গার্মেন্টসে দুপুরের খাবার, বিকালের নাস্তা কিংবা রাতের খাবার খেয়ে শ্রমিকদের অসুস্থ হয়ে যাওয়ার বিষয়টিকে ষড়যন্ত্র বলে মনে করা হচ্ছে সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে। হঠাত্ শুরু হওয়া এই ‘উত্পাত’ নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের। বিশেষ করে আশুলিয়ার যেসব কারখানায় শ্রমিকদের খাবার সরবরাহ করা হয়, সেসব কারখানার মালিকরা এ পরিস্থিতির কাছে প্রায় অসহায় হয়ে পড়েছেন। শ্রমিক অসুস্থ হয়ে যাবার কারণে বেশ কয়েকটি গার্মেন্টসে উত্পাদন বন্ধ রয়েছে। এ কারণে সময়মতো ক্রেতাদের অর্ডার করা পোশাক সরবরাহ করা যাবে কিনা তা নিয়ে দুশ্চিন্তাও রয়েছে কারখানা মালিকদের।
জানা গেছে, গত এক সপ্তাহে বেশ কয়েকটি গার্মেন্টসে প্রায় এক হাজার শ্রমিক কারখানায় পরিবেশন করা খাবার খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ে। তবে কারখানার শ্রমিকদের গণহারে অসুস্থ হবার পেছনে খাবার বা পানি নয়, অন্য ষড়যন্ত্র কাজ করছে। জানা গেছে, কয়েকদিন আগে আশুলিয়ার রোজ গার্মেন্টস নামক একটি কারখানার শ্রমিকরা পানি পান করে অসুস্থ হয়ে পড়ে। স্থানীয় বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিত্সা দেয়ার পরও শ্রমিকদের অসুস্থতা না কাটায় কারখানা মালিকের পক্ষ থেকে শ্রমিকদের ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে চিকিত্সা করানোর সিদ্ধান্ত হয়। প্রাথমিকভাবে শ্রমিকদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিলো পানিতে বিষক্রিয়া তাদের অসুস্থতার কারণ। মালিক পক্ষের লোকজন অসুস্থ শ্রমিকদের ঢাকায় এনে পাকস্থলী পরিষ্কার করার কথা বলে। এ উদ্দেশ্যে কয়েকজন শ্রমিককে মাইক্রোবাসে তুলে নেয়া হয়। কিন্তু ওই শ্রমিকরা কান্নাকাটি শুরু করে দেয়। উপস্থিত একজন শ্রমিক এ প্রতিবেদককে জানায়, মাইক্রোবাসে তুলে নেয়ার পর শ্রমিকরা তাদের কোন সমস্যা নেই বলে জানায়। এমনকি তারা পরদিন থেকে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দেয়। উল্লেখ্য, রোজ গার্মেন্টস কারখানাটি তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি আতিকুল ইসলামের মালিকানাধীন। যে পানি পান করে শ্রমিকরা অসুস্থ হয়ে পড়েছিলো সে একই পানি তিনি শ্রমিকদের সামনে পান করেছেন। এসময় শ্রমিকদের কয়েকজন বলে উঠে, স্যার ঢাকা থেকে ওষুধ খেয়ে এসেছেন।
বিজিএমইএর সাথে সংশ্লিষ্টরা জানান, নষ্ট খাবার খেয়ে কিংবা পানি পান করে যে কেউ অসুস্থ হতে পারে। কিন্তু আশুলিয়া এবং আশপাশের কারখানাগুলোতে গত দুইমাসে শ্রমিকদের অসুস্থতার যে বিষয়টি ঘটছে তা অনেকটা ‘ষড়যন্ত্র’। কোন একটি পক্ষ থেকে বিষয়টিতে ইন্ধন দেয়া হচ্ছে। ওই অঞ্চলের কয়েকজন কারখানা মালিকের সাথে কথা বললে তারা জানান, বিভিন্ন গ্রুপের ইন্ধনে আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল গত কয়েকমাস ধরে অস্থিতিশীল ছিলো। প্রশাসনের নজরদারি এবং বিজিএমইএর পক্ষ থেকে বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়ার পর তা অনেকটা কমে এসেছে। এ কারণে শ্রমিক নামধারী কিছু ব্যক্তি কারখানাগুলোকে অস্থিতিশীল করে তোলার জন্য নতুন উদ্যোগ নিয়েছে। শ্রমিকদের কয়েকজনকে ম্যানেজ করে অসুস্থতার ‘ভান’ ধরানো হয়। এরপর মনস্তাত্ত্বিক কারণে অন্য শ্রমিকরাও অসুস্থ হয়ে পড়ে। এমনও দেখা গেছে, কয়েকজন শ্রমিক অসুস্থ হলে অন্যরা সবাই মিছিল করে কারখানা থেকে বের হয়ে যাচ্ছে। এরপর বাইরে থেকে এসে এক গ্রুপ কারখানায় হামলা ও লুটপাট চালাচ্ছে। এর মাধ্যমে মালিকদের জিম্মি করা হচ্ছে।
প্রসংগত গত দুইমাসে ১৪ থেকে ১৫টি কারখানার শ্রমিকরা বিকালের নাস্তা কিংবা কারখানার পানি খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ে। বিজিএমইএর সাথে সংশ্লিষ্টরা জানান, আশুলিয়ার কারখানাগুলোতে প্রায় ৬ লাখ শ্রমিক রয়েছে। তারা সবাই বেশি আয়ের জন্য মালিকদের কাছে ওভারটাইম চায়। মালিকপক্ষ মনে করে ওভারটাইম করার সময় শ্রমিকদের নাস্তা সরবরাহ করা হলে সময়ের সাশ্রয় হয়। আশুলিয়ার তিন লাখ শ্রমিক ওভারটাইম করলে তাদের জন্য তিন লাখ পিস রুটি, সমপরিমাণ ডিম এবং কলা সরবরাহ করতে হয়। এতবড় আয়োজন মালিকদের একার পক্ষে করা সম্ভব হয় না। এজন্য তাদের ঠিকাদারের আশ্রয় নিতে হয়। এজন্য সব সময় মালিকদের পক্ষে খাবারের মান রক্ষা করা সম্ভব হয় না।
জানা গেছে, গত কয়েকদিনে বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকরা অসুস্থ হয়ে পড়ার কারণে মালিকরা এখন আর নাস্তা কিংবা দুপুরের খাবার পরিবেশন করতে সাহস পাচ্ছেন না। এর পরিবর্তে শ্রমিকদের টাকা দেয়া হচ্ছে। উল্লেখ্য, দুপুরের খাবার কিংবা নাস্তা সরবরাহ শ্রম আইনে নেই। এরপরও শ্রমিকদের কথা বিবেচনা করে আশুলিয়া এবং এর আশপাশের প্রায় সাড়ে তিনশ গার্মেন্টসে এই সুবিধা দেয়া হচ্ছে।
এ বিষয়ে বিজিএমইএর সভাপতি আতিকুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলে তাকে টেলিফোনে পাওয়া যায়নি। তবে সংগঠনের সহ-সভাপতি রিয়াজ বিন মাহমুদ বলেছেন, শ্রমিকদের অসুস্থতার বিষয়টি কারো তৈরি করা এবং মনগড়া। যে কারখানার পানি খেয়ে কেউ এতদিন অসুস্থ হয়নি, সে পানি খেয়ে সবাই রহস্যময় কারণে ‘অসুস্থ’ হয়ে পড়ছে! আর স্থানীয় কনফেকশনারি থেকে নাস্তা সরবরাহ করা হয়েছে এতদিন। তাতেও কোন সমস্যা হয়নি। এবার সমস্যা সৃষ্টি হওয়ার বিষয়টি রহস্যজনক। তিনি বলেন, যেহেতু শ্রমিকরা ‘অসুস্থ হয়ে পড়ছে এজন্য তাদের এখন বেতনের সাথে নাস্তা অথবা দুপুরের খাবারের টাকা দেয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, একটি মহল বাংলাদেশের পোশাক কারখানাকে ধ্বংস করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে।
