বর্ষার জল থৈ থৈ

আপডেট : ০৯ জুলাই ২০১৩, ১৮:৩৮
গ্রীষ্মের ছুটি হয়ে গেলো বিদ্যালয়ে। অর্ণি খুব খুশি। মা-বাবা এবার ওকে গ্রামের বাড়ি নিয়ে যেতে রাজি হয়েছেন। খুব মজা হবে এবার। ওর ক্লাসের আর কেউ গ্রামে যাচ্ছে না। গ্রামে নাকি বিদ্যুত্ থাকে না, কম্পিউটার নেই, ক্যাবল লাইন না থাকায় কার্টুন নেটওয়ার্ক ও নিক দেখা যায় না। মা বলেছেন, এসব না থাকলেও গ্রামের মজাই আলাদা, যা শহরে নেই। অর্ণি জিজ্ঞেস করলো, শহরে কী নেই যা গ্রামে আছে? বলো না মা! মা বললেন, শহরে গ্রামের মতো বৃক্ষ নেই, সবুজ মাঠ নেই, ফসলের প্রান্তর নেই, মুক্ত বাতাস নেই। আরো বহু কিছু নেই শহরে, যা তুমি গ্রামে গেলেই দেখতে ও বুঝতে পারবে। পরদিন বাসে চড়ে পুরুরা চৌরাস্তায় নামলো ওরা। অর্ণি কাউকে চেনে না। বাবা পরিচিতদের সাথে কুশল বিনিময় করে এক রিকশায় চড়লেন। পাকা রাস্তা ধরে রিকশা এগিয়ে যাচ্ছে বাড়ির দিকে। চারদিকে থৈ থৈ জল। এতো জল অর্ণি এর আগে দেখেনি। অর্ণি বললো, গ্রামে এতো পানি তা তুমি বলোনি মা। বাবা বললেন, এখন বর্ষা মৌসুম তো, তাই এতো পানি। অন্য সময় এতো পানি থাকে না। বর্ষাকাল মানেই থৈ থৈ পানি। তাহলে কি বর্ষাকাল শুধু গ্রামে হয়, শহরে হয় না বাবা? বাবা বললেন, তা না। শহর উঁচু থাকায় ও খাল-বিল-নিচু জমি না থাকায় পানি থাকে না। কতগুলো ছেলে পাশেই হাঁটুজলে নেমে খেলা করছে। কেউবা সাতার কাটছে, কেউ শাপলা ফুল তুলে মনের আনন্দে ছিঁড়ছে। অর্ণি উত্ফুল্ল কণ্ঠে বললো, আমি ওদের সাথে খেলা করতে চাই বাবা। সাঁতার কাটতে চাই, শাপলা ফুল তুলতে চাই। বাবা বললেন, কেউ ইচ্ছে করলেই সাঁতার কাটতে পারে নারে মা। প্রথমে সাঁতার শিখতে হয়। তাহলে আমি কেনো সাঁতার শিখিনি মা? আমি সাঁতার শিখবো। ঢাকায় পানি নেই, তাই সাঁতার শেখা হয়নি তোমার। সাঁতার শিখতে হলে নদী বা পুকুর থাকতে হয়। শহরে সুইমিং পুলেও সাঁতার শেখা যায়। ওতে খরচ খুব বেশি। পাশ দিয়ে দুটি ছেলে একটা ভেলা বেয়ে চলে যাচ্ছে। এক লোক মাথায় মাথাল দিয়ে কোষা নৌকা বেয়ে যাচ্ছে। অর্ণি সতৃষ্ণ নয়নে ভেলাটার দিকে তাকিয়ে রইলো। বাবা অর্ণির মনের প্রশ্নটা বুঝতে পেরে বললো, ওটা ভেলা। কলাগাছ দিয়ে বানাতে হয়। তুমি বই-এ ছবি দেখেছো। ভেলা নৌকার মতোই পানিতে চলে। আর ঐটা কোষা নৌকা। বর্ষাকালে গ্রামে লোকজন কোষা নৌকায় চলাফেরা করে। তখন ঝুপঝুপিয়ে পড়তে শুরু করলো বৃষ্টি। মা আতঙ্কিত কণ্ঠে বললেন, রিকশাওয়ালা ভাই, আপনার কাছে পলিথিন নাই? রিকশাওয়ালা বললো, আছে। রিকশাওয়ালা রিকশার হাতলে ভাঁজ করে রাখা পলিথিনটা খুলে পেছনে বাড়িয়ে ধরলো। মা পলিথিনটা নিয়ে খুলে অর্ণির গায়ে জড়িয়ে দিলেন। অর্ণি বললো, মা বৃষ্টিকে এতো ভয় পায় কেনো বাবা? ওরা তো বৃষ্টির মধ্যে পানিতে দাপাদাপি করছে। বাবা বললেন, ওরা গ্রামের। গ্রামের ছেলেমেয়েরা কাদাপানিতে থাকতে থাকতে শক্ত হয়ে যায়। তাই ওদের বৃষ্টিজলে কিছু হয় না। অর্ণি বললো, ও। বাবা আমি একটা শাপলা নেবো। রিকশাওয়ালা সাথে সাথে রিকশা থামিয়ে নেমে পড়লো পাশের ডোবায়। পটাপট পাঁচটা শাপলা তুলে অর্ণির হাতে দিলো। রিকশায় উঠে রিকশা ছেড়ে দিলো। পলিথিনে অর্ণির শরীর রক্ষা পেলেও বাবা-মা ভিজে যাচ্ছে। বাবা বললেন, এই রিকশাওয়ালা, বৃষ্টিতে ভিজে যাচ্ছি। সামনের গাছের নিচে দাঁড়াও। রিকশাওয়ালা কিছু না বলে সামনের মোড়ের আম গাছের নিচে রিকশা দাঁড় করালো। রিকশা থেকে নেমে হাত দিয়ে মুখমণ্ডল ও হাতের পানি মুছছে। সামনেই একটা মাঝারি আকারের ব্রিজ। ব্রিজের দুই পাশে দাঁড়িয়ে লোকজন ধর্মজাল দিয়ে মাছ ধরছে। অর্ণি বই-এ ধর্মজাল দেখেছে; কিন্তু বাস্তবে মাছ ধরা দেখেনি কখনো। ওর মনে কৌতূহল। তাকিয়ে আছে। কৌতূহল দমিয়ে রাখতে না পেরে অর্ণি বাবাকে জিজ্ঞেস করলো, ওটা ধর্মজাল না বাবা? বাবা বললেন, জী মা। ওটাকে এখানে ঝাঁকিজাল বলে। ওরা ঝাঁকিজাল দিয়ে মাছ ধরছে। আমি ঝাঁকিজাল দিয়ে মাছ ধরা দেখবো বাবা। বৃষ্টিটা কমুক। তখন ব্রিজের উপর কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে মাছ ধরা দেখবো। কেমন? ঠিক আছে বাবা। আষাঢ়ে বৃষ্টি এক পশলা ঝরেই থেমে ঝিরঝির ঝরতে থাকলো। রিকশাওয়ালা রিকশা ছেড়ে দিলো। ব্রিজের উপর এসে এক পাশে দাঁড়ালো। ঝিরঝির বৃষ্টি পড়তে থাকায় অর্ণিকে রিকশা থেকে নামতে দেয়া হলো না। রিকশায় বসে থেকে ওদের মাছ ধরা দেখলো কিছুক্ষণ। সামনেরটাই ওদের গ্রাম। দশ মিনিটে চলে এলো গ্রামে। বাড়ির আঙ্গিনায় আসতেই ফের শুরু হলো ঝপঝপিয়ে বৃষ্টি। রিকশাওয়ালা টেনে বাড়ির ভেতর নিয়ে গেলো রিকশাটা। বারান্দায় দাদা-দাদি বসে ছিলেন। ওদের দেখে অত্যন্ত খুশি হলেন। দাদা এগিয়ে এসে রিকশা থেকে অর্ণিকে কোলে নিয়ে বারান্দায় উঠলেন। কাঁধের গামছা দিয়ে গা মুছিয়ে দিলেন। শুরু হলো বাতাস। ঝড়োহাওয়া। দাদা বললেন, তোমরা জলদি বারান্দায় উইঠা আসো বৌ। তুফান আইতাছে। অর্ণি দাদাকে জিজ্ঞেস করলো, তুফান কী দাদা? দাদা বললেন, তুফান হইলো গিয়ে তুফান। তখন জোরে বাতাস বয়। গাছের ডাল ভাঙে, বাড়িঘর উড়ায়া লইয়া যায়। বাবা ও মা নেমে এলেন রিকশা থেকে বারান্দায়। রিকশাওয়ালা ভাড়া নিয়ে চলে গেলো। ঝড় বইতে শুরু করেছে। মা শ্বশুর-শাশুড়ির পা ছুঁয়ে ঘরের ভেতর চলে গেলেন। বাবা বাবা-মা’র পা ছুঁয়ে বাবার পাশে দাঁড়িয়ে বললেন, তুফান মানে হলো ঝড়। গ্রামে ঝড়কে তুফান বলে। বর্ষাকালে বৃষ্টির সাথে ঝড় হয়। মাঝে মাঝে প্রচণ্ড হয় ঝড়। আমরা ওটাকে কালবৈশাখী বলি। ঘরের পেছনে একটা বড় আম গাছ আছে। গাছটার অধিকাংশ ঘরের চালের উপর। ঝড়ে একটা-দুটো করে কাঁচা আম প্রথমে ধুপ শব্দে ঘরের চালে পড়ছে। সেখান থেকে গড়িয়ে মাটিতে। অর্ণি উত্ফুল্ল হয়ে বললো, আম পড়ছে দাদা! আমি কুড়াতে যাবো। বই-এ পড়েছি:‘ঝড়ের দিনে মামাবাড়ি আম কুড়াতে সুখ; পাকা আমের মধুর রসে রঙিন করি মুখ’। আমি ভাবতাম আম শুধু মামাবাড়িতে হয়; এখন দেখছি দাদাবাড়িতেও আম হচ্ছে। ওর কথায় দাদা হেসে উঠলেন। বাবা কিছু বলতে যাবেন, তখন শুরু হলো শিলাবৃষ্টি। টিনের চালে শব্দ হচ্ছে টুপটুপ। শাদা শাদা শিলা উঠানে পড়ছে। ইতোমধ্যে পাশের বাড়ির তিনটি ছেলেমেয়ে এসে আম কুড়াতে শুরু করেছে। একটা মেয়ে আম না কুড়িয়ে মগে শিলা কুড়াচ্ছে। মাঝে মাঝে শিলা মুখে পুরে চিবিয়ে বা চুষে খেয়ে নিচ্ছে। অর্ণি অবাক চোখে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। দাদা বললেন, পোলাপানগো যত কোলে রাখবা তত দুর্বল হইবো। ওকে আমার কাছে দাও। যে কয়টা দিন গ্রামে থাকবা, ততদিন নাতিডা আমার কাছে থাকবো। ওরে আমি গ্রামের পোলাপানগো মতো শক্ত কইরা দিমু। শুনছি ফার্মের মুর্গি নাদুস নাদুস থাকলেও খুব দুর্বল থাকে। পোলাপানগো ফার্মের মুর্গি বানায়ো না বৌ! মা শ্বশুরের কথার সত্যতা বুঝতে পারলেন। কিন্তু অর্ণি তো দুর্বল। ও কি গ্রামের অমন পরিবেশ সহ্য করতে পারবে? দোটানায় পড়ে গেলেন স্নেহময়ী মা। তখন বিকট শব্দে বজ্রপাত একটা। ভয়ে অর্ণি দাদার গলা জড়িয়ে ধরলো। দাদা নাতিকে বুকে চেপে ধরে অভয় দিয়ে বললেন, ভয় নাই নাতি আমার। ঘরে থাকলে ঠাডায় কিছু করতে পারে না। অর্ণি বললো, গ্রামে বিজলিকে ঠাডা বলে বুঝি দাদা? দাদা বললেন, হ নাতি। তখন শিলাবৃষ্টি শেষ হয়ে মুষলধারে বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে। ছেলেমেয়ে তিনটি উঠানে দাঁড়িয়ে ওদের দিকে তাকিয়ে কাঁচা আম খেতে শুরু করেছে। অলঙ্করণ :মাইশাহ তাইবিয়া জাকারিয়া, চতুর্থ শ্রেণি, বনানী বিদ্যানিকেতন, ঢাকা