মাতৃভাষাকে ঘিরে যে গণআন্দোলন হয়েছিল ১৯৫২ সালে তা শুধু ঢাকা শহরে সীমাবদ্ধ ছিল না। দেশের প্রতিটি প্রান্তে সেই আন্দোলনের আগুন ছড়িয়ে গিয়েছিল। ভাষা আন্দোলনে বগুড়া জেলার মানুষের ভূমিকা সমৃদ্ধ এবং উজ্জ্বল।
গণ-পরিষদে খাজা নাজিম উদ্দিনের বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার বিরুদ্ধে ন্যাক্কারজনক ভূমিকার তাত্ক্ষণিক প্রতিবাদ করা তখন ভীষণ জরুরি হয়ে পড়েছিল। তাই কবি ও অধ্যাপক আতাউর রহমানের সভাপতিত্বে প্রথমবারের মতো একটি প্রতিবাদ সভার আয়োজন করা হয় ১৯৪৮ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি। সভা পরিচালনার জায়গা হিসেবে বেছে নেয়া হয় আযিযুল হক কলেজের প্রাঙ্গণ। ছাত্র ফেডারেশন ও কমিউনিস্ট পার্টি এই আন্দোলনে সরাসরি ভূমিকা পালন করে। আযিযুল হক কলেজ থেকে ছাত্র ফেডারেশনের নেতা ও সাহিত্য কর্মী মুহম্মদ আব্দুল মতীনের নেতৃত্বে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের হলে সেখানে হামলা চালায় মুসলিম লীগের নেতা ও সমর্থকরা। মিছিলটি কলেজ থেকে বের হবার পরেই তারা হামলার প্রস্তুতি নিতে থাকে। মিছিলটি সাতমাথায় এলে তারা দলবেধে হামলা চালায়। ফলে বেশ কয়েকজন আহত হয়।
ভাষা আন্দোলনে ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ একটি গুরুত্বপূর্ণ তারিখ। এদিন আযিযুল হক কলেজে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয় যার উদ্দেশ্য ছিল প্রদেশব্যাপী (তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তান) ধর্মঘট পালন সফল করা। কবি আতাউর রহমানকে আহ্বায়ক করে গঠিত সেই কমিটিতে নারীদের অংশগ্রহণ ছিল। গোলাম মহিউদ্দিনের বোন সালেহা খাতুন এবং ডাঃ মোজাফফর আহমেদের বোন রহিমা খাতুনের সেই কমিটিতে সম্পৃক্ততা ছিল। এদিন আযিযুল হক কলেজ থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল শহর প্রদক্ষিণ করার জন্য বেরিয়ে পড়ে। এই মিছিলে প্রথম সারিতে ছিলেন ভাষাসৈনিক গাজিউল হক।
ভাষা আন্দোলনে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালনকারীদের মধ্যে আরো আছেন, কবি রোস্তাম আলী কর্ণপুরী, মোশাররফ হোসেন মন্ডল, অ্যাড. হারুন-উর-রশিদ, কমরেড মোখলেসুর রহমান, আব্দুর রহিম সওদাগর মতিন, সাদেক আলী আহমদ, ডাঃ ননী গোপাল দেবদাস. এ.কে মুজিবুর রহমান, ডাঃ এনামুল হক, ডাঃ সি.এম ইদরিস, ডাঃ আজিজুল হক, আলী আহমদ ও দূর্গাদাস মুখার্জী।
১৯৪৮ সালে ভাষা আন্দোলনকে ঘিরে যে অপূর্ব কর্মসচলতা গড়ে ওঠে ১৯৪৯ সালে এসে সেই সচলতাকে বাধা দেবার জন্যে মরিয়া হয়ে ওঠে শাসকগোষ্ঠী। এবছরের প্রথমদিকে আযিযুল হক কলেজের ছাত্র-শিক্ষকরা, বিড়ি শ্রমিক এবং সাহিত্য সাংস্কৃতিক সংগঠনের কর্মীরা মিছিল করে নিয়মিত বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে থাকে। তাদের সঙ্গে যোগ দেয় স্কুল পড়ুয়া ছাত্র-ছাত্রীরাও। ১৭ এপ্রিল আযিযুল হক কলেজ থেকে একটি বড়ো বিক্ষোভ মিছিল শহর প্রদক্ষিণ করতে বের হয়। এদিন পূর্ব পাকিস্তানজুড়ে ছাত্র ধর্মঘট পালন করা হয়। এর মূল কারণ ছিল, শাসকগোষ্ঠীর অন্যায়ের প্রতিবাদ করায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ ও ছাত্র বহিষ্কার। সেদিন বগুড়ার রাজপথ কাঁপিয়ে বিক্ষোভ মিছিল চলতে থাকলে দ্বিতীবারের মতো মুসলীম লীগ ও অবাঙালাির মিছিলের ওপর লাঠিসোঁটা হামলা চালায়। মিছিলে অংশ নেয়া শিক্ষক-ছাত্র-শ্রমিকসহ স্কুলের কিশোরীরা পর্যন্ত অত্যাচারের শিকার হন। মিছিলের নেতা আবদুস শহীদ ও ভিএম স্কুলের ছাত্রীনেত্রী সালেহা বেগমসহ কয়েকজন মিছিলকারী মারাত্মক আহত হন। ১৯৫০ সাল বগুড়ায় ভাষা আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া দূরহ হয়ে ওঠে। আন্দোলন যাতে দানা বেধে উঠতে না পারে সে জন্যে তারা পুলিশ ও গোয়েন্দাবাহিনীকে লেলিয়ে দেয় আন্দোলনকারীদের ওপর। গ্রেফতার হন অসংখ্য ছাত্র-শ্রমিক-কৃষক-শিল্পী-সাহিত্যিক ও রাজনৈতিক নেতা-কর্মী। কঠোর দমন-পীড়নের ফলে আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী মানুষদের সাথে সাধারণ জনগনের যোগাযোগ অনেকটাই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
১৯৫১ সালের মাঝামাঝি কমিউনিস্ট পার্টি একটি ‘কন্ট্রাক্ট কমিটি’ তৈরি করে এর মাধ্যমে আন্দোলনকে সংগঠিত করার চেষ্টা করে। এই কমিটির কাজ ছিল, আন্দোলনকে একটি সর্বদলীয় আন্দোলনের রূপ দেয়া এবং একটি সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা। এই কমিটির মাধ্যমেই জননেতা মাওলানা ভাসানীর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে আন্দোলনকে গতিশীল করে তোলা হয়। শেষ পর্যন্ত ১৯৫২ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের কমিটি গঠন করা সম্ভব হয়।
১৭ ফেব্রুয়ারি বগুড়ার থানা রোডে (বর্তমান কবি নজরুল ইসলাম সড়ক) ছাত্রনেতা আবদুস শহীদের পিতা আবদুল ওহাব ভলিফার ক্রিতল বাসার নিচতলার হলঘরে বিপুলসংখ্যক প্রতিনিধি নিয়ে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিনিধি সভায় প্রবীণ রাজনীতিবিদ মজির উদ্দিন আহমেদকে সভাপতি, কৃষক নেদা আবদুল আজীজ কবিরাজ ভিষকরত্ন-কে সহ-সভাপতি এবং ছাত্রনেতা গোলাম মহিউদ্দিনকে আহ্বায়ক করে ১৭ সদস্যবিশিষ্ট সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি, বগুড়া শাখা গঠন করা হয়।
কমিটির তালিকা উদ্ধৃত করছি। তালিকাটিতে ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহনকারীদের ব্যাপকতা ও সংহতি আন্তরিকভাবে ফুটে উঠেছে।
সভাপতি: অধুনালুপ্ত সাপ্তাহিক ‘নিশান’ পত্রিকার প্রবীণ সম্পাদক-সাংবাদিক, যুক্তফ্রন্ট দলীয় প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য মজির উদ্দিন আহমেদ। সম্পাদক: গোলাম মহিউদ্দিন। অন্যদের মধ্যে ছিলেন, শেখ মহিউদ্দিন, শেখ হারুনুর রশীদ, ছমির উদ্দিন মণ্ডল, এ.কে মজিবুর রহমান (পরে এমপি হয়েছিলেন), কবিরাজ শেখ আবুদল আজিজ, সিরাজুল ইসলাম, আবদুস শহীদ, নুরুল হোসেন মোল্লা ( তত্কালীন বগুড়া উডবার্ন পাবলিক লাইব্রেরির গ্রন্থাগারিক), মোটরশ্রমিক নেতা সুবোধ লাহিড়ী, আবদুর রহিম সওদাগর মতিন, বিড়ি শ্রমিক নেতা শাহ আহমেদ হোসেন, রিকশা শ্রমিক নেতা মোখলেসুর রহমান, কৃষক নেতা ফজলুর রহমান, তমদ্দুন মজলিসের কবি-সাহিত্যিক খোন্দকার রোস্তম আলী কর্ণপুরি, লুত্ফর রহমান সরকার (পরে গভর্নর হয়েছিলেন), কৃষক প্রজাপার্টির নেতা কবিরাজ মোফাজ্জল বারী।
এই কমিটি গঠন হবার পর পরই বগুড়ায় ভাষা আন্দোলন বেগবান হয়। ১৮ ও ১৯ ফেব্রুয়ারি এই কমিটির আহ্বানে জিলা স্কুল ময়দানে বিশাল জনসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় মিছিলে গুলিবর্ষণে হতাহতের ঘটনা জানামাত্র বগুড়ায় দিনব্যাপী হরতাল পালিত হয়। পরের দিনও হরতাল ও বিক্ষোভ প্রদর্শন চলতে থাকে। সেদিন থেকে টানা ১৮ দিন বগুড়ার সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালন করা হয়। এরপর ধারাবাহিকভাবে এই আন্দোলন চলতে থাকে। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাংলা ভাষাকে স্বীকৃতি না দেয়া পর্যন্ত বগুড়া ভাষা আন্দোলনের গতি উজ্জ্বলতর হয়ে উজ্জীবীত থেকেছে।
লেখক: ছড়াকার ও সংবাদকর্মী।
