ঘুষ বাণিজ্য ভবন!

আপডেট : ০৮ জুলাই ২০১৩, ২২:৪৫
দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নানা কাজে আসা শিক্ষকদের ব্যাপক হয়রানি করা হয় শিক্ষাভবনে। টাকা না দিলে পদে পদে হয়রানি করা হয় শিক্ষকদের। হয়রানির হাত থেকে রক্ষা পেতে বেতনের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ তুলে দেন শিক্ষকরা শিক্ষাভবনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে। আর এগুলো মুখ বুঁজে সহ্য করা ছাড়া বিকল্প কিছু নেই শিক্ষকদের। আবার অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর রয়েছে নিজস্ব দালাল, যিনি ওই কর্মকর্ত-কর্মচারীর হয়ে ঘুষ নির্ধারণ ও গ্রহণ করেন। গত কয়েকদিন শিক্ষাভবনে ঘুরে এবং শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নানা সুযোগ-সুবিধা পাইয়ের দেয়ার নামে শিক্ষকদের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন ভবনে থাকা দালালচক্ররা। ভবনের নির্দিষ্ট কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর পক্ষে এসব দালাল কাজ করছেন। সকাল ৯ থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত তারা এখানে অবস্থান করেন। এদের চালচলন দেখে সাধারণ শিক্ষকরা বুঝতেও পারেন না এরা শিক্ষাভবনের কোন কর্মকর্তা বা কর্মচারী নন। এরা সংশ্লিষ্ট শাখার কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সঙ্গে খুবই ঘনিষ্ঠভাবে চলাফেরা করেন। অফিসের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র তাদের হাতে দেখা যায়। কোন শিক্ষক কোন কাজের জন্য সংশ্লিষ্ট শাখায় এলে শিক্ষকদের তুলে দেন দালালদের হাতে। দালালদের মাধ্যমেই সব টাকা লেনদেন হয়। একাধিক সূত্র জানিয়েছে, কোন শিক্ষকের এমপিও বা টাইম স্কেলের জন্য বিভিন্ন কাগজপত্র ডাকযোগে শিক্ষাভবনে পাঠান। দীর্ঘদিনেও কোন ফল না পেয়ে শিক্ষকরা সরাসরি ঢাকা চলে আসেন। সকাল ৯টায় উপস্থিত হন শিক্ষাভবনের গেটে। শিক্ষাভবনের বাইরে থাকা নিরাপত্তাকর্মীরা তাদের আটকে দেয়। কোন কোন শিক্ষক সুযোগ খুঁজে নিরাপত্তা কর্মীর চোখ ফাঁকি দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করেন। সংশ্লিষ্ট শাখায় গিয়ে কর্মকর্তাদের সাথে দেখা করেন। ওই কর্মকর্তা তখন তার সহচার্যে থাকা এক দালালকে দেখিয়ে দিয়ে শিক্ষককে বলেন, উনার সাথে যোগাযোগ রাখবেন। উনি আপনাকে সব খবর জানাবেন। পরে ওই দালাল শিক্ষককে ভবনের বাইরে নিয়ে গিয়ে বিভিন্ন অংকের টাকা দাবি করেন এবং শিক্ষক তার টাইম স্কেল বা এমপিও পাওয়া নিশ্চিত করতে দালালের হাতে টাকা তুলে দেন। শিক্ষকরা জানিয়েছেন, যারা ভবনের ভেতরে প্রবেশ করতে পারেন না বাইরে থাকা একশ্রেণির দালাল তাদের কাজ করিয়ে দেয়ার নামে টাকা দাবি করেন এবং নিরাপত্তাকর্মীদের সামনে দিয়েই সংশ্লিষ্ট শাখায় নিয়ে যান। মেহেরপুরের শলিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক আব্দুল আউয়াল। তিনি ওই বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক। টাইম স্কেলের জন্য তিনি দীর্ঘদিন ঘুরছেন। অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট শাখায় এসে তিনি ধরনাও দিয়েছেন। পরে এই শাখার কর্মচারী কামরুজ্জামান পরিচয় করিয়ে দেন আব্দুর রহিম নামের এক দালালের সাথে। গতকাল সোমবার এই দালাল রহিম শিক্ষাভবনের ভেতরে দক্ষিণ পাশে নিয়ে যান শিক্ষক আব্দুল আউয়ালকে। গাড়ির আড়ালে থেকে শিক্ষকের কাছ থেকে টাকা নেন আব্দুর রহিম। প্রথমে দালাল রহিমকে এক হাজার টাকা দেন শিক্ষক আউয়াল। রহিম আরো টাকা দাবি করলে উক্ত শিক্ষক তার মানিব্যাগ থেকে আরো ৫শ টাকার একটি নোট বের করে দেন। কিন্তু এতেও সন্তুষ্ট নন দালাল রহিম। পরে শিক্ষক আরো ৫শ টাকা ঘুষ দেন রহিমকে। পরে রহিম চলে যান। এর কিছু পরে ওই শিক্ষককে প্রশ্ন করা হলো ওই ব্যক্তিকে কেন টাকা দিলেন? শিক্ষক জানান, কাজ করিয়ে দেবে, খোঁজ-খবর রাখবে, এ কারণে টাকা দিয়েছি। ফুলবাড়িয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক সিফাত আলী। তিনিও টাইম স্কেলের জন্য শিক্ষাভবনে ঘুরছেন। তার কাছে সংশ্লিষ্ট শাখার কর্মচারী দালাল রহিমের মাধ্যমে ১৫ হাজার টাকা দাবি করেন। টাকার অংক বেশি হওয়ায় টাকা দিতে রাজি হননি সিফাত আলী। পরে এই দুই শিক্ষককে গতকাল অধিদপ্তরের পরিচালক (কলেজ ও প্রশাসন) অধ্যাপক আতাউর রহমানের কাছে নিয়ে গেলে প্রথমে তারা টাকা দেয়ার কথা অস্বীকার করেন। তারা সাংবাদিকদের বলেন, টাকার কথা বললে আমাদের পরবর্তীতে অনেক সমস্যা করতে পারে। পরে তাদের অভয় দেয়া হলে ঘুষ দেয়ার কথা স্বীকার করেন। সিফাত আলী বলেন, কাজ করে দেয়ার কথা বলে তার কাছে ১৫ হাজার টাকা দাবি করেছিল। কিন্তু এখনো টাকা দেইনি। আউয়াল বলেন, আমি দুই হাজার টাকা দিয়েছি। পরে পরিচালকের কক্ষে ডাকা হয় মেহেরপুরের দায়িত্বে থাকা কর্মচারী কামরুজ্জামানকে। তিনি বলেন, আমি রহিমকে চিনি না। তবে এই রহিম অন্য এক শাখার কর্মচারী মনিরের সাথে কাজ করে। আমারও অবস্থান দালাল রহিমের বিরুদ্ধে। অধ্যাপক আতাউর রহমান বলেন, বাইরের একটি চক্র শিক্ষাভবনের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে। শিক্ষকদের কাছ থেকে টাকা নিচ্ছে। উপ-পরিচালক (মাধ্যমিক) সাধন চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, এখানকার কর্মচারীরা এ কাজে জড়িত নয়। বাইরের দালালচক্র এসব কাজ করছে। পরে তিনি সংশ্লিষ্ট দুই শিক্ষককে প্রশ্ন করেন, তোমরা কাজের জন্য আমার কাছে আস না কেন? কেন পিয়নদের কাছে যাও ? এর উত্তরে শিক্ষকরা তাকে বলেন, গেটের নিরাপত্তাকর্মীরা আমাদের আটকে দেয়। কিন্তু দালালচক্র এই প্রতিষ্ঠানের কেউ না হয়েও ভেতরে প্রবেশ করে। এদের নিরাপত্তাকর্মী বাধা দেয় না। শিক্ষকদের এমন জবাবের পর উপ-পরিচালক নীরব ছিলেন। দালাল রহিমের সাথে মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে প্রথমে তিনি মেহেরপুর জেলার দায়িত্বে থাকা কর্মচারী কামরুজ্জামানকে দায়ী করেন। পরে তিনি বলেন, আমি এই প্রতিষ্ঠানের কেউ নই। আমি মাধ্যমিক শাখার সবার কাজ করি। যে যা করতে বলে আমি তাই করি। অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, এ প্রতিষ্ঠানের ঘুষ বাণিজ্য বন্ধ হবার কোন কারণ দেখছি না। ঘুষ বাণিজ্য বন্ধ করার জন্য প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব কোন উদ্যোগ নেই। প্রতিষ্ঠান কঠোর হলে দালালরা কীভাবে প্রতিষ্ঠানের ভেতরে প্রবেশ করে।