ্ধার পরিবারের লোকজন। তারা চেয়েছিল, তাদেরই মতো উচ্চ বর্ণের কোন পাত্রের সঙ্গে বিয়ে দিতে। ভিশাল ও শ্রাদ্ধার মতো ভুক্তভোগীর সংখ্যা ভারতে অসংখ্য। কিন্তু এ সমস্যা আস্তে আস্তে দূর হচ্ছে। বর্ধিষ্ণু মধ্যবিত্ত শ্রেণির লোকজন জাতিবর্ণ প্রথাকে দেখতে শুরু করেছে ভিন্ন চোখে। ইনস্টিটিউট ফর ইমার্জিং মার্কেট স্টাডিজ-এর প্রাক্কলন অনুসারে, ভারতে ২০৩০ সালে মধ্যবিত্ত শ্রেণির লোকসংখ্যা দাঁড়াবে ৪৭৫ মিলিয়ন আর ২০২৭ সাল নাগাদ ভারতের মধ্যবিত্ত শ্রেণিই হবে পৃথিবীর সর্ববৃহত্। সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল দেশের সবচে’ অবহেলিত মানে নিম্নবর্ণের লোকজনের কাছে কতোটা পৌঁছাচ্ছে এ নিয়ে অবশ্য বিতর্কের অবকাশ রয়েছে। কিন্তু বাস্তব তথ্য হচ্ছে, পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগতে শুরু করেছে।
অসমতা দূর করার লক্ষ্যে ভারত জুড়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিম্নবর্ণের ছাত্রদের জন্য সিট রিজার্ভ রাখার ব্যবস্থা চালু রয়েছে অনেক বছর ধরে। কোটা পদ্ধতি চালু রয়েছে সরকারি চাকরির ক্ষেত্রেও। এখন দাবি উঠেছে, বেসরকারি চাকরির ক্ষেত্রেও কোটা পদ্ধতি চালু করার। এমন সুযোগ পেয়ে উঠে আসছে অস্পৃশ্যরা। সরকারি উচ্চ পদেও এখন নিযুক্ত রয়েছেন নিম্নবর্ণের লোকেরা। ফলশ্রুতিতে তাদেরও ভাগ্যোন্নয়ন ঘটছে। ভারতের বিশাল মধ্যবিত্ত শ্রেণির অনেকের কাছে জাতপাতের বিষয়টি এখন আর বড় কোনো ব্যাপার নয়। এ প্রসঙ্গে ইউনিভার্সিটি অফ মুম্বাইয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপিকা গীতা চান্দা বলছিলেন, ‘সংরক্ষণ নীতির সুফল এখন পর্যন্ত নিম্নবর্ণের সবাই ভোগ করতে পারছে না। এ জন্য সময় লাগবে। তবে সেদিন বেশি দূরে নয়, যখন বর্ণের ভিত্তিতে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিভাজনের সুযোগ আর থাকবে না।’ গবেষণায় দেখা গেছে, ভারতে নিম্নবর্ণের লোকজনের মধ্যে খুব কম জনেরই নিজস্ব ব্যবসা রয়েছে। কিন্তু এমন লোকের সংখ্যাটা ইদানীং বাড়তে শুরু করেছে। শচিন সিনধে এমন একটি জাতিবর্ণের প্রতিনিধি, যা তাকে কয়েক দশক আগে বাধ্য করেছিল মুচি পেশা গ্রহণে। এখন তিনি বেশ সচ্ছল। দুটি ওয়ার্কশপ রয়েছে তার। সেখানে নিয়োগ দিয়েছেন গোটা বিশেক লোককে। বিলাসবহুল হোটেলের জন্য তার কারখানায় তৈরি হয় মানিব্যাগ, বেল্ট ও জুতা।
নিম্নবর্ণের বাধা শচিন সিনধের মতো উদ্যোক্তাদের রুখতে পারেনি। তারা ঠিকই চালু করেছেন নিজস্ব ব্যবসা। বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে না হয় তার মুখের কথাটাই শুনি, ‘যখন আমি ব্যবসার জন্য ক্লায়েন্টদের কাছে যাই, তখন কেউ আমার জাতিবর্ণ নিয়ে কেউ কোনো প্রশ্ন করে না। তারা শুধু আমার উত্পাদিত সামগ্রীর গুণগত মান দেখতে চায়। মান ঠিক তো সব ঠিক। অন্য কোনো প্রসঙ্গে যাওয়ার সময়ই থাকে না তাদের।’ অথচ জীবনের প্রারম্ভে দারুণ বৈষম্যের শিকার হয়েছিলেন তিনি। শিক্ষাঋণ নিয়ে বিদেশে পড়াশোনার জন্য ব্যাংকের দ্বারস্থ হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ব্যাংক থেকে তাকে বলে দেয়া হয়েছিল, তার মতো নিম্ন জাতিবর্ণের লোক এমন ঋণ প্রত্যাশা করতে পারে না। তা সত্ত্বেও দমে যাওয়ার পাত্র ছিলেন না শচিন। অন্যভাবে ব্যবস্থা করে ঠিকই তিনি বিজনেস ম্যানেজমেন্টে বিদেশি ডিগ্রী অর্জন করেন। তার স্বপ্ন রয়েছে বড় ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠা করার। ভারতের চ্যাম্বার অফ কমার্সগুলো এখন নিম্নবর্ণের উদ্যোক্তাদেরকে বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত করে। অর্থমন্ত্রী পি. চিদাম্বরম নির্দেশ দিয়েছেন, প্রত্যেকটি ব্যাংকের শাখাকে অন্তত এতজন নিম্নবর্ণের উদ্যোক্তার ঋণ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে। বিয়ের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন ঘটছে, ভারতের সর্ববৃহত্ ম্যাট্রিমনিয়াল ওয়েবসাইট সাদি ডট কমের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তাদের ৫০ শতাংশ গ্রাহকই ‘অসম বর্ণে আপত্তি নেই’ এ ঘরটিতে ক্লিক করছেন। ভিশাল সত্, পরিশ্রমী এবং ভালো চাকরি করে— এসব দেখেই শ্রাদ্ধা তার প্রেমে পড়েছিলেন। তার মতে, দশ-বিশ বছর পর জাতিবর্ণের ভিত্তিতে কাউকে আর মূল্যায়ন করা হবে না। সবাই পরিচিত হবে তার কর্মের দ্বারা।
— ইন্টারন্যাশনাল হেরাল্ড ট্রিবিউন অনুসরণে
