উত্তরাঞ্চলের প্রবেশদ্বার এক ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন জনপদ বগুড়া। পৌরাণিক এবং প্রাচীনকালের ইতিহাসে বগুড়া দখল করে আছে এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান। প্রাচীন পুন্ডু রাজ্যের রাজধানী পুন্ড্রবর্ধনই হচ্ছে এ বগুড়া জেলা। মৌর্য, গুপ্ত, পাল, সেন প্রভৃতি রাজাদের প্রশাসনিক কেন্দ্র ছিল প্রাচীন জনপদ বগুড়া। প্রাচীন এই জেলার ইতিহাস ,ঐতিহ্য , সম্ভাবনা ও সমস্যা নিয়ে এই প্রতিবেদন । লিখেছেন আমাদের জেলা প্রতিনিধি জি এম সজল ।
বগুড়া । উত্তরবঙ্গের শিল্প ও বাণিজ্যিক শহর । ইতিহাস ঐতিহ্যের দিক দিয়েও রয়েছে এর আলাদা পরিচিতি । প্রাচ্যের রাজধানী খ্যাত পুন্ড্রনগরী “মহাস্থান” এ জেলায় অবস্থিত হওয়ায় বিশ্ববাসীর কাছে সমধিক পরিচিত করতোয়ার কোল ঘেষে গড়ে ওঠা এই প্রাচীন জেলা শহর । এটি বর্তমানে রাজশাহী বিভাগের অন্তর্গত । দেশের সবচে বড় পৌরসভা বগুড়া । ২১ টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত এই পৌরসভার আয়তন ৭১.৫৬ বর্গকিলোমিটার । ১২ টি উপজেলা নিয়ে গঠিত এই জেলার মোট আয়তন ২৮৯৮ বর্গ কিঃমিঃ । সুস্বাদু “দই” এর জন্য দেশজুড়ে রয়েছে আলাদা খ্যাতি । কৃষি সমৃদ্ধ উর্বর মাটির জেলা বগুড়া খাদ্য উদ্বৃত্ত্ব অঞ্চল হিসেবে বিবেচিত । এছাড়াও সবজি উত্পাদনে এখন দেশের অন্যতম জেলা । একসময়ের শিল্প নগরী বগুড়ার বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন কারণে বন্ধ হয়ে পড়লেও সামপ্রতিক সময়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের অঞ্চল হিসেবে দেশ বিদেশে আলাদা পরিচিতি লাভ করেছে । এখানকার হালকা প্রকৌশল শিল্প তথা উত্পাদিত কৃষি যন্ত্রপাতি, টিউবওয়েল, নকশীঁকাঁথা , মহিলাদের হাতে তৈরি ক্রুশ কাটার টুপি , বেত শিল্প সহ হস্ত ও কুটির শিল্পের নানা সামগ্রী বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে । দেশের অর্থনীতিতে বৈদিশিক মুদ্রা আয়ের নতুন পথ খুলে দিয়েছে এসব শিল্প । এছাড়াও এখানে রয়েছে ৫শ”শয্যার মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, সান্তহার রেলওয়ে জংশন, “শহীদ চান্দু ”আর্ন্জাতিক মানের ক্রিকেট স্টেডিয়াম, স্বনামধন্য সরকারি আযিযুল হক কলেজ । বগুড়া শহর থেকে ১১ কিঃমিঃ উত্তরে অবস্থিত “মহাস্থান গড়” ইতিহাস ঐতিহ্যের লীলাভুমি হিসেবে বিবেচিত । যা একসময় প্রাচীন বাংলার রাজধানী “পুন্ড্রনগর ” নামে পরিচিত ছিল ।
নামকরণ ঃ বগুড়ার নামকরণের ইতিহাস সম্পর্কে যা জানা যায়, সুলতান গিয়াস উদ্দিন বলবনের পুত্র সুলতান নাসির উদ্দিন বগরা খান ১২৭৯ থেকে ১২৮২ পর্যন্ত এ অঞ্চলের শাসক ছিলেন। তাঁর নামানুসারে এ অঞ্চলের নাম হয়েছে বগরা বা বগুড়া। ভৌগোলিক অবস্থান ঃ ৮৯.০০ ডিগ্রি পূর্ব থেকে ৮৯.৪০ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশ এবং ২৪.৩০ ডিগ্রি উত্তর থেকে ২৫.১০ ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশে বগুড়া জেলা অবস্থিত। সীমানাঃ উত্তরে গাইবান্ধা ও জয়পুরহাট জেলা, দক্ষিণে নাটোর ও সিরাজগঞ্জ জেলা, পূর্বে জামালপুর ও সিরাজগঞ্জ জেলা এবং পশ্চিমে জয়পুরহাট ও নওগাঁ জেলা। হিসেবে জেলায় শিক্ষার হার শতকরা ৫৩ ভাগ ।
বড় বড় শিল্প কল কারখানা বন্ধ হয়ে পড়ায় জেলায় বেকারদের কর্মসংস্থানের অভাব যথেষ্ট। জেলার পূর্ব প্রান্তের ৩টি উপজেলা সারিয়াকান্দি, সোনাতলা ও ধুনটে যমুনা নদীর ভাঙন এবং বর্ষাকালে বন্যার কারণে বিস্তীর্ণ এলাকায় জলাবদ্ধতা ও ফসলহানি একটি বড় সমস্যা । সারিয়াকান্দি উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত বাঙালি নদী ও যমুনা নদী ভাঙনের ফলে ইতোমধ্যেই বিলনি হয়েছে অনেক জনপদ । এদুটি নদীর ভাঙ্গন রোধে আরও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে নদী দুটি একত্রিত হয়ে বিশাল জনপদকে নদীগর্ভে বিলীন করতে পারে। সেইসাথে জেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত করতোয়া নদীর নাব্যতা হ্রাস পেয়ে একটি এখন মরা নদীতে পরিণত হবার উপক্রম হয়েছে । এটি একটি বড় সমস্যা ।
এছাড়াও নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুতের অভাবে বিসিক শিল্পনগরিতে শিল্পায়নে গতি যেমন কমেছে , তেমনি দ্বিতীয় বিসিক প্রকল্প গ্রহণ না করায় জায়গার অভাবে এলাকায় নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছেনা । সেইসাথে জেলা শহরকে দুভাগে ভাগ করেছে শহরের মধ্য দিয়ে রেল লাইন । ফলে মূল শহরের মধ্যে দিনে রাতে মোট ২৮ বার ট্রেন চলাচল করায় যানজটের কবলে পড়ে প্রতিনিয়ত নাকাল হন মানুষ ।
বগুড়া জেলা উত্তরবঙ্গের শস্যভান্ডার । কিন্তু এ জেলায় উত্পাদিত বিপুল পরিমাণ খাদ্যশস্য সঞ্চিতির জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক সংরক্ষণাগারের অভাব রয়েছে। বগুড়া সদরের পৌর এলাকায় মাধ্যমিক পর্যায়ে সরকারি ২টি বগুড়া জিলা স্কুল ও বগুড়া সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থাকলেও ,তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।বগুড়ায় প্রতিবছর পার্শ্ববর্তী জেলা সিরাজগঞ্জ, জয়পুরহাট, নওগাঁ ও গাইবান্ধা হতে বিপুল সংখ্যক মানুষ স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য আসছে । ফলে বগুড়া জেলার জনসংখ্যা ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু এত মানুষের সন্তান সন্ততি সহ এই এলাকার ছাত্র-ছাত্রীদের উচ্চ শিক্ষার জন্য জেলায় কোন বিশ্ব বিদ্যালয় নেই । একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য জেলাবাসীর দাবি দীর্ঘ দিনের । সেইসাথে দেশের সবচে বড় পৌরসভা হিসেবে বিবেচিত বগুড়াকে সিটি কর্পোরেশন ঘোষণা করা হলে উন্নয়ন আরও ত্বরাণিত্ব হবে এমনটাই অভিমত এঅঞ্চলের জনমানুষের । এছাড়াও নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুতের অভাবে বিসিক শিল্পনগরিতে শিল্পায়নে গতি যেমন কমেছে , তেমনি দ্বিতীয় বিসিক প্রকল্প গ্রহণ না করায় জায়গার অভাবে এলাকায় নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছেনা । সেইসাথে জেলা শহরকে দুভাগে ভাগ করেছে শহরের মধ্য দিয়ে রেল লাইন । ফলে মূল শহরের মধ্যে দিনে রাতে মোট ২৮ বার ট্রেন চলাচল করায় যানজটের কবলে পড়ে প্রতিনিয়ত নাকাল হন মানুষ ।
জেলার বিশিষ্ঠ ব্যবসায়ীরা অভিমত ব্যক্ত করে বলেছেন, এ জেলায় একটি বিমান বন্দর অতি জরুরি ।তাহলে জেলার উত্পাদিতব্যবসা বাণিজ্যের ক্ষেত্রে তা ইতিবাচক প্রভাব রাখবে । সেইসাথে বিশ্ব বিদ্যালয় , স্থাপন , শহরের মধ্য দিয়ে স্থাপিত রেল লাইন সরিয়ে শহরতল িদিয়ে সিরাজগঞ্জে যমুনা সেতুর সাথে সরাসরি রেল যোগাযোগ স্থাপন , শিল্প পার্ক , ভারী শিল্পের জন্য অধিগ্রহণকৃত জমিতে অতি সত্ত্বর শিল্প কারখানা স্থাপন , দ্বিতীয় বিসিক এর কার্যক্রম শুরু জেলার উন্নয়নকে এগিয়ে নিবে কয়েকগুন ।
উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব ঃ মোহাম্মদ আলী বগ্ড়া (পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী),সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান (বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা, মহান স্বাধীনতাযুদ্ধে “জেডফোর্স ” এর অধিনায়ক), এম. আর আখতার মুকুল (চরমপত্র পাঠকারী ), রোমেনা আফাজ (সাহিত্যিক , তার লেখা গোয়েন্দা কাহিনী “দস্যু বনহুর” পাঠক সমাদৃত), আখতারুজ্জামান ইলিয়াস (সাহিত্যিক) , খুরশীদ আলম (শিল্পী),আঞ্জুমনোয়ারা বেগম (শিল্পী),আজমল হুদা মিঠু (চলচ্চিত্রকার), তাজমিলুর রহমান (শিক্ষাবিদ) , ভাষা সৈনিক সাংবাদিক আব্দুল মতিন, এ্যাডঃ গাজীউল হক (ভাষা সৈনিক), ডঃ লুত্ফর রহমান সরকার ( সাবেক গভর্ণর ,বাংলাদেশ ব্যাংক ), আব্দুল মান্নান (সাবেক প্রচার সম্পাদক, বাংরাদেশ আওয়ামীলীগ, বর্তমানে বগুড়া -১ আসনের সংসদ সদস্য ) , যাহেদুর রহমান যাদু(প্রবীণ সাংবাদিক), আমানউল্লাহ খান (সাবেক সংসদ সদস্য, প্রবীণ রাজণীতিবিদ , স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম প্রকাশি আঞ্চলিক পত্রিকা “দৈনিক বাংলাদেশ ” পত্রিকার সম্পাদক ,তিনি দীর্ঘদি দৈনিক ইত্তেফাকের সাথে জড়িত ছিলেন ), লায়ন মোজাম্মেল হক লালু, এম জে এফ (স্বনামধন্য আঞ্চলিক পত্রিকা “দৈনিক করতোয়া” এর সম্পাদক , সমাজ সেবক ), ড.অধ্যাপক হোসনে আরা (এশিযার বৃহত্ স্বেচ্ছাসেবী নারী সংগঠন ঠেঙ্গামারা মহিলা সবুজ সংঘ“টিএমএসএস” এর নির্বাহী পরিচালক ), মুশফিকুর রহিম মিতু (বর্তমানে জাতীয় ক্রিকেট দলের অধিনায়ক), শফিউল ইসলাম সুহাস (জাতীয় দলের ক্রিকেটার), মাহমুদুর রহমান মান্না (রাজনীতিবিদ) সহ অসংখ্য গুণি ও দেশজোড়া মানুষের জন্ম এই জেলায় ।
