একটি সম্পর্ক তৈরিতে দুইজন মানুষের অনেক বোঝাপড়া থাকে। তাদের সুন্দর স্বপ্ন নিয়ে তৈরি হয় নতুন জীবন। বাস্তবতার মুখে কখন কে কীভাবে স্বাভাবিক গতি থেকে বিচ্যুত হয় তা জানা যায় না। যখন জানা হয় তখন নিজেদের মধ্যে আবারো বোঝাপড়া করা প্রয়োজন হয়। নয়তো জীবনে বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। সে বিপর্যয় কেড়ে নেয় মূল্যবান জীবন। মিতা নূর ২২ বছর আগে তার স্বামী শাহনূরকে ভালোবেসে বিয়ে করেন। সদাহাস্যোজ্জ্বল মিতা নূর তার দুই ছেলেকে নিয়ে সব সময় গল্প করতেন। ভালো থাকার পরামর্শ দিতেন অন্যদের। তার বাড়ির দেয়ালে দেয়ালে টানানো ছবিগুলো বলে দেয় ভালো থাকার চেষ্টা নয়— ভালো ছিলেন তারা। একসময় সেই ভালো থাকার মধ্যে পরকীয় নামের ব্যাধি এসে কেড়ে নেয় ভাল থাকার আনন্দটুকু। জানা যায়, মিতা নূরের সংসারে তার আয়ের একটি বিশেষ গুরুত্ব ছিল। স্বামী আর সংসার নিয়ে যখন কোনো নারী সংগ্রাম করে একটা জায়গা তৈরি করে তখন অন্য কোন নারীর সাথে তার স্বামীর পরকিয়ার সম্পর্ক কোনোভাবেই মেনে নিতে পারে না, পারা যায় না।
সম্পর্ক ও হতাশা: আমাদের দেশে পরকীয়ার বলি হয়ে আত্মহননের পথ বেছে নেয়ার সংখ্যায় নারীদের পাল্লা অনেক ভারি। এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানী সাবিহা জাহান বলেন, নারী সম্পর্কের ক্ষেত্রে খুব গভীরভাবে নিযুক্ত থাকে। আমি এমনও নারী দেখেছি যে স্বামীর পরকীয়ার কথা জেনেও সংসারে আবদ্ধ থাকে। তবে নারী স্বামীর পরকীয়া সম্পর্ককে মেনে নিতে না পরলে ক্রমেই নারী হতাশাগ্রস্ত হয়। হতাশা দিন দিন তার চারপাশকে আমোদহীন করে দেয়। এক সময় সে নিজেকে প্রতিযোগী মনে করে নিজেরই দোষ-ত্রুটি খুঁজতে শুরু করে। হতাশার অনেক ধাপ আছে। প্রথমেই যদি তা কারো সাথে শেয়ার করা না যায় তাহলে হতাশা গভীর থেকে গভীরতর হয়। চারপাশের সবকিছু পানসে মনে হয়। বেঁচে থাকার শেষ ইচ্ছেটুকুও বিসর্জন দিয়ে কখনো কখনো আত্মহত্যা করে।
পারিবারিক সচেতনতা জরুরি: ছেলেবেলা থেকে পরিবারের মধ্যে শেয়ার করার জায়গাটা এক্ষেত্রে জরুরি বলে মনে করেন মনোবিজ্ঞানী সাবিহা জাহান। তিনি বলেন, এক-দুই দিনের হতাশায় মানুষ আত্মহত্যার পথে পা বাড়ায় না। তাই পারিবারিক সম্পর্ক গভীর হলে হতাশাগ্রস্ত মানুষ যখন বেঁচে থাকার আনন্দ হারাতে শুরু করে তখনই তা পরিবারের মানুষের চোখে ধরা পরে। শেয়ার করার জায়গাটা যতো মজবুত হবে ততো দ্রুত হতাশা থেকে ফিরে আসা সম্ভব হবে।
ব্যস্ততার জীবন: সাবিহা জাহান বলেন, বিশ্বায়নের এই সময় ব্যবস্তার কারণে আমরা এতো বেশি পরিবর্তন শুরুতে ধরতে পারি না। পরে যখন ধরতে পারি তখন নিজের জায়গা না থাকলে সঙ্গীর দূরত্বটা চোখে পড়ে। সঙ্গীর অবহেলা নিজেকে মূল্যহীন ভাবা কিংবা মেনে নেয়া কঠিন হয়ে পড়ে। নিজের জায়গা থেকে নিজের সরে আসার সুযোগ যেন না তৈরি হয়।
ভাঙ্গা গড়ার সমাজ: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক সাদেকা হালিম বলেন, নারী অগ্রগতির সাথে আমাদের সমাজে যে পরিবর্তন সূচিত হয়েছে, সেই পরিবর্তনের গতিকে সবল রাখতে সহায়ক প্রতিষ্ঠান নেই। তাই যখন একজন কর্মজীবী নারী সংসার করবে, সন্তান জন্ম দেবে এবং সবকিছুর সাথে পেশাগত দায়িত্ব নিয়ে এগিয়ে যাবে তখন কাউন্সিলিংয়ের যে সুযোগটুকু থাকা দরকার তা নেই, কিন্তু এটি থাকা জরুরি। বিয়ে কিংবা সংসার করা আমরা বাবা-মাকে দেখে শিখি। কিন্তু বাবা-মায়ের সময় আর আজকের আমাদের সময় অনেক পার্থক্য। তাই এই দেখা এবং বাস্তবতার মধ্যকার ব্যবধানে টিকে থাকার জন্য প্রয়োজন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নতুন শিক্ষা পদ্ধতি। পাশাপাশি ব্যক্তিগত কাউন্সিলিং। আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজে দুঃখ-কষ্টে আজো আমরা পুরুষকেই আশ্রয় হিসেবে খুঁজি। এই মনোভাব পরিবর্তনে এবং যে কোনো পারিবারিক সমস্যায় নারীকে দোষারোপ করার মানসিকতার পরিবর্তনের জন্য প্রতিষ্ঠানিক শিক্ষা প্রয়োজন।
প্রয়োজন দখিনা জানালার: প্রিয়া একজন ক্যান্সার রোগী। তার নিজের কোনো সন্তান নেই। তার উপর ক্যান্সারের মতো ব্যাধি মাঝে মধ্যে জীবনকে অনেক ভারি করে দেয়। তিনি তখন খুব হতাশায় ভুগতে থাকেন। নিজের জীবনকে গতিময় করতে তিনি আশ্রয় নেন নিজের পালিত মেয়ের সন্তানের কাছে। দুর্বিসহ দিনগুলোতে সেই শিশুর ঊষ্ণতাকে অবলম্বন করেছেন তিনি। ছবি এঁকে, গান শুনে, ছবির প্রদর্শনী করে নিজের ভালোলাগার জগত্ তৈরি করেছেন। আশ্রয় নিয়েছেন সৃষ্টিশীলতার কাছে। প্রিয়া বলেন, আমি আমার মাকে দেখেছি, আত্মত্যাগের প্রতিযোগিতা বার বার করেছেন নিজের সাথে। শুধু তিনি নন; আজো অনেক নারী স্বামীর সংসারকে কেন্দ্র করে বেঁচে থাকেন। নিজের কথা ভাবেন না। ফলে বঞ্চিত হতে হতে প্রচণ্ড ক্ষোভে নিজের ভেতরেই অসুস্থতা তৈরি হয়। যার প্রচণ্ড বহিঃপ্রকাশ ঘটে। সাদেকা হালিম এ প্রসঙ্গে বলেন, প্রত্যেকেরই নিজস্ব একটা জগত্ তৈরি করতে হবে। নিজেকে নিয়ে ভাবা আর নিজের জন্য বাঁচা শিখতে হবে।
দরকার সংগ্রামী জীবন: যে সমাজে নারী তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয় সেই সমাজে নারীর আত্মহত্যা বেশি ঘটে। আমি একটি জার্নালে পড়েছি জাপান ও বাংলাদেশে নারী আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি— বলেন এনাম আল হক। দীর্ঘদিন তরুণীদের সংগঠিত করার অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বলেন, আমাদের সমাজে বাবা-মা শিশুদের একটি নেতিবাচক প্রতিযোগিতার মধ্যে ঠেলে দেন। তুমি ভালো করতে পারছো না, তুমি ভালো না— এমন কথাগুলোর মধ্যে তার সংগ্রামী মন তৈরি হয় না। সে যখন কোনো সংগ্রামে অবতীর্ণ হয় তখন পরাজিত হলে নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। অথচ বার বার পরাজিত হয়েও বিজয়ী হওয়ার নজির আছে।
তুমি আলো: একটি মেয়েকে একটি ছেলে জোর করে ভালোবাসাতে বাধ্য করে। এক সময় মেয়েটা ছেলেটাকে ভালোবেসে ফেলে। সেই ভালোবাসার সুযোগ নিয়ে ছেলেটা মেয়েটার থেকে টাকা নেয়। একসময় নিজের এবং মায়ের প্রয়োজনীয় জিনিসগুলোর বায়না ধরে। মাও নানাভাবে সংসারের স্বপ্ন দেখিয়ে এটা-ওটা নিয়ে শোষণ করতে থাকে মেয়েটাকে। সরলমতি মেয়েটা আনন্দ নিয়েই মা-ছেলের চাহিদা পূরণ করে। যখন মেয়েটা বিয়ের কথা বলে তখন নির্লজ্জ মা-ছেলে বেঁকে বসে। মেয়েটা জানতে পারে কোনো এক ধনীর সম্পত্তির লোভে তারা এখন মত্ত। আর সেই ধনীর মেয়েটাকেই বিয়ে করবে ছেলেটা। মেয়েটা প্রচণ্ড ভেঙ্গে পড়ে। তার পরিবার, বন্ধু-বান্ধব চারপাশ থেকে ঘিরে ধরে তাকে। বোঝায় সুন্দর এই পৃথিবীতে তোমার বেঁচে থাকা অনেক প্রয়োজন। সে অন্ধকার নিয়ে এসেছিল— অনুভূতি নিয়ে খেলেছিল, টাকা নিয়ে চলে গেছে। এরচেয়ে বড় ক্ষতি হতে পারতো। সে অন্ধকার, তুমি আলো।
