শান্ত হয়নি মিসর...

আপডেট : ০৭ জুলাই ২০১৩, ২০:৩৮
মিসরের ইসলামপন্থি প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসির বিরুদ্ধে কায়রোর তাহরির স্কোয়ার গত এক বছর ধরে উত্তাল। চলছিলো সহিংসতা, জ্বালাও পোড়াও। অবশেষে মুরসি ক্ষমতাচ্যুত হলেও পরিস্থিতি এখনো শান্ত হয়নি। বরং কায়রোর অশান্তি এখন গোটা মিসরে। অনিশ্চয়তা আরো ঘনীভূত। শুক্রবার বিক্ষোভ, সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শহরে। সেনাবাহিনীর গুলিতে আর বিরোধীদের সাথে মুরসির সমর্থকদের সহিংসতায় একদিনেই মারা যায় অন্তত ৩০ জন। আহত হয় সহস্রাধিক। প্রেসিডেন্ট মুরসিকে গত বুধবার ক্ষমতাচ্যুত করার পর সংবিধান স্থগিত করে সেনাবাহিনী। সর্বোচ্চ সাংবিধানিক আদালতের প্রধান বিচারপতি আদলি মাহমুদ মনসুরকে দেয়া হয় রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব। এরই মধ্যে পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ শুরা কাউন্সিল ভেঙে দিয়েছেন মনসুর। শিগগিরই নির্বাচন অনুষ্ঠানেরও ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। তবে কবে তা অনুষ্ঠিত হবে বা এর জন্য সেনাবাহিনী তাকে কতদিন সময় দেবে তা এখনো পরিষ্কার নয়। তবে যা স্পষ্ট হয়েছে তাহলো যে গণতন্ত্রের জন্য মিসরবাসীর এত অপেক্ষা, ত্যাগ-তিতিক্ষা, সেই ব্যবস্থায় উত্তরণের শুরুতেই একটা চরম বাধা; প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ক্ষমতাচ্যুত। আর দুটি ধারায় জনগণের বিভক্তি ও অনৈক্য হয়ে উঠছে আরো বেশি অসহিষ্ণু ও সাংঘর্ষিক। প্রেসিডেন্ট মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করার পেছনে ছিলো ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীদের কিছু অভিযোগ, কায়রোর তাহরির স্কোয়ারকেন্দ্রিক সহিংসতা আর সরকারি ও বিরোধীদলগুলোর মধ্যে সমঝোতার অভাব। মুসলিম ব্রাদারহুডের সদস্য মুরসি বেশি মনোযোগী ছিলেন সংবিধানসহ গোটা শাসন ব্যবস্থায় ইসলামী ভাবধারা ও ক্ষমতায় ইসলামপন্থিদের সুপ্রতিষ্ঠিত করার কাজে। এমনকি দেশের প্রধান সমস্যা অর্থনৈতিক সংকটকেও তিনি এড়িয়ে গেছেন। এ সবই ছিলো মুরসির বিরুদ্ধে বিরোধীদের অভিযোগ। ক্ষমতাচ্যুত হবার পর মুসলিম ব্রাদারহুড সেনা অভ্যুত্থানের তীব্র প্রতিবাদে ফেটে পড়ে। মুরসিকে আবারো ক্ষমতায় না এনে ঘরে ফিরবে না বলেও ঘোষণা দিয়েছে তারা। তবে প্রায় একই সুরে কথা বলছে সেনাবাহিনী ও মুরসি বিরোধীরা। তারা জানায়, সেনা অভ্যুত্থান নয় বরং এটা জনগণের চাওয়া-পাওয়ার প্রতিফলন। তাদের মতে এটা ১৯৫২ সালের ‘ফ্রি আর্মি’ সেনা অভ্যুত্থানের মতো নয়। সেনাবাহিনী এক্ষেত্রে ক্ষমতায় একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেনি। বরং জনগণের সহযোগিতা নিয়েই মুরসিকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব দেয়া হচ্ছে বেসামরিক ব্যক্তিদেরই। তবে প্রশ্ন হচ্ছে সেনাবাহিনীর সেই সহযোগিতাকারী জনগণ কারা? মিসরীয় সেনাবাহিনীকে মূলত সমর্থন যুগিয়েছে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ইসলামী গবেষণা প্রতিষ্ঠান আল-আযহার, কায়রোর কপটিক চার্চ, বিরোধীদল সালাফিস্ট আল-নূর পার্টি, তামারোদ বা বিদ্রোহী আন্দোলনের প্রতিনিধিরা এবং জাতিসংঘের আণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) সাবেক প্রধান মোহাম্মদ এলবারাদিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও গ্রুপ। সেনাবাহিনী এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র, ইইউ ও কিছু আরব দেশের সাথেও যোগাযোগ করে তাদের আশ্বস্ত করে যে, অন্তর্বর্তীকালে বেসামরিক শাসনই অব্যাহত থাকবে এবং দ্রুত নির্বাচন দেয়া হবে। এ লক্ষ্যে একটি রোডম্যাপও প্রণয়ন করেছে সেনাবাহিনী। যেমন, শক্তিশালী ও দক্ষ বেসামরিক টেকনোক্র্যাট (অনির্বাচিত) বা তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠা করা, যার প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন পশ্চিমা বিশ্বের পছন্দের ব্যক্তি এলবারাদি বা আরব লীগের সাবেক মহাসচিব আমর মুসা; সুপ্রিম কোর্টকে দিয়ে আগাম নির্বাচনের ব্যাপারে আইনি রায় বা দিকনির্দেশনা আদায় করা এবং পার্লামেন্ট ও প্রেসিডেন্ট নির্বাচন আয়োজন। যুবশ্রেণির ক্ষমতায়নে ব্যবস্থা নেয়া এবং মতানৈক্য নিরসনে একটি জাতীয় কমিটি গঠন করার কথাও বলা হচ্ছে রোডম্যাপে। এছাড়া মুরসিপন্থিদের সহিংসতা রুখতে রাস্তায় ট্যাঙ্কসহ সাঁজোয়া যান ও সৈন্য মোতায়েন করা হয়েছে ঐ রোডম্যাপ অনুযায়ী। আটক করা হয়েছে মুরসিসহ ব্রাদারহুডের শীর্ষ নেতাদের। কয়েকটি ইসলামপন্থি টিভি চ্যানেলের সম্প্রচারও বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। গণতান্ত্রিক সরকারকে হটিয়ে দেয়ায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন। প্রায় একই কৌশলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইলিয়াম হগ বলেন, ‘গণতান্ত্রিক পন্থায় সেনা হস্তক্ষেপ কাম্য নয়। আশাকরি গণতন্ত্র জলদি ফিরবে’। বিভিন্ন গণমাধ্যমে বলা হয়, মিসরে সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখল করলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া কী হবে, তা নিয়ে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের সাথে বৈঠকে বসেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। সেখানেই সিদ্ধান্ত হয় এমন ভারসাম্যপূর্ণ মধ্যপন্থা অবলম্বনের। তবে বিশ্লেষকদের মতে সেনাবাহিনী কর্তৃক প্রেসিডেন্ট মুরসিকে অপসারণ মিসরের জনগণের বিভক্তির ফসল। মাত্র এক বছরের মাথায় ক্ষমতাচ্যুত হলেন মুরসি বা মুসলিম ব্রাদারহুড। আর এতে খুশি মুরসি বিরোধীরা। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, এই আনন্দ উদযাপন হয়তো খুব বেশিদিন স্থায়ী হবে না। কারণ ইরাক যুদ্ধ পরবর্তী এই সময়টা শুধু মিসরের জন্য নয়, বরং তা গোটা মধ্যপ্রাচ্যের জন্য বিপজ্জনক। অনেকের মতে মুসলিম ব্রাদারহুড এখনো দেশের সবচেয়ে বড় সামাজিক ও রাজনৈতিক শক্তি। নির্বাচন দিলে তাদেরই আবার ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা আছে। অন্যদিকে সেনাবাহিনী রাজনৈতিক সমস্যা কিছুটা লাঘব করতে পারলেও অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলায় সাধারণত তারা যেকোন গণতান্ত্রিক সরকারের চেয়ে বেশি অমনোযোগী। মিসর আধুনিক ইসলামী রাজনীতির ধারণার সূতিকাগার। অনেকের মতে ঐ ধারণাই পরবর্তীতে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে আল-কায়েদার জন্ম হয়, যারা জিহাদ বা লড়াইয়ের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করে। আল-কায়েদার প্রতিষ্ঠাতা আয়মান আল জাওয়াহিরি একজন মিসরীয়; যিনি ওসামা বিন লাদেনকে ঐ দলে অন্তর্ভুক্ত করেন। অন্য ধারণাটি লালন করছে মুসলিম ব্রাদারহুড, যাদের লক্ষ্য ব্যালটের মাধ্যমে ক্ষমতা গ্রহণ; যা মধ্যপ্রাচ্যসহ মুসলমান প্রধান বিভিন্ন দেশে জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। তবে বিশ্লেষকরা এখন বলছেন, শান্তিপূর্ণ উপায়ে ক্ষমতায় যাবার পথ রুদ্ধ হলে ব্রাদারহুড হয়তো আবারো আন্ডারগ্রাউন্ডে যেতে পারে, জন্ম নিতে পারে ব্যাপক সহিংসতা। ব্রাদারহুড যদি মনে করে ন্যায্য অধিকার আদায়ে সহিংসতাই একমাত্র পথ, তাহলে সম্ভবত মুরসির অপসারণ সেই সহিংসতাকে উসকে দিলো। আর তেমনটি হলে এর পরিণতি ভোগ করতে হবে গোটা মধ্যপ্রাচ্যকে।