দক্ষিণ এশিয়ার পরমাণু শক্তিধর দেশ পাকিস্তান। কিন্তু পরমাণু শক্তিধর দেশে বিদ্যুত্ সংকট আর বিদেশি বিনিয়োগ কমতে থাকায় দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে তার অর্থনীতি। রাজনীতিবিদদের দুর্নীতি, ঘন ঘন তালেবান হামলা আর মার্কিন ড্রোন হামলার ঘটনায় দেশটির ভবিষ্যত্ নিয়ে প্রায়ই আশঙ্কার কথা বলছে পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো। যে কারণে বিশ্বের কাছে পাকিস্তান পেয়েছে আরেক নতুন পরিচিতি। সেটা হলো পাকিস্তান এখন ঝুঁকিপূর্ণ একটি দেশ! তাই ইচ্ছা থাকলেও খুব কম বিদেশিই পাকিস্তানমুখী হতে সাহস করছে। এক সময় বিদেশি পর্যটকদের হাঁক-ডাকে কোলাহলপূর্ণ পাকিস্তানের পর্যটন এলাকাগুলো এখন খাঁ খাঁ করছে।
পাকিস্তানের বেশিরভাগ এলাকা ঝুঁকিপূর্ণ না হলেও গণমাধ্যমের সৃষ্ট ধারণায় আজ গোটা পাকিস্তানই যেন অনিরাপদ। বলা হচ্ছে, এজন্য ধর্মান্ধতা, রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা, পশ্চাত্পদতা, আইন-শৃঙ্খলার অবনতি এসবই দায়ী। পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলোর তৈরি করা ধারণা কি সবটাই সত্যি? পাকিস্তানের অবস্থা সত্যিই কি এতটা শোচনীয়? ১৮ কোটি মানুষের দেশটি কি সত্যিই এতটা ঝুঁকিপূর্ণ? নাকি আফগানিস্তানে মার্কিন হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের পাশে থাকার জন্য পাকিস্তানকে এ মাশুল দিতে হচ্ছে? বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূ-রাজনীতির নির্মম বাস্তবতার শিকার আজকের পাকিস্তান। পাকিস্তানে তালেবানদের উত্পাত আছে তবে সেটা সীমান্তবর্তী এলাকায়। জনবহুল এলাকাগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা অনেক ভালো। তালবান হামলা ও রাজনৈতিক কোন্দলে যেমন লোকের প্রাণ যাচ্ছে, তেমনি মানুষের প্রাণ যাচ্ছে মার্কিন ড্রোন হামলায়ও। অনেকে মনে করেন, বিশ্বে পাকিস্তান সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরিতে পশ্চিমা গণমাধ্যমেরই বড় দায় রয়েছে।
পাকিস্তানের জনবহুল শহর করাচি। দেশটির মোট অর্থনীতির ৫০ শতাংশের বেশি যোগান দেয় এই শহর। বিশ্বের প্রায় সব বর্ণের-জাতের মানুষের নাকি দেখা মেলে করাচির সৈকতে। তাই করাচির জীবন ধারা সমগ্র পাকিস্তান থেকে একটু ভিন্ন বললে ভুল হবে না। সদর এলাকার সবচেয়ে বড় মার্কেটটিতে রাত তিনটা পর্যন্ত লেগে থাকে মানুষের ভিড়। এককোণে চলে খাবারের দোকানে জমজমাট আড্ডা আর অন্যকোণে মাল্টিপ্লেক্স সিনেমা হলে দর্শকের হর্ষধ্বনি। রাত তিনটায় সিনেমা শো শেষে ঘরে ফিরছে যাদের বেশিরভাগই পশ্চিমা ঢংয়ের পোশাকের ছেলে-মেয়ে। এটি নির্দিষ্ট কোনো দিনের চিত্র নয়। বরং করাচির তরুণ-মধ্য বয়সীদের নৈমত্তিক জীবন ধারার অংশ।
বড় বড় শপিং মল শুধু নয়, মাঝ রাত পর্যন্ত রাস্তার পাশের রেস্তোরাঁগুলোতে লেগে থাকে চোখে পড়ার মতো ভিড়। মুখরোচক খাবারের স্বাদ নিতে করাচিবাসী ঘরমুখো না হয়ে ভিড় করে এসব রেস্তোরাঁয়। সবকিছুই স্বাভাবিকভাবে চলছে। রাজনৈতিক কোন্দল মাঝে মাঝে এ জীবনধারাকে ব্যাহত করলেও করাচিবাসীকে স্বাভাবিক জীবনধারার বাইরে রাখতে পারেনি। নিরাপত্তার জন্য বড় শপিংমল বা রেস্তোরাঁর সামনে অস্ত্র হাতে নিরাপত্তারক্ষীদের অবস্থান সবসময় চোখে পড়লেও করাচিবাসীকে দেখলে কখনোই মনে হয় না তাদের মধ্যে উত্কণ্ঠা আছে। আর জনগণের স্বাভাবিক জীবনধারা বজায় রাখতে সক্রিয় ভূমিকা রেখে চলেছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী।
পাকিস্তানের প্রধান জনবহুল প্রদেশ সিন্দু ও পাঞ্জাব। এই দুই প্রদেশে তালেবান হামলার হুমকি কমই। রাজধানী ইসলামাবাদও নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা। করাচি থেকে পাঞ্জাবের রাজধানী লাহোর হাজার কিলোমিটারের দূরত্ব। করাচির মতো জনবহুল না হলেও ঐতিহাসিক দিক থেকে লাহোর তার নিজস্ব গুরুত্ব বজায় রেখেছে। পাঞ্জাবেই পাকিস্তানের মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় ৫৫ শতাংশের বাস। পাঞ্জাবের প্রধান সাংস্কৃতিক, ঐতিহাসিক, প্রশাসনিক এবং অর্থনৈতিক কেন্দ্র এই লাহোর। মুঘল, ব্রিটিশ শাসনামলের চিহ্ন এখনো রয়েছে লাহোরে। লাহোর ফোর্ট, শালিমার গার্ডেন, বাদশাহী মসজিদ, পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় জাদুঘর, বিশ্ববিদ্যালয়, চারুকলা কলেজ সবই লাহোরে। বাদশাহী মসজিদের পাশে স্বগর্বে এখনো দাঁড়িয়ে আছে রণজিত্ সিংয়ের গুরুদুয়ারা। সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ধারণ করে চলেছে লাহোর জাদুঘর। কী নেই সেখানে। জাদুঘরে আছে হযরত হোসাইন (রা.)-এর হাতে লেখা কুরআন শরীফ। মুঘল এবং শিখ শাসনামলের দরজা, অনেক চিত্রকর্ম। আছে গৌতম বুদ্ধের ভাস্কর্য, হিন্দু দেবতাদের ভাস্কর্য, কালী মূর্তি, শিব লিঙ্গ। ন্যাশনাল কলেজ অব আর্টস (এনসিএ) আর লাহোর জাদুঘরের একইসঙ্গে বেড়ে ওঠে। এ প্রতিষ্ঠানটি উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন চারুকলা প্রতিষ্ঠান। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনেরও নাকি পদচারণা ছিলো এই কলেজে। পাকিস্তানের দ্বিতীয় পর্যটন স্থল পাঞ্জাব। পাঞ্জাবের রাস্তায় গাধা ও ঘোড়ার গাড়ি এখনো চোখে পড়ে। পূর্ব সীমান্তে ওয়াগা সীমান্তে পাকিস্তানি-ভারতীয় সেনাদের কসরত দেখারও সুযোগ মেলে। অস্ত্র নয় শারীরিক নৈপুণ্য প্রদর্শনের মাধ্যমে দুই দেশের সেনাদের শ্রেষ্ঠত্ব দেখানোর এক অভিনব সুযোগ এটি।
পশ্চাত্পদতা নয়, পাকিস্তানেই এখন বিশ্ব মানের শিক্ষাব্যবস্থা আছে। লাহোর ইউনিভার্সিটি অব ম্যানেজমেন্ট সায়েন্সেস বিশ্বমানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃত। যেখানে ৪০ শতাংশ শিক্ষার্থী বিনা খরচে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পেয়ে থাকে। আগামী দিনের পাকিস্তানের নেতৃত্ব দেবে এ রকম আরো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মেধাবীরা, যারা আধুনিক মনস্ক হয়ে আধুনিক পাকিস্তান গড়বে। পাকিস্তানের নারীরাও এগিয়ে যাচ্ছে সমান তালে। করাচি এয়ারপোর্টের ইমিগ্রেশনে নারী অফিসার সহজেই চোখে পড়ে। সড়কের টোল উত্তোলন থেকে শুরু করে নানা পেশায় পাকিস্তানি নারীদের বিচরণ লক্ষণীয়।
লাহোর থেকে ইসলামাবাদ। প্রায় ৪শ’ কিলোমিটারের দূরত্ব। পাহাড়ে ঘেরা ইসলামাবাদে যাওয়ার সময় চোখে পড়ে অপরূপ নৈসর্গিক সৌন্দর্য। চারলেনের রাস্তা লাহোর থেকে যেন সোজা ইসলামাবাদে পৌঁছেছে। শুধু পাকিস্তান নয়, এশিয়ায় এমন আরেকটি পরিকল্পিত শহর খুঁজে পাওয়া ভার। জনসংখ্যা প্রায় ১২ লাখ। প্রেসিডেন্টের বাসভবন, পার্লামেন্ট, সুপ্রিম কোর্ট সবই এই ইসলামাবাদে। যানজটহীন সাজানো-ঘোছানো ইসলামাবাদ পাকিস্তানিদের গর্বের প্রতীকও। দক্ষিণ এশিয়ার বড় মসজিদ ফাইসাল মসজিদ এখানেই অবস্থিত। ইসলামাবাদের ৫৮ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে পাকিস্তানের প্রসিদ্ধ পর্যটন কেন্দ্র মারি। বলা যায়, কাশ্মীরের হাওয়া মারিতেই অনুভব করা যায়।
তালেবান সমস্যা কাটিয়ে এখন অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে বিকশিত হওয়ার মতো সকল প্রস্তুতিই নিয়ে রেখেছে পাকিস্তানিরা। তাদের আশা, আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর তালেবান হামলাসহ সব ধরনের সন্ত্রাসী তত্পরতা থেকে মুক্তি পাবে পাকিস্তান। নতুন সরকারের কাছে পাকিস্তানের জনগণের আশা অনেক। তারা মনে করে, নওয়াজ শরীফ সরকার অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতিতে পরিবর্তন আনবে। যাতে পাকিস্তানে অস্থিরতা কমে আসবে। বিশ্বে পাকিস্তানের ভালো ইমেজ গড়ে উঠবে। আর্থিকভাবে সমৃদ্ধ প্রভাবশালী রাষ্ট্রে পরিণত হবে পাকিস্তান।
