আন্দামান সাগরে ডুবে যাওয়া ‘এমভি হোপ’ জাহাজের উদ্ধারপ্রাপ্ত ৫ নাবিক গতকাল সোমবার সকালে চট্টগ্রামে পৌঁছেছেন। রবিবার রাত ৯টায় এই ৫ নাবিককে নিয়ে লাইবেরিয়ার কন্টেইনারবাহী জাহাজ ‘এমভি বাক্সমুন’ চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙ্গরে পৌঁছায়। গতকাল সোমবার বেলা ১১টায় তাদের চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙ্গর থেকে ১৫ নম্বর জেটি দিয়ে তীরে আনা হয়। তাদেরকে চিকিত্সার জন্য নগরীর মেহেদীবাগে ন্যাশনাল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
দেশে ফিরিয়ে আনা ৫ নাবিক হলেনঃ জাহাজের চতুর্থ প্রকৌশলী মো. আবদুল হাকিম, ডেক ক্যাডেট মোখলেসুর রহমান, ডেক ফিটার মো. রুবেল, অয়েলার মো. ওসমান এবং জিএস সাইফুল ইসলাম। এছাড়া রাজকীয় থাই নৌবাহিনীর সহায়তায় উদ্ধারপ্রাপ্ত ৪ নাবিক জাহাজের দ্বিতীয় অফিসার মো. মোবারক হোসেন, ডেক ক্যাডেট রায়েক ফাইরুজ, ইঞ্জিন ক্যাডেট মুশফিকুর রহমান এবং অয়েলার আবু বকর সিদ্দিকীকে থাইল্যান্ডের ভাচিরা ফুকেট হাসপাতালে চিকিত্সা দেয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে। থাই নৌবাহিনী ‘এমভি হোপের’ চিফ অফিসার মো. মাহবুব মোরশেদ এবং চিফ ইঞ্জিনিয়ার কাজী সাইফুদ্দিনকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করে। প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে এ দু‘জনের মৃতদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে কয়েকদিন সময় লাগতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
জাহাজ মালিকদের সংগঠন পিঅ্যান্ডআই ক্লাবের প্রতিনিধি ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন আব্দুল কাদের ইত্তেফাককে জানান, ‘এমভি হোপের’ ৬ নাবিক এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। এরা হলেনঃ ক্যাপ্টেন রাজীবচন্দ্র কর্মকার, দ্বিতীয় প্রকৌশলী মো. নেজামউদ্দিন, ইলেকট্রিশিয়ান সাদিম আলী, চিফ কুক নাসির উদ্দিন, নাবিক নাসির উদ্দিন ও মো. আলী হোসেন ।
গত ৪ জুলাই বৃহস্পতিবার ভোরে প্রবল ঢেউ ও ঝড়বৃষ্টির কারণে ‘এমভি হোপ’ থাইল্যান্ডের ফুকেট উপকূল থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে আন্দামান সাগরে কাত হয়ে ডুবতে থাকে। এসময় ক্যাপ্টেন জাহাজটিকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করে ১৭ নাবিককে প্রাণ বাঁচাতে সমুদ্রে ঝাঁপ দেয়ার পরামর্শ দেন। এর কয়েক ঘন্টা পরে ওই স্থান দিয়ে লাইবেরিয়ার কন্টেইনারবাহী জাহাজ ‘এমভি বাক্সমুন’ চট্টগ্রাম অভিমুখে আসছিল। তারা সাগরে ভাসমান অবস্থায় ‘এমভি হোপের’ ৫ নাবিককে দেখতে পেয়ে নিজেদের জাহাজে তুলে নেয়।
এই ৫ জন ছাড়াও থাই নৌবাহিনীর উদ্ধারকারী দল ৪ নাবিককে জীবিত ও দু‘জনকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করে। জীবিতরা থাইল্যান্ডের ভাচিরা ফুকেট হাসপাতালে চিকিত্সা নিচ্ছেন। জাহাজে চিফ অফিসার মো. মাহবুব মোরশেদ এবং চিফ ইঞ্জিনিয়ার কাজী সাইফুদ্দিনের মৃতদেহ একই হাসপাতালে হিমঘরে রাখা হয়েছে।
দেশের মাটিতে পা রেখেই কাঁদলেন নাবিকরা
দেশের মাটিতে পা রেখেই আবেগে কেঁদে ফেলেন ‘এমভি হোপের’ বেঁচে যাওয়া ৫ নাবিক। গতকাল সোমবার বেলা ১১টায় এই ৫ জন কর্ণফুলী নদীর মোহনায় ১৫ নম্বর জেটি দিয়ে চট্টগ্রামে ফিরে আসেন। জাহাজের ডেক ক্যাডেট মোখলেসুর রহমান কান্নাজড়িত কণ্ঠে সাংবাদিকদের বলেনঃ ভাবতে পারিনি আবার জীবন ফিরে পাব। সাগরের বিশাল বিশাল ঢেউয়ের সাথে সংগ্রাম করতে করতে পরিবার পরিজনের সাথে কোনোদিন দেখা হওয়ার আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলাম। ডেক ফিটার রুবেল বলেনঃ জাহাজ থেকে পানিতে লাফিয়ে পড়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলাম। তারপর আর কিছুই মনে নেই। জ্ঞান ফেরার পর দেখি আমাদের কয়েকজন একটি অপরিচিত জাহাজে শুয়ে রয়েছি। খবর নিয়ে জানতে পারি সেটি লাইবেরিয়ার জাহাজ এমভি বাক্সমুন। তারাই আমাদের মধ্যে ৫ জনকে উদ্ধার করেছে।
সংবাদকর্মীদের হয়রানি
‘এমভি হোপের’ ফিরে আসা ৫ নাবিকের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে চট্টগ্রামের সংবাদকর্মীদের হয়রানির শিকার হতে হয়। পিঅ্যান্ডআই ক্লাব প্রতিনিধি ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন আব্দুল কাদের জানান, সকাল ৮টায় নাবিকদের বহির্নোঙ্গর থেকে এনে নগরীর আগ্রাবাদ এলাকার সেন্ট মার্টিন হোটেলে নিয়ে যাওয়া হবে। কিন্তু হোটেলে যাওয়ার পর বলা হয়, পতেঙ্গার ১৫ নম্বর জেটি দিয়ে নাবিকরা আসবেন। এ কথার ভিত্তিতে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে পতেঙ্গায় যাওয়ার পর আবার জানানো হয়, নাবিকরা হোটেলেই রয়েছেন। এভাবে কয়েক দফা হয়রানির পর বেলা ১১টার দিকে নাবিকরা ১৫ নম্বর জেটি দিয়ে চট্টগ্রামের মাটিতে পা রাখেন। এছাড়া বিকাল ৩টায় এ ব্যাপারে সংবাদ সম্মেলনের কথা থাকলেও দুপুর সাড়ে ১২টায় আব্দুল কাদের ‘ইত্তেফাক’কে সংবাদ সম্মেলন বাতিল করার কথা জানান। এছাড়া থাইল্যান্ডের হাসপাতালে চিকিত্সাধীন ‘এমভি হোপের’ ৪ নাবিক সোমবার বিমানযোগে দেশে ফিরে আসবেন বলে ইতিপূর্বে ‘ইত্তেফাক’কে জানিয়েছিলেন আব্দুল কাদের। জাহাজের সেকেন্ড অফিসার মোবারক হোসেনের ভাই মুসা গতকাল ইত্তেফাককে জানান, মোবারক ও তার তিন সহকর্মী পুরোপুরি সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত থাইল্যান্ডেই অবস্থান করবেন।
