গাজীপুর সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পরাজয়ে জাতীয় নেতৃত্ব থেকে শুরু করে স্থানীয় নেতৃত্বও বিস্মিত। গোপালগঞ্জের পর গাজীপুরকে আওয়ামী লীগ দ্বিতীয় শক্তিশালী ঘাঁটি হিসাবে মনে করতো। দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের রাজত্বে থাকা এই এলাকাটি হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার পর কেন্দ্রীয় নেতারা এর পরাজয়ের কারণগুলো বিশ্লেষণ করছেন। চুলচেরা বিশ্লেষণ করছেন আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা ও তাদের কর্মী-সমর্থকরাও। তারা বলছেন, স্থানীয় কোন্দল, আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের সীমাহীন টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি পরাজয়ের অন্যমত কারণ। একইসঙ্গে পরাজয়ে সরকারের সাড়ে চার বছরে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যর্থতাও প্রভাবক হিসাবে কাজ করেছে। এগুলো হল সরকারের নানা স্তরে দুর্নীতি, পদ্মাসেতু ও শেয়ারবাজার কেলেংকারি, ডেসটিনি ও হলমার্ক জালিয়াতি, মতিঝিলে হেফাজতের ওপর পুলিশি অভিযান, রেলওয়ের নিয়োগ ও বদলিতে ঘুষ গ্রহণ, সারাদেশে হত্যা, গুম ও নির্যাতনের ঘটনা বৃদ্ধি, ড. ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংক নিয়ে সরকারের বাড়াবাড়ি।
এমনকি সাভারে রানা প্লাজা ধস, তাজরিন ফ্যাশনে অগ্নিকাণ্ড ও এ ঘটনায় বিচার না হওয়া এবং সর্বশেষ যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক জিএসপি সুবিধা স্থগিত করাকেও সরকারের ব্যর্থতা হিসাবে দেখছে খোদ আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকরা। যারা রাজনীতি নিয়ে তেমন একটা মাথা ঘামায় না সেই সাধারণ জনগণও অনেক ক্ষেত্রে এসব বিষয়ে ছিল সরকারের উপর বিরক্ত। এই বিষয়গুলো সদ্য সমাপ্ত চার সিটি করপোরেশনের মতো গাজীপুর সিটি নির্বাচনেও পরাজয়ে ভূমিকা রেখেছে। বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীদের নিজ যোগ্যতার চাইতেও সরকারের এই ব্যর্থতাগুলো মাথায় রেখে ভোটাররা ব্যালটের মাধ্যমে তাদের মনোভাব প্রকাশ করেছে।
দীর্ঘ একযুগ গাজীপুরে সকল সংসদীয় আসন ছিল আওয়ামী লীগের দখলে। এমনকি মেয়র ও ইউপি চেয়ারম্যানের পদগুলোও ছিল আওয়ামী লীগ সমর্থিতদের। কিন্তু আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী এডভোকেট আজমত উল্লা খানের বিশাল ভরাডুবির মধ্যদিয়ে আওয়ামী লীগের সেই শক্তিশালী দুর্গ হাতছাড়া হয়ে গেলো। আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা, তাদের কর্মী-সমর্থক, ব্যবসায়ী, সুশীল সমাজ, স্থানীয় বাসিন্দা, মিল কারখানার মালিক-শ্রমিক ও খেটে খাওয়া মানুষদের সঙ্গে আলাপকালে তারা পরাজয়ের কারণগুলো তুলে ধরেন।
এ প্রসঙ্গে গাজীপুর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সংসদ সদস্য আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেন, স্থানীয় ইস্যু নয়, জাতীয় ইস্যুই বিএনপির প্রার্থীর জয়লাভে সহযোগিতা করেছে। এখানে হেফাজত ও জামায়াতে ইসলামের প্রায় এক লাখ ভোট রয়েছে। এই ভোটগুলো গেছে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীর পক্ষে। জামায়াত ও হেফাজত কর্মীরা বিএনপির প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছে। তারা আওয়ামী লীগের বিপক্ষে ধর্মীয় অপপ্রচার চালিয়ে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করেছে।
পরাজয়ের কারণ স্থানীয় কোন্দল নয় দাবি করে মোজাম্মেল হক বলেন, সব ব্যর্থতা ঝেড়ে ফেলে রমজান মাস থেকে পুনরায় আওয়ামী লীগ কাজ শুরু করবে।
আজমত উল্লা খান ১৮ বছর ধরে টঙ্গী পৌরসভার মেয়র হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন অথচ সেই টঙ্গীতেই তার ভরাডুবি ঘটেছে।
এখানে ১৫টি ওয়ার্ডের ১৩৪টি কেন্দ্রের ১২৮টিতে বিএনপি প্রার্থী অধ্যাপক এমএ মান্নান পেয়েছেন ৮৮ হাজার ৬৬৪টি ভোট। সেখানে আজমত উল্লা খান পেয়েছেন ৬৪ হাজার ৭২৮ ভোট। বাকি ৬টি কেন্দ্রের ফলাফল প্রকাশিত হয়নি।
টঙ্গীতে এই ভরাডুবি প্রসঙ্গে স্থানীয় নেতাকর্মীরা জানান, ২০০৪ সালের ৭ মে আওয়ামী লীগের জনপ্রিয় সংসদ সদস্য আহসান উল্লাহ মাস্টার টঙ্গীর নোয়াগাঁওয়ে নিজ বাসভবনের সামনে এক সমাবেশে সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন। সমাবেশ মঞ্চে আজমত উল্লা খানও উপস্থিত ছিলেন। আহসান উল্লাহ মাস্টার নিহত হলেও অক্ষত ছিলেন আজমত উল্লা। এ বিষয়টি স্থানীয় নেতা এবং আহসান উল্লাহ মাস্টারের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সন্দেহ সৃষ্টি করে।
আজমত উল্লা টঙ্গী পৌর মেয়র থাকাকালে স্থানীয় নেতাকর্মীরা তার কাছ থেকে কোন সুবিধা পাননি। তার চাচাতো ভাই ও দুই শ্যালক দখল, টেন্ডারবাজি ও চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এ সময় এলাকার উন্নয়নে তিনি তেমন কোন কাজ করেননি। বৃষ্টি হলেই তলিয়ে যেত টঙ্গী পৌর এলাকা।
আহসান উল্লাহর ভাই মতিউর রহমান মতি স্বেচ্ছাসেবক লীগের আহ্বায়ক। তার সঙ্গেও আজমত উল্লার রয়েছে বিরোধ।
এমনকি বর্তমান সংসদ সদস্য ও আহসান উল্লাহর ছেলে জাহিদ আহসান রাসেলের সঙ্গেও ভালো সম্পর্ক গড়তে পারেননি আজমত উল্লা।
নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, টঙ্গী এলাকায় আওয়ামী লীগ তিন গ্রুপে বিভক্ত। এসব কারণেও নিজ এলাকায় আজমত উল্লার ভরাডুবি হয়েছে। তবে মোজাম্মেল হকের মতো জাহিদ আহসান রাসেলও স্থানীয় বিরোধ ও কোন্দলের কথা অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, বিএনপি এর আগে ৪টি সিটি নির্বাচনে জয়লাভ করেছে। সেই গণজোয়ারের প্রভাব পড়েছে গাজীপুর সিটি নির্বাচনেও। আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থীরাও নিজেদের ভোট প্রার্থনায় ছিলেন ব্যস্ত। তাই তারা আজমত উল্লার পক্ষে ভোট চাননি। এছাড়া জাতীয় ইস্যুর প্রভাব পড়েছে। ধর্মীয় বিষয়টি এখানে কাজ করেছে বলে তিনি জানান।
গাজীপুরের ৫৭টি কাউন্সিলর পদের মধ্যে ২৯টিতে আওয়ামী লীগ, ২৩টি বিএনপি, ২টি জাপা ও ৩টিতে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা নির্বাচিত হয়েছেন।
নেতারা জানান, জেলা কমিটি গঠন নিয়ে গাজীপুর-৩ আসনের এমপি একেএম রহমত আলীর সঙ্গে জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি এমপি আকম মোজাম্মেল হোসেন ও আজমত উল্লার বিরোধ বহু পুরনো।
বহু বছর ধরে জেলা কমিটির সভাপতি আ ফ ম মোজাম্মেল হক ও আজমত উল্লা সাধারণ সম্পাদক হিসাবে একক আধিপত্য বিস্তার করে আসছেন। এজন্য জেলা কমিটিতে একেএম রহমত আলীর নেতাকর্মীরা ঠাঁই পাননি। আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলমের ইস্যুটিও নির্বাচনে প্রভাব ফেলেছে। জাহাঙ্গীর আলম যেভাবে টিভি চ্যানেলে কান্না বিজড়িত কণ্ঠে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন তা আজমত উল্লার বিপক্ষে চলে যায়। এমন মন্তব্য করেছে সরকারের একটি শক্তিশালী গোয়েন্দা সংস্থা।
জাহাঙ্গীর আলম সাংবাদিকদের বলেন, আজমত উল্লা প্রধানমন্ত্রীর আশেপাশের লোকজনকে সন্তুষ্ট করতে ব্যস্ত ছিলেন। স্থানীয় নেতাকর্মীদের তিনি সময় দেননি। তার কাছে যাওয়া সব সময় সম্ভব হতো না। জেলা আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব ও দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা প্রধানমন্ত্রীকে গাজীপুরের সঠিক তথ্য দেননি। মাঠের সঠিক তথ্য না দিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে বিভ্রান্ত করেছেন বলে তিনি জানান।
স্থানীয় শ্রমিক নেতারা বলেন, গাজীপুরে স্থায়ী বাসিন্দা ৩৮ শতাংশ। বাকি সবাই বহিরাগত। তারা বাইরে থেকে এসে বসবাস করেন কিংবা মিল-কারখানায় কাজ করেন। তাদের কাছে স্থানীয় বিরোধের চেয়ে জাতীয় ইস্যু বেশি প্রাধান্য পেয়েছে।
অনেক নেতাকর্মী বলেন, শেষ মুহূর্তে এরশাদের মহাজোটের প্রার্থীকে সমর্থনও আজমতের পক্ষে কোন সুফল বয়ে আনেনি।
নির্বাচনে পরাজয়ের পর আজমত উল্লা বলেন, আমার সঙ্গে কোন নেতার বিরোধ নেই। আমার ভাগ্যে যা ছিল তাই মেনে নিয়েছি।
