বাংলাদেশ সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য (এমডিজি) অর্জনে ব্যাপক সাফল্য অর্জন করলেও আগামী দিনের উন্নয়নে দুর্নীতি ও সামাজিক অবক্ষয়কে বড় বাধা হিসেবে দেখছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। এছাড়া বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থান তৈরি, পুষ্টি নিশ্চিত করা ও শিক্ষা ক্ষেত্রে ঝরে পড়া রোধ করাসহ টেকসই পরিবেশ নিশ্চিত করার চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। গতকাল শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে ‘সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যসমূহ অর্জন:বাংলাদেশের অগ্রগতি ২০১২’ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। এসময় পরিকল্পনামন্ত্রী এয়ার ভাইস মার্শাল (অব) একে খন্দকার, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, খাদ্যমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী মো. মোতাহের হোসেন, পিকেএসএফ এর চেয়ারম্যান ড. কাজী খলীকুজ্জামান আহমদ, ঢাকায় নিযুক্ত জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী নীল ওয়াকার বক্তব্য রাখেন। এমডিজি’র লক্ষ্য অর্জনের সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়ে মূল প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য ড. শামসুল আলম।
দেশের খাদ্য উত্পাদন বৃদ্ধি ও দারিদ্র্য হ্রাসের অর্জনগুলো উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, টেকসই উন্নয়নের জন্য আমাদেরকে সকলের জন্য প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, চাহিদার পুরোপুরি খাদ্য উত্পাদন করতে আমরা পারছি না, আমাদের জাতীয় সঞ্চয়ের হারও অনেক কম, বাণিজ্যের হারও অনেক কম, জ্বালানি সংকট, উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের অনেক অংশ এখনও দাতাদের উপর নির্ভরশীল। তার পরেও আমাদের সম্পদের ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এমডিজি’র অনেক লক্ষ্যমাত্রা আমরা অর্জন করতে পেরেছি। এমডিজি পরবর্তী ২০৩০ সাল পর্যন্ত উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের জন্য একটি সমন্বিত কৌশল নির্ধারণ করা প্রয়োজন বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তাছাড়া ২০১৫ পরবর্তী লক্ষ্যমাত্রায় ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতির সুরক্ষায় গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন।
খাদ্যমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ২০০৭ ও ২০০৮ সালে মন্দাকালীন সময়ে পর্যাপ্ত অর্থ থাকা সত্ত্বেও বিশ্বব্যাপী খাদ্য সংকটের কারণে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। দেশে এখন আর খাদ্য সংকট নেই। তবে আমাদের দেশে এখনও জনগণের পুষ্টির নিশ্চিত করার বিষয়ে চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী মো. মোতাহের হোসেন বলেন, প্রাথমিক শিক্ষায় স্কুলগুলোতে ভর্তির হার প্রায় শতভাগের লক্ষ্যমাত্রা আমরা অর্জন করেছি কিন্তু প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনীর পর ঝরে পড়ার হার এখনও অনেক বেশি। এর জন্য দেশের দারিদ্র্য পরিস্থিতিকে দায়ী করেন তিনি। তাছাড়া পর্যাপ্ত বরাদ্দের অভাবে বয়স্ক শিক্ষার হারও কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে উন্নীত হয়নি বলেও দাবি করেন তিনি।
পিকেএসএফ এর চেয়ারম্যান ড. কাজী খলীকুজ্জামান আহমদ বলেন, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থাগুলো থেকে আমরা পর্যাপ্ত সহায়তা না পেলেও এমডিজি অর্জনে প্রভূত সাফল্য এসেছে। জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী নীল ওয়াকার তার পর্যবেক্ষণে উল্লেখ বলেন, বাংলাদেশ এমডিজি’র অনেক অর্জনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে। বাকী লক্ষ্যগুলো অর্জনে পুরোমাত্রায় প্রচেষ্টা চালানো প্রয়োজন। তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশ দারিদ্র্য হ্রাস, শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষায় অন্তর্ভুক্তি, মাতৃমৃত্যুর হার হ্রাস, সংক্রামক রোগ প্রতিরোধসহ অনেক ক্ষেত্রে লক্ষণীয় সাফল্য অর্জন করেছে। এর পরেও কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি, শিক্ষা ও প্রযুক্তির সহজ ব্যবহার, বাণিজ্য বৃদ্ধি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলার সক্ষমতা বৃদ্ধি, সুশাসন নিশ্চিত করার বিষয়গুলো চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।
২০১২ সাল পর্যন্ত এমডিজির বিভিন্ন লক্ষ্য অর্জনের বিষয়ে জিইডি সদস্য ড. শামসুল আলম তার উপস্থাপনায় উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ ইতিমধ্যে কতিপয় অভীষ্ট লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে সক্ষম হয়েছে যেমনঃ দারিদ্র্য পার্থক্য কমানো; প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় জেন্ডার সমতা আনয়ন; ৫ বছরের কম বয়সী শিশুমৃত্যু হার কমানো; এন্ট্রিরেট্রোভাইরাল ড্রাগ সহজলভ্য করার মাধ্যমে এইচআইভি সংক্রমণ রোধ; ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের কীটনাশক-চিকিত্সা মশারির নিচে ঘুমানো; যক্ষ্মারোগ চি?িহ্নতকরণ ও নিরাময় ইত্যাদি। অপরদিকে বাংলাদেশ দারিদ্র্য দূরীকরণ, শিশুদের অপর্যাপ্ত ওজনের প্রকোপ, শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষায় ভর্তির হার, মাতৃমৃত্যু হার, শিশুদের টীকা প্রদানের আওতা বৃদ্ধি এবং সংক্রামক রোগের বিস্তার কমিয়ে আনা ইত্যাদি ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। খানা আয়-ব্যয় জরিপ ২০১০ অনুযায়ী বাংলাদেশে ১৯৯১-৯২ হতে ২০১০ পর্যন্ত বছরে গড়ে দারিদ্র্য হার কমেছে ২.৪৭ শতাংশ এবং এই প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকলে বলা যায় যে, ২০১২ সালেই বাংলাদেশ দারিদ্র্য হার অর্ধেকে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা পূরণে সক্ষম হয়েছে। অপরদিকে যে সকল ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে আরো অধিক মনোযোগ প্রদান করা প্রয়োজন তা হলোঃ ক্ষুধাজনিত দারিদ্র্য কমিয়ে আনা ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্তির হার ও বয়স্ক শিক্ষা হার বৃদ্ধি, মহিলাদের জন্য আরো অধিক পরিমাণে মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রসূতিকালীন প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীর উপস্থিতি বৃদ্ধি, এইচআইভি/এইডস সংক্রান্ত সঠিক ও অধিক তথ্য জানা, বনাঞ্চল বৃদ্ধি এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতের সমপ্রসারণ।
