পবিত্র মাহে রমজান আসন্ন। রমজান মাসে অনেকে অসুস্থতা সত্ত্বেও পবিত্র রোজা পালন করে থাকেন। এছাড়া অনেক সুস্থ ধর্মপ্রাণ মুসলমান রোজা পালনকালে অনেক সময় অসুস্থবোধ করেন। অনেকে আবার ইফতার ও সেহেরীতে আহারের সময় অপরিকল্পিতভাবে খাদ্য নির্বাচন করেন। এসব ক্ষেত্রে রোজাদারগণের সমস্যা হয়। তাই সকল রোজাদারগণ যাতে সুস্থভাবে রোজা পালন করতে পারেন তার জন্য দেশের বিশিষ্ট লিভার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মবিন খান ও বিশিষ্ট মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা: এবিএম আব্দুল্লাহ রোজাদারগণের উদ্দেশ্যে নানা পরামর্শ দিয়েছেন। এসব পরামর্শ নিয়ে আজকের স্বাস্থ্যপাতার প্রধান দু’টি রচনা রচিত হয়েছে।
মহান আল্লাহ মানুষের জন্য হযরত
মুহাম্মদ (সা) এর মাধ্যমে একটি পরিপূর্ণ জীবন ব্যাবস্থা দিয়েছেন তা হল ইসলাম। ইসলামী জীবন ব্যবস্থায় পাঁচটি স্তম্ভ রয়েছে। তার মধ্যে মাহে রমজানের রোজা পালন একটি অন্যতম স্তম্ভ। আত্মশুদ্ধি আর আল্লাহর নৈকট্য অর্জনে অসিম রহমত ও কল্যাণের সওগাত নিয়ে প্রতি বছর রমজান আমাদের দ্বারে এসে উপস্থিত হয়। আল্লাহ তা’আলা কোরআনে বলেন, “হে ঈমানদারগণ, তোমাদের ওপর রোযা ফরয করে দেয়া হয়েছে যেমন তোমাদের পূর্ববর্তী নবীগণের অনুসারীদের ওপর ফরয করা হয়েছিলো। এ থেকে আশা করা যায়, তোমাদের মধ্যে তাকওয়ার গুণাবলী সৃষ্টি হয়ে যাবে।’
সুরা বাকারা, আয়াত:১৮৩।
সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত উপবাসের নিয়ত করে সুবেহসাদেক হতে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার ও সকল প্রকার ইন্দ্রীয় তৃপ্তিদায়ক কার্যকলাপ হতে বিরত থাকার নাম রোজা। সুস্থ প্রাপ্ত বয়স্ক সকল মুসলমানের জন্য রমজান মাসের রোজা ফরজ করা হয়েছে। তবে মাহে রমজানের রোজা পালনের আত্মশুদ্ধির-এ বিধান অসুস্থ ও মুসাফিরদের জন্য শিথিল করা হয়েছে। বলা হয়েছে অন্য যে কোন একসময় সুস্থ হলে এ রোজা পূরণ করে দিতে হবে। আলকোরআনে বিষয়টা এসেছে এভাবে, ‘এ কতিপয় নিদির্ষ্ট দিনের রোযা। অত:পর তোমাদের মধ্যে যে অসুস্থ থাকবে অথবা সফরে থাকবে, তার পক্ষে অন্য সময়ে সে রোজা পূরণ করে নিতে হবে। আর এটি যাদের জন্য অত্যন্ত কষ্টদায়ক হয় তারা এর পরিবর্তে একজন মিসকীনকে খাদ্যদান করবে। যে ব্যক্তি খুশীর সাথে সত্ কর্ম করে, তা তার জন্য কল্যাণকর হয়। আর যদি রোজা রাখে, তবে তোমাদের জন্যে বিশেষ কল্যাণকর, যদি তোমরা তা বুঝতে পার।
‘সুরা বাকারা, আয়াত:১৮৪
যারা দীর্ঘ মেয়াদি অসুস্থ, যাদের জন্য এই রোজা অত্যন্ত কষ্টদায়ক কিংবা দিনের বেলা বার বার ওষুধ সেবন করতে হয়। যারা গুরুতর অসুস্থতার কারণে রোজা রাখতে নিতান্তই অক্ষম, তারা রমজান মাসে পূর্ণতৃপ্তি সহকারে খাওয়ার জন্য একজন মিসকিনকে খাদ্য দান করবেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সিয়াম সাধনার এই মহা সুযোগকে সহজ করতে চান। তিনি আমাদের জন্য জটিলতা আরোপ করেননা। রোজা বস্তুত: কৃচ্ছতা সাধণের এমন এক স্তর যা আমাদের আত্মশুদ্ধির সুযোগকে অবারিত করে দেয়। যার ফলে আল্লাহর অসিম রহমত প্রাপ্তিতে গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশে হূদয়ে আনে অনাবিল আনন্দ। এই রমজান আত্মশুদ্ধির মাস। এই মাসটি হল শরীর ও মনকে পবিত্র করার সুবর্ণ সুযোগ। রমজান মাসে আল্লাহ তায়ালা মানুষের জন্য অফুরন্ত রহমত, বরকত, মাগফেরাত, নাজাত ও ফজিলত দান করেন। রমজান মাসের রোজার ফজিলত বর্ণনা করে শেষ করা যাবে না। হুজুরে পাক (সা:) বলেছেন, যে ব্যক্তি রমজান মাসে ইমানের সঙ্গে কেবল মাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি ও আখেরাতের কল্যাণ লাভের আশায় রোজা পালন করবে, আল্লাহ তায়ালা তার পূর্ববর্তী সকল সগিরা গুনাহ মাফ করে দেবেন। রমজানের রোজা রোজাদারের জন্য ঢাল স্বরূপ। যদি রোজাদার মিথ্যা কিংবা কোন গীবত দ্বারা রোজা নষ্ট করে না ফেলেন আল্লাহ পাকই প্রতিটি রোজাদারের প্রতিদান দেবেন। রমজানের রোজার উদ্দেশ্যে হল মানুষের প্রাত্যহিক জীবনে শয়তানের সকল প্ররোচনা থেকে নফ্সকে রক্ষা করা। তাই রোজা দ্বারা দেহ ও অন্তরকে বিশুদ্ধ করার অন্যতম শর্ত হল শরীয়তের বিধান অনুযায়ী হালাল উপার্জন ও হালাল সম্পদ দ্বারা জীবন যাপন করা।
বছরের বারটি মাসের মধ্যে আল্লাহ পাক একটি মাসকে রমজান মাস হিসাবে নির্ধারণ করে দিয়েছেন। এই সময় দিনকে রাত, রাতকে দিন করে যাপনের মত ব্যবস্থা করা হয়েছে। রোজা সংযমের সাথে খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন সাধন করে। আমাদের দেশে রমজান মাস এলে নতুন নতুন খাওয়া দাওয়ার ধুম পরে যায়। লোকজন অস্থির হয়ে পরে, রমজান মাসে কি খাবে, কি খাবে না। সারা দুনিয়াতে বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন বর্ণ গোত্র ভাষা-ভাষি ও সামাজিক রীতিনীতির মুসলমান রয়েছে। যদিও তাদের বর্ণ গোত্র ভাষা আচার আচরণ সামাজিক রীতিনীতি সর্বপরি খাদ্যাভ্যাস ভিন্ন ভিন্ন। তবু পৃথিবীর সকল দেশের মুসলমানদের মধ্যে একটি জীবন ব্যবস্থা বা দ্বীন, ইসলাম পৃথিবীর সকল মানুষকে একটি ভ্রাতৃত্ব বন্ধনে আবদ্ধ করেছে। তাই আসলে সারা পৃথিবীতে মুসলমানগণ ইসলামের বিধান অনুযায়ী একই নিয়মে রমজান পালন করেন। বিভিন্ন দেশের মানুষের দৈনন্দিন জীবন যাত্রা বিভিন্ন রকম। খাওয়া দাওয়ার অভ্যাসও ভিন্ন ভিন্ন। তাই স্থান, কাল পাত্র ভেদে ভিন্ন ভিন্ন রকম খাবার তৈরীর করা হয়। এমতাবস্থায়, আজকের প্রবন্ধে আমাদের দেশের মানুষের যে ধরনের খাদ্যাভ্যাস রয়েছে তা নিয়ে আলোচনা করব। রমজান মাস এলেই আমাদের মাঝে খাবারের নতুন নতুন আইটেম খেয়ে দেখার প্রবণতা জেকে বসে। এই প্রবণতার সুযোগ নিয়ে বিকালে বসে যায় হরেক রকম ইফতার তৈরী ও বিক্রির হিড়িক। নানা রকম ইফতারীর পশড়া সাজিয়ে দোকানীরা রাস্তার ধারে বসে যায়। এ সমস্ত ইফতারী মধ্যে ছোলা, মুড়ি, পেয়াজু, বেগুনী, ডাল বরা, সবজি বরা, আলুর চপ, খোলা খেজুর, হালিম, জালি কাবাব, জিলাপী ইত্যাদি মসলাবহুল তৈলাক্ত খাবারের আধিক্য লক্ষ্যনীয়। এছাড়াও আছে বিভিন্ন ফল, ফলের রস, আখের গুড়ের সরবত, বিভিন্ন রং মিশ্রিত বাহারী শরবত, আর মুখরোচক বিরিয়ানী ও তেহারীতো আছেই। কিন্তু আমরা প্রতিনিয়ত যা খাই তা স্বাস্থ্যসম্মত, ভারসাম্যপূর্ণ ও যথাসম্ভব স্বাভাবিক হওয়া বাঞ্ছনীয়। শরীরে সমস্যার অন্যতম কারণ অসামঞ্জস্যপূর্ণ খাবার বেশী খাওয়া। পরিমিত সুষম খাবার স্বাস্থ্য রক্ষার অন্যতম চাবিকাঠি। সুষম খাবার খেলে অতিরিক্ত কোলেস্টেরল, গ্যাস্ট্রিক আলসার, কোষ্ঠকাঠিন্য, হজমে গন্ডগোল ইত্যাদি রোগ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।
বেশী পরিমাণে ইফতার করা ঠিক যেমন স্বাস্থ্যকর নয় তেমনি ইফতারের পরে রাতের খাবারও হালকা হওয়া চাই। রমজান মাসের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো সংযমী হওয়া। তাই খাবারে সংযমী হওয়া উচিত্। রমজান মাসে শরীরের পরিপাক প্রক্রিয়া কমে যায়। অনেকেই রোজা
অবস্থায় কায়িক পরিশ্রম করতে পারে না। তাই অন্যান্য সময় যে পরিমাণ খাবার খাওয়ার অভ্যাস থাকে তার থেকে কম খেলেও স্বাস্থ্যহানি হয় না।
সাধারণত বেশী ভাজা তৈলাক্ত খাবার, রিফাইন ফুড, অল্প মাত্রায় পানি, আঁশযুক্ত কমল খাবার না খাওয়া ইত্যাদি খাদ্যাভ্যাস কোষ্ঠকাঠিন্য, মাংস পেশীতে টান দেওয়া, পেপটিক আলসার, বুক জ্বালা পোড়া, গ্যাস্ট্রাইটিস, কিডনিতে পাথর এই সমস্ত সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। বেশী পরিমাণে শাক সবজি খাওয়া এবং মাছ, মাংস, দুধ, ভাত, রুটি, অল্প পরিমাণে খাওয়া বাঞ্ছনীয়। এখন গরম কাল। এবারের রমজানে তাই বেশী পরিমাণে পানি পান করতে হবে। ইফতারের সময়, সেহরীর সময় বেশী বেশী পানি পান করা দরকার।
রমজানের এক সপ্তাহ আগে থেকে ক্যাফেইন যুক্ত কোমল পানীয় যেমন: কোক, কফি ও চা পান করার অভ্যাস কমিয়ে আনা প্রয়োজন। কেননা যাদের এগুলো খাবারের অভ্যাস আছে হঠাত্ ছেড়ে দিলে মাথা ব্যথা হতে পারে, মেজাজ খিটখিটে হতে পারে। এছাড়া এগুলো বেশী খেলে লবণ ও পানি বের করে দিয়ে পানি শূণ্যতা তৈরী করতে পারে। ধূমপান সব সময় শরীরের জন্য খারাপ অভ্যাস। রমজান মাস ধূমপান ছাড়ার অন্যতম সময়। ধূমপান বিভিন্নভাবে স্বাস্থ্যহানি করতে পারে। ধূমপানের অভ্যাস থাকলে সে এই সুযোগে পরিহার করতে পারেন।
যাদের দৈনিক ব্যায়ামের অভ্যাস আছে তাদের হঠাত্ রমজানে ব্যায়াম ছেড়ে দেয়া উচিত না। অন্ততপক্ষে ২০-৩০ মিনিট হাটার অভ্যাস থাকা ভাল। তবে এর চেয়ে বেশী পরিশ্রম করলে শরীরের উপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে বিধায় অধিক ব্যয়াম পরিহার করতে হবে।
ইফতারে কি খাবেন
২-৩ টি খেজুর, মিষ্টি ছাড়া শরবত অথবা ভেজিটেবল স্যুপ ও বিস্কুট ইত্যাদি খেতে পারবেন। সারা দিন অভুক্ত থাকার ফলে শরীরের শক্তির জন্য প্রয়োজনীয় ও অতিশীঘ্র শক্তি পাওয়া যায় এমন খাবারের উদাহরণ হল গ্লুকোজ। এছাড়াও তত্ক্ষণাত্ শক্তির যোগান দিতে সক্ষম খাবারের মধ্যে আছে আংগুর, খেজুর, ফলের রস।
এগুলো যেমন শরীরে সহজে শক্তি আহরণে কাজে লাগে তেমনি শরীরের পানি ও খণিজের প্রয়োজনও মেটায়। মিষ্টি শরবত, মিষ্টান্ন জাতীয় অতিরিক্ত চিনিযুক্ত খাবার শরীর খারাপ করে। তাই এগুলো খাওয়া অনুচিত। আর দোকানীরা যে সকল মুখরোচক ও রসালো ইফতারের আইটেম বিক্রি করে সেগুলো পরিহার করা দরকার। কেননা পুন:পুন: একই তেলে ভাজা এবং অতিরিক্ত রং ও ভেজাল মসলার ব্যবহার খাবারগুলোর গুণগত মান কমিয়ে দেয়। এর পরিবর্তে বরং বাসায় তৈরী কম তেলে ভাজা পেয়াজু, চপ, বেগুনী, ছোলা, মুড়ি ইত্যাদি খাওয়া যেতে পারে। সন্ধ্যা রাতে ডিনারে কি খাবেন তা ভেবে চিন্তে সিদ্ধান্ত নিন। সাধারণত: সুষম খাবার খাওয়া উত্তম, যাতে থাকবে সব রকমের খাবারের মিশ্রণ। যেমন- সালাদ, মুরগী, মাছ, ভাত, রুটি ও দধি। বাটার না খাওয়া ভাল। কুমড়া, কম ক্যালরীযুক্ত মাখন, টমেটো ইত্যাদি খাওয়া ভাল। যাদের ভাত খাওয়ার অভ্যাস নাই তারা আলু সিদ্ধ, মাছ এবং চর্বি বিহীন মাখন খেতে পারেন।
সেহরীতে কি খাবেন
অনেকেই সেহরী খেতে চান না। এই অভ্যাস ঠিক নয়। কারণ সেহরী থেকে সারা দিন উপোস থাকতে হয়। বিশেষ করে আমাদের দেশে এই সময় প্রায় ১৪ ঘন্টা উপোস থাকতে হবে। এই দীর্ঘ সময়ে অনাহারে থাকতে হবে বিধায় অবশ্যই সেহরী খেতে হবে। তবে সেহরী পেট ভরে না খেয়ে হালকা খাওয়া ভাল। আস্তে আস্তে হজম হয়, সময় লাগে এমন কমপ্লেক্স ও শর্করা জাতীয় খাবার খাওয়া উত্তম। এতে সহসা ক্ষুধাও লাগবে না। আমাদের দেশে ঢেঁকি ছাটা চাল (যা এখন বিরল), মোটা ভাত, সিম, ডাল উত্তম খাবার। অন্যান্য দেশে বার্লি এবং আটার রুটি প্রসিদ্ধ। সেহরী খেলে দুর্বলতা, মাথা ঘুরানো, দিনের বেলা খাই খাই ভাব থাকবে না। সেহরীতে সুষম খাবার খাওয়া উচিত। যেমন- সুগার, শর্করা জাতীয় খাবার, সামান্য চর্বি ও প্রোটিন থাকতে হবে। তাতে করে দিনের বেলা খাবারের চাহিদা কমে যাবে। যাদের শরীরে অতিরিক্ত মেদ জমে গেছে তাদের জন্য ওজন কমানোর উত্তম সময় হল রোজা। অতএব এ সুযোগটি হাতিয়ে নেয়া দরকার। ধুমপানের অভ্যাস থাকলে সেটাও পরিহার করতে পারেন।
প্রশ্ন হল অসুস্থ অবস্থায় আমরা কিভাবে রোজা রাখব? এ প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করছে কি রোগ হয়েছে তার উপর। যারা লিভারের সমস্যায় ভুগছেন তারা রোজা রাখবেন কি না তা নির্ভর করছে কি ধরনের লিভারের রোগ হয়েছে তার উপর। আমাদের দেশে শুষ্ক মৌসুমে ও বন্যা পরবর্তী সময়ে ভাইরাল হেপাটাইটিসের প্রাদুর্ভাব লক্ষ্য করা যায়। এ ধরণের রোগীরা ক্ষুধা মন্দা, বমি বমি ভাব বা বমি ও দুর্বলতার অভিযোগ করেন। কারও কারও শরীর এতটাই দূর্বল হয়ে পড়ে যে শিরায় স্যালইন দিতে হতে পারে। এই অবস্থায় রোজা রাখা যাবে না। পরবর্তীতে সুস্থ হলে এ রোজাগুলো রেখে নিলেই হবে।
যারা লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত তাদের অবস্থা দু’ধরণের হতে পারে। যাদের রোগ প্রাথমিক পর্যায়ে থাকে তারা খাওয়ার প্রতি অনীহা বোধ করেন। তাদের পেটে ব্যথা হয়। আমাশায় বা ডায়রিয়া নিয়ে চিকিত্সকের শরণাপন্ন হন। এ পর্যায়ে যদি রোগের উপসর্গের মাত্রা কম থাকে অর্থাত্ রোগী প্রয়োজন অনুযায়ী খেতে পারে এবং খাবার হজমে কোন সমস্যা না হয় সেক্ষেত্রে রোজা রাখার চেষ্টা করা অবশ্য কর্তব্য। তবে যারা সিরোসিসের পরবর্তী পর্যায়ে চলে গেছেন, যে পর্যায়ে পেটে ও পায়ে পানি জমে, ফলে পানি কমার ওষুধ সেবন করছেন, তাদের জন্য রোজা রাখা ঝুকিপূর্ণ। শরিয়ত অনুযায়ী এধরণের ব্যক্তিরা যেহেতু রোজা রাখতে পারছেন না, রোজার কাফফারা আদায় করলেই আদেশ পালন হয়ে যাবে। একই নির্দেশনা প্রযোজ্য লিভার ক্যান্সারের রোগীর জন্য।
গ্যাস্ট্রাইটিস ও পেপটিক আলসার রোগে আক্রান্ত হলে পেটের উপরিভাগে জ্বালাবোধ, বুকে জ্বালা পোড়া, টক ঢেকুর আসা, শেষ রাতে পেটের ব্যথায় ঘুম ভেঙ্গে যাওয়া ইত্যাদি সমস্যা হতে পারে। এসব ক্ষেত্রে এইচটু রিসেপ্টর ব্লকার, অথবা প্রোটনপাম্প ইনহিবিটর জাতীয় ওষুধ খেলে সাধারণত:সমস্যাগুলোর উপসম হয়ে যায়। ফলে নির্দ্ধিধায় রোজা রাখা যাবে। তবে কারও যদি উপরোক্ত উপসর্গের পাশাপাশি রক্ত বমি বা কালো পায়খানার সমস্যা দেখা দেয় তাদের উচিত রোজা রাখার পূর্বেই বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকের পরামর্শ নেয়া।
হূদরোগ ও উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের জন্য সাধারণত:রোজা রাখার ব্যাপারে কোন নিষেধাজ্ঞা নেই। তবে যে সকল রোগীদের হার্ট এটাক হয়েছে অথবা হূদপিন্ডের স্বাভাবিক স্পন্দনে সমস্যা আছে অথবা হার্ট ফেইলর হয়ে জীবন ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় উপনীত হয়েছে তাদের অবশ্যই বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকের পরামর্শ নিয়ে নিজ নিজ স্বাস্থ্যের অবস্থার প্রেক্ষাপটে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
যাদের ব্রংকিয়াল এজমা তথা হাঁপানির সমস্যা আছে এবং দৈনিক ২-৩ বার ইনহেলার ব্যবহার করলে এবং ওষুধ খেলে শ্বাস কষ্ট নিয়েন্ত্রণে থাকে তাদের রোজা রাখতে কোন বাঁধা নেই। তবে যাদের ঘন ঘন ইনহেলার ব্যবহার করতে হয় তাদের পক্ষে রোজা পালন করা সম্ভব নয়। তাদেরকে কাফফারা আদায় করতে হবে। ডায়াবেটিস রোগীরা ভয় পান যে, তারা রোজা রাখতে পারবেন কি না।
যেহেতু, অনেকক্ষন না খেয়ে থাকলে হাইপোগ্লাইসেমিয়া হওয়ার সম্ভাবনা থাকে সেহেতু ভয় পাওয়াটা অযৌক্তিক নয়। তবে রমজানের পূর্বে বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকের পরামর্শ নিয়ে ওষুধ, ইনসুলিন ও খাবার সমন্বয় করে নিলে রোজা রাখা সম্ভব। যে সমস্ত ডায়াবেটিক রোগী শুধুমাত্র ব্যায়াম ও পরিমিত খাবারের মাধ্যমে রোগ নিয়েন্ত্রণে রাখেন তাদের রোজা রাখলে সমস্যা ও ঝুঁকি কম। আর যারা ওষুধ সেবন করেন তাদের মধ্যে মেটফরমিন ও গ্লিটাজোন ব্যবহারকারীগণ নির্ভয়ে রোজা রাখতে পারবেন। তবে সতর্ক থাকতে হবে যারা সালফোনাইল ইউরিয়া ও ইনসুলিন
ব্যবহার করেন তাদের। এ জন্য ডায়াবেটিস রোগীদের রমজানের ২-৩ মাস আগ থেকে চিকিত্সকের পরামর্শ অনুযায়ী পূর্ব প্রস্তুতি গ্রহণ করা উচিত। ডায়াবেটিস যেমন জীবনে শৃংখলাবোধ সৃষ্টি করে তেমনি রোজা সৃষ্টি করে আত্মার পরিশুদ্ধি। রমজানের রোজা আল্লাহ তায়ালার প্রদত্ত বিধানে একটি অপরিহার্য
ফরজ এবাদত। তাই আলস্য করে কোন রোগের অজুহাত দেখিয়ে রোজা পালন থেকে বিরত থাকা উচিত্ নয়। কারণ একমাস রোজা পালন আমাদের দেহ, মন ও আত্মার পরিশুদ্ধির একটি সুবর্ণ সুযোগ। একজন মুসলমান আল্লাহপাক-এর এ বিধান তাক্কওয়ার ভিত্তিতে পালন করলে আল্লাহ পাক তার প্রতিদান দেবেন। আল্লাহপাক আমাদেরকে তার বিধান সঠিকভাবে পালন করার তৌফিক দান করুন,আমীন।
লেখক:পরিচালক
দি লিভার সেন্টার, ঢাকা
মির্জা গোলাম হাফিজ রোড
বাড়ী নং-৬৪, রোড নং-৮/এ
ধানমন্ডি, ঢাকা\
