২৪ এপ্রিল ২০১৩। সকাল ৯টা। বাংলাদেশের মানুষের কর্মব্যস্ত জীবনে হঠাত্ নেমে এলো এক আকস্মিক স্থবিরতা। দেশের সবকটি টিভি চ্যানেলে খবরের শিরোনাম ছিল— “সাভারে ৯ তলা রানা প্লাজা ধসে পড়েছে, যার মধ্যে ৫টি গার্মেন্টস কারখানা ছিল”। ২৩ এপ্রিল পত্রিকার খবর হয়েছিল, “এই ভবনে ফাটল দেখা গিয়েছে যার কারণে এই ভবনকে পরিত্যক্ত করার প্রক্রিয়া চলছে।” কিন্তু তার পরের দিনই ভবনটি ধসে পড়লো। শত শত মানুষের মৃত্যু হলো। সবার মনে প্রশ্ন, আগের দিন যে ভবনে ফাটল দেখা গেছে সেখানে সাড়ে পাঁচ হাজার মানুষ কেন ? তারা কেনই বা গিয়েছিল সেখানে? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে দেখা গেলো যে, এই হতভাগ্যরা সবাই ছিল গার্মেন্টসকর্মী। আরো ভয়াবহ— যে সত্য আমরা জানতে পারলাম, আগের দিন বন্ধ হয়ে যাওয়া গার্মেন্টসগুলোর মালিকপক্ষ সেদিন সকালে গার্মেন্টস খোলা রাখার সিদ্ধান্ত নেন। আর ভবন মালিক সোহেল রানা ঘোষণা করেন যে, “এই ভবনে কোনো সমস্যা নেই।” কাজে না গেলে বেতনভাতা বন্ধ হয়ে যাবে— এমন হুমকি দিয়ে ফোন করে শ্রমিকদের নিয়ে আসা হয়। যারা এরপরেও মৃত্যুকূপে যেতে চায়নি তাদেরকে লাঠিপেটা করে বাধ্য করা হয় ভবনে প্রবেশ করতে। যার পরের ঘটনা দেখেছে সারা বিশ্ব। জীবন্ত মানুষ লাশ হয়ে পচে গলে গেছে। ভবন ধসের সঙ্গে ধসে পড়ে বহু শ্রমিকের স্বপ্ন। গার্মেন্টসকর্মীদের জীবত ও মৃত উদ্ধারের জন্য উদ্ধারকাজে নেমেছিল মানুষ। কিন্তু জীবিত উদ্ধার ২৪৩৮ জন আর মৃত লাশ উদ্ধার করা হয় ১১২৭টি। যারা জীবিত উদ্ধার হয়েছে তাদের জীবনের কি আর কোনো নিশ্চয়তা আছে?
পাখি নামের ১৯ বছর বয়সী এক গার্মেন্টসকর্মী চাপা পড়েছিল পাঁচতলার এক বিমের নিচে। তার দু’টি পা কেটে তাকে উদ্ধার করা হয়। তখন পাখি শুধু বাঁচতে চেয়েছিল। কিন্তু এখন তার সামনে এক এক অনিশ্চিত ভবিষ্যত্। যে সংসারের সে একমাত্র উপার্জনক্ষম ছিল সেই সংসারের সব স্বপ্ন ধসে পড়েছে। দুই পা কেটে বের করা আর এক শ্রমিক পারভীন। সে তার মেয়েকে আর একটিবার দেখতে চেয়েছিল। কিন্তু অসহ্য যন্ত্রণার কাছে হার মেনে উদ্ধার হওয়ার পাঁচদিন পর ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে যায়। এমন অসংখ্য আহত শ্রমিকের ভাগ্য আজ অনিশ্চিত। অনেকেই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে। কেউবা বেঁচে থেকেও মৃত। এখন তাদের পরিবার ও তাদের নিজেদের দায়িত্ব কে বহন করবে? সরকারি সামান্য কিছু সাহায্য কি তাদের জীবনকে স্বাভাবিক করতে পারবে? সেই অর্থপিপাসু গার্মেন্টস মালিক ও বিশেষ করে ভবন মালিক সোহেল রানা সেদিন শ্রমিকদের এই মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছিল— তাদের কতটুকু শাস্তি প্রযোজ্য? বাংলাদেশের আইনে মাত্র ৫-৭ বছরের কারাদণ্ড কি এত প্রাণের ও স্বপ্নের হত্যার জন্য যথেষ্ট বিচার? এ ঘটনার প্রায় দু’মাসে সবাই হয়তো ভুলে গেছে সেই হতভাগ্যদের কথা। এখন কেউ আইন সংশোধনের দাবি করে না, কেউ আন্দোলন করতে রাস্তায় নামে না। কারণ যারা আহত বা নিহত তারা তো সাধারণ গার্মেন্টস শ্রমিক। The Bngladesh labour Code, 2006 শুধুই কি সীমিত থাকবে বইয়ের পাতায়? শুধু বলতে চাই— মানুষগুলো ও তাদের পরিবারকে জীবন নির্বাহের জন্য ন্যূনতম সুবিধা দিন। সাভারের রানা প্লাজা ধসের মূল হোতাদের শস্তির জন্য আইন সংশোধন করে তাদের শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।
ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়
