নদীধোয়া পলল মৃত্তিকার দেশ বাংলাদেশ।
দক্ষিণে বিশাল সাগর আর চিরসবুজ সুন্দরবন। এই বনকে ঘিরে ভাটি জনপদের অসংখ্য খাল-নদী, হাওর, বিল। এজন্যই দেশের কবির জন্মভূমিবন্দনায় উচ্চারিত হয়, ‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি...।’
সত্যিই তো কোথায় আছে এমন দেশ? সেই কবে কোন যুদ্ধে মহাপরাক্রমশালী গ্রিক বীর আলেকজান্ডার বিস্ময়ভরা কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘সত্যি সেলুকাস কী আশ্চর্য এ দেশ।’
এই তো আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ। ছয় ঋতুতে সাজানো এর প্রকৃতি।
গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরত্, হেমন্ত, শীত আর বসন্ত।
এক-এক ঋতুতে প্রকৃতি এক-এক সাজে সেজে ওঠে। গ্রীষ্মের প্রচণ্ড তাপদাহে মাটি ফেটে চৌচির। অসহনীয় গরমে তৃষ্ণার্ত পথিক পেতে চায় এক আঁজলা হিমশীতল জল। আকাশে চিলের তৃষ্ণাকাতর টিউ টিউ ডাক। ক্লান্ত পথচারী রৌদ্রত্রাস থেকে বাঁচতে খুঁজতে থাকে একখণ্ড বৃক্ষছায়া। এমন দুর্বিষহ প্রকৃতি হঠাত্ কোনো একদিন মেঘগর্জনে, বিজলি চমকে জানিয়ে দেয়—শেষ হলো কষ্টের দিন। তারপর হঠাত্ ঝর-ঝর, ঝির-ঝির, থেকে মুষলধরে অবিশ্রান্ত বারিধারা। জীবন ফিরে পায় অনাবিল হিমশান্তির মেদুর পরশ। কঠিন মাটি নরম-পেলব খামির মতো হয়ে ওঠে। যে কর্কশ পাথুরে মাটি কর্ষণে লাঙলের সুতীক্ষ ফলাও এতোদিন হয়েছে ব্যর্থ সেই মাটি আজ কতো কোমল, সহজ, সরস মৃত্তিকা।
যেমন প্রকৃতিতে স্বস্তি আনে, তেমনি কৃষকের মুখেও হাসি ফোটে আর রুক্ষ-পাণ্ডুর বৃক্ষপল্লব হয়ে ওঠে পেলব-সবুজ। হঠাত্ এক রাতেই পাটক্ষেত জেগে ওঠে, আউশের অবারিত মাঠে জীবনের নতুন উন্মেষ—এ যেন বহু প্রতীক্ষায় পাওয়া। এই বর্ষায় শুকিয়ে যাওয়া গ্রীষ্মের নদীতে আসে প্রাণের সঞ্চার।
প্রকৃতি-পাগল বাঙালি বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই বর্ষার প্রকৃতির বর্ণনা দিয়েছেন কত সহজভাবে—
আষাঢ়ে বাদল নামে নদী ভরো ভরো—
মাতিয়া ছুটিয়া চলে ধারা খরতর—
মহাবেগে কলকল কোলাহল ওঠে
ঘোলাজলে পাকগুলি ঘরে ঘুরে ছোটে।
দুই কূলে বনে বনে পড়ে যায় সাড়া
বরষার উত্সবে জেগে ওঠে পাড়া।
শুধু পাড়া নয়, সারা বাংলাই জেগে ওঠে এ বরষায়। জলে জলে জলাকার প্রকৃতি এসময় ফুলের সৌরভেও মউমউ করে ওঠে। গাছে গাছে কদম ফুলের সমারোহ। যেন ফুল নয় সাদা সাদা সোনালি রেনুর তারাফুল। ভিজে হাওয়ায় তার মনকাড়া সুরভি ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে।
জুঁই, মালতি, গন্ধরাজ, কেয়া—এমন গন্ধমধুর সাদা ফুলে বর্ষা সেজে ওঠে। সাদা-কালোর দইরাজ পাখিটি মধুসুরে শিস দেয়। বাঙালির প্রিয় বিহগ দোয়েলের আরেক নাম দইরাজ।
সাঁঝবেলায় টিপটিপ শব্দের মাঝে হঠাত্ কাশবন থেকে ভেসে আসে ডাহুকছানার গুবগুব কান্না যেন।
বর্ষা সৃষ্টির ঋতু। এসময় কবির হূদয় সৃষ্টিতে যেমন মেতে ওঠে, প্রকৃতিও সম্ভাব্য শস্যের বারতা শোনায়।
তবে, এ ঋতু যতোই সৃষ্টিময়ী হোক না কেন, সবটুকু সময় যেন কেমন বিষণ্ন-দুঃখ দুঃখ রেশ ছড়িয়ে রাখে প্রকৃতিতে। মনে হয় কাঁদছে সে।
কচুর পাতা চুঁয়ে চুঁয়ে অশ্রু ঝরে, টিনের চালে অশ্রুপাতের টুপটাপ ধারা, নদীতে-ডোবায় বড় বড় ফোঁটার অশ্রু কখনো একনাগাড়ে, কখনো বা থেমে থেমে।
আশঙ্কাও থেকে যায় নদীবর্তী বা সাগরঘেঁষা জনপদের বাসিন্দাদের।
বান-বন্যা, জলোচ্ছ্বাসের তাণ্ডবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে জীবন।
কবিকণ্ঠে এ সময়ের সতর্ক-সংকেত—
‘নীল নবঘনে আষাঢ় গগনে
তিলঠাঁই আর নাহিরে
ওগো আজ তোরা যাসনে ঘরের বাহিরে।’
অঝোর ধারায় এই বৃষ্টি অন্যদিকে কেমন মেঘাছন্ন আঁধার প্রকৃতি। প্রকৃতির এই জলময় চিত্র কবির দৃষ্টিতে ধরা পড়ে—
‘বাদলের ধারা ঝরে ঝরঝর
আউশের ক্ষেত জলে ভরভর
কালিমাখা মেঘে ওপারে আঁধার
ঘনায়েছে দেখ চাহিরে।’
বাংলার কবি বর্ষাকে নানাভাবে উপলব্ধি করেছেন। সেই কবেকার মধ্যযুগের পদাপলির কবি চণ্ডীদাস, জ্ঞানদাস থেকে এখানকার কবিরা নিরন্তর লিখে চলেছেন বর্ষাকে নিয়ে। চণ্ডীদাস বর্ষার বারিধারাকে চোখের জলের সঙ্গে তুলনা করেছেন। যেমন—
‘আষাঢ় শ্রাবণ মাসে মেঘ বরিষে যেহ্ন
ঝরএ নয়নের পাণী।’
কবি জ্ঞানদাশ বৃষ্টিঝরা রাতে ঘুমঘোরে স্বপ্নে বিভোর থেকে যে অনুভূতি প্রকাশ করেন। তা হলো—
‘রজনী শাওনঘন ঘনদেয়া গরজন
রিমিঝিমি শব্দে বরিষে।’
আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বর্ষামেদুর দিনের অনুভূতি প্রকাশ করেছেন বড়দের কবিতায় এবং অসংখ্য গানে। রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশ তো জল, জলা, বর্ষা আর গ্রামপ্রকৃতিকে এঁকেছেন আবেগের সুর-ছন্দ দিয়ে।
হ্যাঁ বর্ষায় কষ্ট আছে, ভয়ও আছে। গ্রামজনপদের মানুষ বর্ষার কষ্টটা মেনে নিয়েই এটা আশীর্বাদ বলে জেনে নিয়েছে। বান-বন্যায় এই বর্ষা শহরকে ভোগায় বেশি। কারণ মানুষ ছুটছে ছোট্ট শহরে। তিল ঠাঁই নেই। আশপাশের খাল জলাগুলো ভরাট হয়ে ঘরবাড়ি, কলকারখানা গড়ে উঠেছে। ফলে জলাবদ্ধতা শহরের পথ ও আবাসিক এলাকায় দুর্ভোগ বয়ে আনে। শিশু ও বয়সীদের জ্বর এবং ঠাণ্ডাজনিত রোগ এসময় বেশি হয়। বড়দের অফিস যাতায়াত যতোটা কষ্টকর না, ছেলেমেয়েদের স্কুল-কলেজে ঠিক মতো পৌঁছানো হয়ে ওঠে না, তবে, বর্ষা অনেক দেয়। গ্রীষ্মের ফলে পূর্ণতা আনে বর্ষা। আম-কাঁঠালের সঙ্গে জাম-জামরুল-কাউফলে বাজার ছেয়ে যায়।
সবশেষে বলব, ‘বিষ্টি তুমি মিষ্টি কী যে,
মনটি জুড়াই ভিজে ভিজে।’
কিন্তু না, যতোই মজা লাগুক ভিজতে, কেউ যেন না ভিজি। ভিজলে জ্বর হবে, কষ্ট পাবা।
