বর্ষার পানিতে দক্ষিণের জনপদ এখন টইটুম্বর। মাছ শিকারে ব্যস্ত হয়ে ওঠা এ অঞ্চলের দরিদ্র পরিবারের পুরুষরা ভিড় করছেন বানারীপাড়া ও স্বরূপকাঠীর নৌকার হাটে। শুধু মাছ শিকার নয়, চরাঞ্চল ও বিল এলাকার মানুষের যাতায়াতের জন্য প্রতিবর্ষায় কদর বাড়ে নৌকার।
ভাষাণচর থেকে নৌকা ক্রয়ের জন্য বৈঠাকাটা হাটে এসেছেন মিজানুর রহমান। তিনি জানান, বর্ষায় নিজেদের চলাচল ও গবাদিপশুর খাদ্য সরবরাহ করার জন্য প্রতিবর্ষায় তাকে নৌকার ওপর নির্ভর করতে হয়। এবার বর্ষায় পানি বৃদ্ধি পাওয়ার সাথে সাথে মিজান এসেছেন এ হাটে। প্রতি শুক্রবার এ হাটে নৌকার পাশাপাশি গরু-ছাগল, ধান-চাল, শাক-সবজি ও ফলমূল বিক্রি হয়। বৈঠাকাটা হাটের বিশাল অংশ দখল করে আছেন নৌকা বিক্রি করতে আসা পাইকাররা। হাটের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া খালে রাখা হয়েছে সারিবদ্ধ নৌকা। পানিতে ভাসমান রেখে টেকসই প্রমাণ করে ক্রেতার হাতে নির্ধারিত দামে তুলে দেয়া হচ্ছে নতুন তৈরি এসব নৌকা। বৈঠাকাটা ছাড়াও স্বরূপকাঠী ও বানারীপাড়ার বিভিন্ন হাটে এ মৌসুমে বিক্রি হচ্ছে ছোট-বড় নানান ধরনের নৌকা। নৌকা বিক্রি করতে আসা হাফিজুর রহমান জানান, প্রতি শুক্রবার তারা বিক্রির জন্য বৈঠাকাটা হাটে নৌকা নিয়ে আসেন। সন্ধ্যা নদীর পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া একটি খালের তীর জুড়েই বৃহত্ এ নৌকার হাট গড়ে উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা খালটিকে সন্ধ্যা নদীর শাখা হিসেবে দীর্ঘদিন যাবত্ দেখে আসছেন। হরেক রকম নৌকা এ খালে সাজিয়ে রেখে তা বিক্রি হচ্ছে বৈঠাকাটার হাটে। পছন্দের নৌকা ক্রয় করতে এ হাটে ভিড় করেন বিভিন্ন এলাকার ক্রেতারা। বৃদ্ধ আছমত আলী আকন জানান, দক্ষিণাঞ্চলের কোথাও তো দূরের কথা দেশের কোথাও এরকম এতবড় নৌকার হাট রয়েছে বলে তার জানা নেই।
বরিশাল নগরী থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার পশ্চিমে এ নৌকার হাটে সারাবছরই নৌকা বিক্রি হয়। তবে বর্ষা মৌসুমে হাজার হাজার ছোট-বড় নৌকা বিক্রির জন্য পার্শ্ববর্তী জেলা থেকেও নৌকা নিয়ে আসা হয় বলে ব্যবসায়ীরা জানান। এ মৌসুমে বিক্রিও বেড়ে যায় কয়েকগুণ। শুক্রবার হাটবার হওয়ার কারণে সকাল থেকেই শত শত নৌকা বিক্রির জন্য এ হাটে নিয়ে আসা হয়। নৌকা হাটের পাশেই বসে বৈঠার হাট। নৌকা-বৈঠার বিক্রি সম্পর্কে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, স্বরূপকাঠীর চামিরহাট, কাটাখালি, দুবিরহাট ও বিন্নারহাটসহ আশপাশের গ্রামগুলোতে যারা বসবাস করেন তারা যুগ যুগ ধরে নৌকা তৈরি করে আসছে। কাঠ ব্যবসা থেকে শুরু করে এ গ্রামগুলোর মানুষ কাঠের জিনিসপত্র তৈরি ব্যতীত তেমন কোন কাজ জানেন না। বংশ পরম্পরায় তারা নৌকা বিক্রি করে জীবনযাপন করে আসছেন।
সারাবছর নিজেরা নৌকা তৈরি করে বিক্রি করলেও বর্ষা মৌসুমে এরা আরো দূরবর্তী এলাকায় কাঠমিস্ত্রিদের অর্ডার দিয়ে নৌকা তৈরি করান। ছোট সাইজের এ নৌকা অধিকাংশই তৈরি হয় রেন্ট্রি, কড়ই, আম ও সুন্দরী কাঠ দিয়ে। স্বরূপকাঠীর ইন্দুরহাট ও মিয়ারহাটের ভাসমান কাঠের মোকাম থেকে অল্প দামেই কাঠ ক্রয় করা সহজ হওয়ায় নৌকা তৈরির সাথে জড়িত পরিবারগুলোর তেমন কোন সমস্যা মোকাবেলা করতে হয় না। বর্ষা মৌসুমের জন্য ছোট সাইজের যে নৌকা তৈরি করে এ বাজারে বিক্রি হচ্ছে তা লম্বায় ১০ ফুট। এ সাইজের একটি নৌকা বিক্রি হচ্ছে সর্বনিম্ন ৮শ টাকা দামে। এসব নৌকা তৈরিতে কাঠ ও মজুরি খরচ মিলিয়ে সর্বোচ্চ ৫শ টাকা খরচ হয়। প্রতিটি নৌকা তৈরিতে সর্বোচ্চ একদিন সময় লাগে। বিক্রি করে লাভ হয় ৩শ টাকা। তবে কাঠের ধরন ও সাইজ অনুসারেই ৭/৮ হাজার টাকা দামের নৌকাও বিক্রি হয় এ হাটে। ২/৩ জন মিস্ত্রির এ নৌকা তৈরিতে ৪/৫ দিন সময় লাগে। এ ধরনের একেকটি নৌকা বিক্রি করলে তাদের লাভ হয় কমপক্ষে ১৩শ টাকা। পাশেই বৈঠার হাটে একেকটি বৈঠা বিক্রি হয় ৭৫ থেকে ১শ টাকায়। হাট থেকে নৌকা ও বৈঠা ক্রয় করে ক্রেতারা সাধারণত জলপথেই পাড়ি জমান গন্তব্যে। ফলে বাড়তি কোন পরিবহন খরচ বা নৌকা স্থলপথে বহনের ঝামেলা নেই। সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণেও এ হাটে বেশি ক্রেতা-বিক্রেতা আসেন বলে ব্যবসায়ীরা জানান।
