রাজু, রুবেল, বাবু ও বাবলু। সবারই বয়স বিশ থেকে বাইশের মধ্যে। বেড়ে ওঠা গুলশান কড়াই বস্তিতে। চারজনই ঘনিষ্ঠ বন্ধু। আরও ঘনিষ্ঠ বন্ধু আছে তাদের। দিনের কাজের মধ্যে মহল্লায় জমিয়ে আড্ডা ও গুলশান বনানীর বিভিন্ন গলিতে হাঁটাহাঁটি। তবে আসল কাজটি শুরু করে গভীর রাতে গ্রিল কেটে চুরি। এক কথায় ওরা তস্কর। চারদিন আগে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ এই চার তস্করকে গ্রেফতার করে। উদ্ধার করে ৫৩টি মোবাইল সেট, ৩টি ল্যাপটপ, ৩টি ক্যামেরাসহ অন্যান্য ইলেক্ট্রনিক্স। এরা প্রত্যেকেই পুলিশের হাতে ধরা পড়ে জেল খেটেছে ১৫ থেকে ২০ বার। মহানগর গোয়েন্দা দফতরেই এই প্রতিবেদকের সঙ্গে তাদের কথা হয়। কোনরকম রাখ-ঢাক না রেখে রাজু বর্ণনা করে তাদের চুরির অভিজ্ঞতা, ধরন ও পদ্ধতি।
রাজু বলে, গুলশান, বনানীর বাইরে কোথায়ও চুরি করি না। এ এলাকায় চুরির ক্ষেত্রে কিছু সুবিধা রয়েছে। আর ধরা পড়ার সম্ভাবনাও খুব কম। প্রতিটি বাড়িতে দারোয়ান থাকলেও তারা গভীর রাতে যার যার রুমেই ঘুমিয়ে থাকে। খুব একটা রুম থেকে বের হয় না। বাড়ির লোকজনের একই অবস্থা। তারাও ঘুমায় গভীর রাতে। বিছানায় যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গভীর ঘুমে তলিয়ে যান। আর এ সময় গ্রিল ভেঙ্গে চুরি করা হয় মোবাইল, ল্যাপটপ, ক্যামেরা । রাজুর বাবার নাম লোকমান হোসেন। গ্রামের বাড়ি নোয়াখালী জেলার বেগমগঞ্জ থানার সুলতানপুর। দুই ভাই-বোনের মধ্যে সে বড়। রাজুর কথা, সঙ্গদোষে সে অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে । বার বার ধরাপড়া, জেল খাটা, তারপরও চুরি ছাড়তে পারেনি। এটা এখন অভ্যাসে দাঁড়িয়েছে। না করতে পারলে ভালও লাগে না।
চুরির ধরন সম্পর্কে রাজু বলে, প্রতি রাতে তারা চুরি করে না। সপ্তাহে এক থেকে দু’বার। তবে চুরি আগে তারা বাড়ি নির্ধারণ করে। কখনও কাগজ কুড়াবার ছলে টার্গেটকৃত বাড়ির আশপাশ এলাকায় ঘুরে অবস্থান দেখে আসে। এরপর রাত ১টার পর শুরু হয় তাদের ‘অপারেশন’। বাড়ির সীমানা দেয়াল যত উঁচুই হোক তাতে তাদের কোন সমস্যা হয় না। কখনও দড়ি দিয়ে আমার কখনও একজনের ঘাড়ে চড়ে বাড়ির ভেতরে প্র্বেশ করে। পানির পাইপ বেয়ে উপরে উঠে যায়। এরপর ভবনের কার্নিশে বসে রুমের ভেতরের অবস্থা দেখে । আর চুরি করতে গিয়ে অনেক সময় রোমান্টিক দৃশ্যের মুখোমুখি হয়েছে। এ অবস্থায় দীর্ঘক্ষণ ঘাপটি মেরে শুয়ে থাকে কার্নিশে । সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে তা নিশ্চিত হওয়ার পর চুরি অভিযান শুরু করে।
গ্রিল ভাংগার ব্যাপারে রাজু বলে, স্লাইর্যাঞ্চ দিয়ে গ্রিল ভাংগা হয়ে থাকে। ভাঙ্গার আগে কাপড় পেঁচিয়ে নেয়া হয়। কাপড় পেঁচানোর কারণে শব্দ হয় না। ভাংগা অংশ দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে ল্যাপটপ, মোবাইল ফোন, ক্যামেরা চুরি করে। তারা কোন ভারি জিনিস চুরি করে না। অনেক সময় পাওয়া যায় মানিব্যাগও। রাজু তার চুরির অভিজ্ঞতা বলতে গিয়ে বলে, একবার তো ধরা পড়ার অবস্থা হয়েছিল। যে রুমে চুরি করছিল সেই রুমেই ঘুমানো ছিল স্বামী স্ত্রী। একজন বিছানা থেকে উঠে বাথরুমে যান। বিষয়টি টের পেতেই রাজু খাটের নীচে ঢুকে পড়ে। প্রায় পৌনে এক ঘন্টা পর খাটের নিচ থেকে বের হয়ে ল্যাপটপ ও ক্যামেরা নিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।
প্রতিবার চুরিতে ভাগে কত টাকা পাওয়া যায়? এমন প্রশ্নের জবাবে রাজু বলে, ৪ থেকে ৫ হাজার টাকার বেশি ভাগে পড়ে না। তবে চুরির টাকা দিয়ে কিছুই করা সম্ভব হয়নি। ইয়াবা খাই জুয়া খেলি। আর টাকা শেষ হবার পর আবার চুরি করি। পুলিশের হাতে গ্রেফতার সম্পর্কে বলে, পাবলিকের (জনতা) হাতে তেমন একটা ধরা পড়িনি। প্রতিবার পুলিশই ধরেছে। সপ্তাহখানেক জেল খেটে জামিনে বের হয়ে আসি। আর জামিনের ব্যাপারে সহায়তা করে কয়েকজন নির্ধারিত উকিল ও মহুরি।
মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের এডিসি (পশ্চিম) মশিউর রহমান বলেন, গ্রেফতারকৃতরা কাতার এয়ারওয়েজ, নেপাল দূতাবাসসহ বিভিন্ন অফিসে চুরির সঙ্গে জড়িত। রাজু একসময় পুলিশের সোর্সের কাজও করেছে। সে সময় তার সহায়তায় বেশ কয়েকজন দুর্বৃত্তকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়। পুরনো অভ্যাস ছাড়তে পারেনি রাজু। তার গ্রুপের অপর সদস্যরা হচ্ছে পাকিস্তানী মনির, পাগলা সাইফুল্ল্যাসহ কয়েকজন। তাদের গ্রেফতার করার চেষ্টা চলছে। গ্রেফতারকৃতরা জানিয়েছে, চুরির পর তারা মালামাল ছালায় ভরে। অনেক সময় চুরির মালামাল ছিনতাই হয়ে যেতে পারে এ আশংকায় তারা কোন নির্জন স্থানে অপেক্ষা করতে থাকে। খুব ভোরে লোকজন বের হলে তারা মালামাল নিয়ে বের হয়। তিনি বলেন, এদের মালামাল বিক্রির জন্য স্টেডিয়ামে রয়েছে একটি চক্র। রয়েছে কয়েকজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। এরা চোরদের দাদনও দিয়ে থাকে। এদের হোতা সিরাজ ও ইসমাইল। চোরাই মালকেনা চক্রের কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
