এর চেয়ে লজ্জা আর কী হতে পারে

আপডেট : ০৫ জুলাই ২০১৩, ২২:২০
গত ১৮ জুন পত্রিকায় প্রকাশিত এক খবর থেকে জানা যায়, নাটোরের সিংড়া উপজেলার এক গরিব দিনমজুরের ঘরে ঢুকে বউ ও শাশুড়িকে গণধর্ষণ করেছে এলাকার ৪ নরপশু। ৮ মাসের গর্ভবতী বউটি কোরআন শরিফ বুকে জড়িয়ে তাদের কাছে ইজ্জত ভিক্ষা চেয়েও নিস্তার পায়নি। জানা গেছে, ধর্ষকরা এলাকার প্রভাবশালী পরিবারের সন্তান এবং বিশেষ রাজনৈতিক দলের লোক হিসেবে পরিচিত। এই দেশে রাজনৈতিক বিবেচনায় শুধু নিয়োগ বদলি পদোন্নতি আর চাকুরিচ্যুতিই হয় না বরং খুনির মুক্তি আর অপরাধ না করেও ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্তি কোনো ব্যাপারই নয়। পিলে চমকানোর মতো এমন একটি ঘটনা মিডিয়ায় আসার পরও থানা বা কুম্ভকর্ণ প্রশাসনের ঘুম ভাঙার মতো কোনো প্রতিক্রিয়া নজরে আসেনি। নারী অধিকার আর মানবাধিকার হেফাজতের মহত্ দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদেরও এই বিষয়ে সোচ্চার হতে দেখা গেলো না। এই দেশে এর আগেও পিতা বা ভাইকে বেঁধে রেখে ধর্ষণ, স্বামীর সামনে স্ত্রীকে গণধর্ষণ, মা-বাবার হাত থেকে কেড়ে নিয়ে বা অপহরণ করে মাসের পর মাস নির্যাতন, ধর্ষণের পর হত্যা, ধর্ষণের দৃশ্য মোবাইলে বা ভিডিওতে ধারণপূর্বক ব্লাকমেইল করা বা পর্ণোগ্রাফি হিসেবে বাজারে বিক্রি করা, ইন্টারনেটে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এই ধরনের পাশবিক ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে সকল ক্ষেত্রেই কিছু অভিন্ন উপাত্ত পাওয়া যাবে। যেমন নির্যাতনের শিকার পরিবারটি সহায়-সম্বলহীন দরিদ্র আর অপরাধীরা অর্থবিত্ত ও প্রতিপত্তির অধিকারী। সকল ক্ষেত্রেই দেখা যাবে নরপশুরা ক্ষমতার রাজনীতির সঙ্গে জড়িত বা আর্শীবাদপুষ্ট ‘সোনার ছেলে’। সুতরাং সমাজ ও প্রশাসনকে সবসময় ওদের ম্যানেজেই থাকে। এই নরপশুদের জন্য আরেকটি প্লাস পয়েন্ট হলো ভিকটিম সব সময়ই মান-ইজ্জতের খাতিরে বিষয়টিকে প্রথমত চেপে যেতে চায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কেউ প্রতিবাদী হতে গিয়ে পুন পুন নির্যাতনের শিকার হয়। এমনকি উলটো অপরাধী সাব্যস্ত হয়ে নাজেহাল হয়। অপরাধীদের পরিচয় জানার পর থানাও মামলা নিতে চায় না বা অযথা সময় নষ্ট করে আলামত বিনষ্টে সচেষ্ট হয়। একান্ত মামলা হলেও শারীরিক পরীক্ষার নামে যা ঘটে তা আর একবার ধর্ষণের শিকার হওয়ারই নামান্তর। সুতরাং অধিকতর নির্যাতনের আশঙ্কায় জীবন যন্ত্রণা নিয়ে ধুঁকে ধুঁকে মরলেও প্রতিকারের আশায় ভিকটিম আদালত মাড়ায় না। এতে করে নিজেকে হিরো ভেবে তারা দ্বিগুণ উত্সাহে নতুন করে আরো বিভীষিকা সৃষ্টির প্রয়াস পায়। অনেক ক্ষেত্রে বিচারের নামে সমাজপতিরা গরু মেরে জুতো দান-এর মতো বিচারও করেন। অভিযুক্তদের জরিমানা করেন। আর সেই টাকা নানা ছল-ছুতায় তাঁরাই আবার বণ্টন করে নেন। আলোচ্য ঘটনার বিচার নামের নাটকটি এর বতিক্রম নয়। ৮ জুন ঘটনা ঘটে থাকলেও থানা জানে না ঘটনার ১০ দিন পরও। কারণ কেউ অভিযোগ দেয়নি। আর সাধারণত ক্ষমতাসীন দলের অপকর্মের কোনো খবর থানা শোনেও না বা শোনার এখতিয়ারও রাখে না। সমাজ কত নির্মম, কত বিবেকহীন! নির্যাতনের শিকার দরিদ্র এক দিনমজুরের মা ও স্ত্রী— এটা এমন আর কী? এলাকার চেয়ারম্যান এবং মেম্বার দু’জনই ক্ষমতার রাজনীতির সহোদর। আর অভিযুক্ত পশুরা তাদেরই ‘সোনার ছেলে’ প্রয়োজনে হাতের লাঠিও বটে। সুতরাং গডফাদারদের কাছে এদের কদর অনেক। তাঁরা রায় দিলেন ১০ হাজার টাকা জরিমানা, ২১ ঘা করে জুতা। চেয়ারম্যানের ভাষ্য তিনি মীমাংসার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু সাধারণ মানুষ এই রায়ে সন্তুষ্ট হয়নি। আমাদের কথা— বিচারকদের নিজের বেলায় এমনটি ঘটলে এই রায়ে তাঁরা কি সন্তুষ্ট হতেন? অবশ্যই নয়। তা হলে রায় সঠিক হলো কি? অবশ্যই নয়। এই মাত্রার অপরাধে অপরাধীদের বার বার ফাঁসি দিলেও অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত হয় কি? চেয়ারম্যান সাহেব কি তা পারেন? তা হলে প্রহসনের বিচার জনগণ মানবেই বা কেন? হ্যাঁ সালিস আর আদালত এক নয়। আমরা মনে করি অনেক ক্ষেত্রে সামাজিকভাবে অপরাধীকে যেরূপ দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া সম্ভব, আদালতের মাধ্যমে তা হয়ে ওঠে না। তাহলে সালিসি ও বোর্ড ঘটনাটিকে একবার নিজেদের সঙ্গে মিলিয়ে ভিকটিমের জীবন যন্ত্রণা উপলব্ধির চেষ্টা করেছেন কি? এই ধরনের ঘটনার পর জীবন যন্ত্রণা নিয়ে অনেকে তাই আত্মহত্যার পথ বেছে নেয় পাপের কাজ জেনেও। আজীবন এমনকি পরবর্তী প্রজন্ম পর্যন্ত এই গ্লানি নিয়ে তাদের বেঁচে থাকতে হবে। সমস্যার সম্মুখীন হবে তাদের ছেলে-মেয়েদের বিয়ে-শাদির ব্যাপারেও। এ অবস্থায় দেশত্যাগী হওয়া ভিন্ন তাদের আর কোনো উপায়ও থাকে না। সুতরাং রায়টা যদি এমন হতো যে, মজলুম পরিবারটিকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে ওদের অর্ধেক স্থাবর সম্পত্তি লিখে দিতে হবে অথবা বিক্রি করে টাকা দিতে হবে, আর ধর্ষকদের সেই সমাজে অবাঞ্ছিত ঘোষণাপূর্বক এলাকা ছাড়তে বাধ্য করা হবে। এমন পাশবিক ঘটনা ঘটানোর পরও ধর্ষকরা সেই সমাজে এখনো বহাল তবিয়তে আছে। একটি সমাজের জন্য এর চেয়ে লজ্জা ও অপমানের আর কী হতে পারে? গাজীপুর