আড়াই হাজার বছরের প্রাচীন নগরী পুণ্ড্রবর্ধনের বর্তমান নাম মহাস্থান গড়। এই মহাস্থান গড়ের পূর্বপ্রান্ত দিয়ে প্রবহিত করতোয়া নদী। আর উত্তর, দক্ষিণ ও পশ্চিম প্রান্তের ১৫ কিলোমিটার জুরে মাটির নীচে রয়েছে প্রাচীন দুর্লভ প্রত্নসামগ্রী। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অবহেলা আর উদাসীনতার কারণে এই এলাকা থেকে চুরি হয়ে যাচ্ছে বহু মূল্যবান পুরাকৃতি। পাশাপাশি প্রাচীন ঐতিহ্য বহনকারী টিলা বা ঢিবি কেটে বাড়ি ঘর নির্মাণ এবং আবাদি জমি তৈরি যে যার মতো দখল করে নিয়েছে মহাস্থান গড় ও তার আশে পাশের জায়গা। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধীনে যে ৩৩টি টিলা বা ঢিবি রয়েছে সেগুলোও দিনে দিনে ধ্বংস করে আবাদি জমি এবং বাড়িঘর তৈরি করা হচ্ছে। তবে মহাস্থান গড় সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী পুলিশের পদক্ষেপে বর্তমানে কিছুটা হলেও বন্ধ রয়েছে টিলা কেটে জমি তৈরি এবং বিভিন্ন স্থানে খনন কাজ।১৯২৯ সালে প্রভাত চন্দ্র সেন ‘মহাস্থান এন্ড ইনভিরন্স’ গ্রন্থে বৃটিশ আর্কোলজি’র একটি মানচিত্র ছেপেছিলেন। মানচিত্রের শিরোনাম ছিল মহাস্থানগড় ও তত্সংলগ্ন প্রত্নসম্পদের মানচিত্র। ওই মানচিত্রে দেখা যায়, মহাস্থান নগরী প্রশাসনিক কেন্দ্রবিন্দু উত্তরে নরসিংহের ধাপ, দক্ষিণ প্রান্তে মসজিদের পর দরগা, দরগা থেকে অর্ধ কিলোমিটার দূরে রাজা পরশুরামের বাড়ি, তারপর বৈরাগীর ধাপ, পরশুরামের মূল প্রাসাদের পশ্চিমে কালিদহ সাগর, দক্ষিণে বাড়ানশির খাল, পূর্বে করতোয়া নদী। নদী ও খাল বেষ্টিত সুরক্ষিত ছিল রাজা পরশুরামের মূল ভবন এবং প্রশাসনিক দপ্তর। এছাড়াও পুণ্ড্রবর্ধনের ১৫ কিলোমিটার এলাকায় প্রত্নতত্ত্ব নির্দশন এলাকা হলো-উত্তরে ভাসুবিহার লালনদা বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা, বিহার গ্রাম, চক দৌলতপুর, জাতপনরটিকা, শুরদিঘীর ধাপ, সবদলদীঘি, শাচিয়ান, দৌলতপুর, শ্যামপুর, ধলমহনী, মথুরা, চিংগেসপুর, চকসেকেন্দারবাদ, দক্ষিন-পশ্চিমে বড়সরলপুর, টেংরা, বামনপাড়া, সরলপুর, পলাশবাড়ি। দক্ষিণ-পূর্বে গোকুল, বাঘোপাড়া। দক্ষিণ-পশ্চিমে চাঁদমুহা হরিপুর, শশিবদনী, রজাকপুর. পিরাপাঠ যুগির ভবন, আড়োলা, আশোকোলা (ভিমেড় জাঙ্গাল, দশটিকা, চানপুর, বারপুর, নওদাপাড়া, রামশহর, বাঘোপাড়া। মহাস্থান গড়ের আশে পাশের গ্রাম গুলো ঘুরে দেখা গেছে অসংখ্য টিলা এবং ঢিবির ধ্বংসাবশেষ। স্থানীয় লোকজন এসব ঢিবি খনন কালে দুর্লভ অনেক পুরাকৃতি পাওয়া গেছে। পাশাপাশি খনন করে পাওয়া প্রচীন ইট পাথর গুলো ব্যবহার করা হয়েছে বাড়ি ঘর তৈরির কাজে। বছরের পর বছর এলাকাবাসী খনন কাজ চালিয়ে গেলেও সংশি¬ষ্ট কর্তৃপক্ষের টনক নড়েনি এতদিন। বছর দেড়েক আগে মহাস্থান গড় রক্ষায় হাইকোর্টের নির্দেশনার পর নড়েচড়ে বসেছে প্রত্নত্বত্ত বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসন। মহাস্থান গড় ও তার আশে পাশে শুরু করা হয়েছে নজরদারি। কেউ যেন একটি ইট খুলে নিতে না পারে সেজন্য পুলিশের পক্ষ থেকে মাইকিং করা হয়েছে অনেক আগেই। পাশাপাশি নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। মহাস্থান যাদুঘরের কাস্টোডিয়ান সাদেকুজ্জামান জানান এই এলাকায় মাটির নীচে এখনও প্রচুর প্রত্নসামগ্রী রয়েছে। তিনি বলেন, মহাস্থান গড়ের আশেপাশে ১৫ কিলোমিটারের মধ্যে মাটি ২০/২৫ ফুট খনন করলেই পাওয়া যায় পুরাকৃতি। এ কারণে ইতিপূর্বে স্থানীয় লোকজন উঁচু ঢিবি বা মাউন্ট কেটে পুরাকৃতি ধ্বংস করছে। তিনি বলেন, ৩৩টি মাউন্ট সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা করা হলেও সেগুলোও ধ্বংস করা হয়েছে অনেক আগেই। মহাস্থান বিশ্বের অন্যতম দর্শনীয় স্থান। সরকারি অর্থ সংকুলান নাহওয়ায় পুরাকৃতি রক্ষণাবেক্ষণ সমস্যা হচ্ছে। তিনি আরো জানান, হাইকোর্টের নির্দেশনা ছাড়াও ১৯৬৮ সালের পুরাকৃতি সংরক্ষণ আইনে বলা আছে, এসব প্রাচীন ঐতিহ্য কেউ বিনষ্ট করতে পারবে না।
