সোনারগাঁওয়ের ফোর মার্ডার

টার্গেট ছিল চেয়ারম্যানের ২য় স্ত্রী, দেখে ফেলায় বাকি ৩ জন খুন

আপডেট : ০৯ জুলাই ২০১৩, ২২:৪৯
নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ের পিরোজপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী শামীমা ইসলাম সুমাকে হত্যার উদ্দেশেই খুনিরা বাড়ি গিয়েছিলেন। প্রতিরোধ আসতে পারে এ আশংকায় সবার আগে খুন করা হয় সুমার ছোট ভাই রানাকে। এর পর পরিকল্পনা অনুযায়ী খুন করা হয় সোমাকে। সাক্ষ্য-প্রমাণ গুম করতেই পরে হত্যা করা হয় বাড়ির দুই গৃহকর্মী রেখা ও মনিকে। হত্যাকাণ্ডের পুরো পরিকল্পনা ও ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন শামীম রেজা। পুরো বিষয়টি ধামাচাপা দিতে হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী পুলিশের সহযোগিতা চান। পুলিশ শামীম রেজাকে গ্রেফতার করে নির্যাতন করলে তার মৃত্যু হয়। ইতিমধ্যে হত্যাকাণ্ডে জড়িত ৪ জন নিজেদের দোষ স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। ওই জবানবন্দি সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। জবানবন্দি দিয়েছেন শামীম রেজা, আশরাফ, রাজিব ও বাদশা। তবে গ্রেফতার শাহাদাত নিজের দোষ স্বীকার করেননি। এদের মধ্যে শামীম, আশরাফ, রাজিব ও বাদশার জবানবন্দি প্রায় একই। চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলামের বডিগার্ড বাদশা। এ ঘটনায় ওই বাসভবনের নিরাপত্তা কর্মী আব্দুস সাত্তার গ্রেফতারের পর জবানবন্দি দিলে তাকে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। পুলিশী নির্যাতনে নিহত শামীম রেজাও মৃত্যুর আগে হত্যাকাণ্ডের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পুরো ঘটনার বিবরণ দেন। প্রসঙ্গত, গত ১৯ এপ্রিল গভীর রাতে সোনারগাঁও পিরোজপুর ইউপির চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলামের বাসায় তার দ্বিতীয় স্ত্রীসহ চার হত্যাকাণ্ড ঘটে। এ চাঞ্চল্যকর ফোর মার্ডারটি বর্তমানে নারায়ণগঞ্জ গোয়েন্দা পুলিশ তদন্ত করছে। জবানবন্দিতে খুনিরা বলেন, খুনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে তারা কিছুই জানেন না। তাদেরকে শুধু সোমাকে হত্যা করতে বলা হয়েছে। চেয়ারম্যান রফিকুলের প্রথম ঘরের সন্তান শাহাদাতের বন্ধু ছিল শামীম রেজা। শামীম ও শাহাদাত বসে হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা করে। পরিকল্পনার সময় শাহাদাতের ঘনিষ্ঠ বন্ধু যাত্রাবাড়ী এলাকার মিঠু ও সোহাগও উপস্থিত ছিল। এই দুজনই সক্রিয়ভাবে হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়; কিন্তু তারা পলাতক। শামীম, আশরাফ, রাজিব ও বাদশা জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন, মূল পরিকল্পনাকারী থেকে পুরো বিষয়টি শুনে শাহাদাত সোমাকে কিভাবে হত্যা করা হবে তা ঠিক করে। তিনিই সবার কাজ নির্ধারণ করে দেন। ঘটনার আরেক পরিকল্পনাকারী শামীম রেজা পুলিশের হাতে গ্রেফতার হলে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী। তিনি চিরতরে শামীমের মুখ বন্ধ করে দেয়ার জন্য পুলিশের সাহায্য চান। সোনারগাঁও থানার ওসি (তদন্ত) অরূপ তরফদারকে ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী মোটা অংকের টাকা দিলে তিনি শামীমকে দিনরাত নির্যাতন করেন। পরে হাসপাতালে শামীমের মৃত্যু হয়। শামীমের ময়না তদন্ত প্রতিবেদনেও উল্লেখ করা হয়েছে তার দেহে অনেকগুলো আঘাতের চিহ্ন ছিল। প্রতিবেদনে শামীমকে হত্যা করা হয়েছে, বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। এ ঘটনায় সোনারগাঁও সার্কেলের এএসপি উত্তম প্রসাদ, ওসি (তদন্ত) অরূপ তরফদার ও এসআই পল্টু ঘোষকে ক্লোজড করা হয়। এএসপি উত্তম প্রসাদ পাঠককে ইতিমধ্যে খুলনায় বদলি করা হয়েছে। ওসি (তদন্ত) অরূপ তরফদার ও এসআই পল্টু ঘোষ ক্লোজড অবস্থায়ও বাঁচার জন্য তদবির করে বেড়াচ্ছেন। তবে হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী হয়নি বলে দাবি করেন চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম। তিনি গতকাল মঙ্গলবার ইত্তেফাককে বলেন, তার বাসায় নগদ টাকা ছিল না। তবে ৯০ ভরি স্বর্ণালংকার ছিল। এগুলোর লোভে তার স্ত্রী, শ্যালক ও দুই গৃহকর্মীকে খুন করা হয়েছে। এদিকে পুলিশ বলছে, এই চারজন ও পলাতক মিঠু এবং সোহাগ ছাড়াও হত্যাকাণ্ডের ঘটনার পিছনে রয়েছে একজন গডফাদার। তিনি হত্যাকাণ্ডটি ভিন্নখাতে নেয়ার জন্য প্রচুর টাকা ঢালছেন। এদিকে গত ২৬ মে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক বিভাগ থেকে শামীমের ময়না তদন্ত প্রতিবেদন শাহবাগ থানার কনস্টেবল রমজান স্বাক্ষর করে নিয়ে আসেন। কিন্তু সেই ময়না তদন্ত প্রতিবেদন গতকাল পর্যন্ত সোনারগাঁও থানায় কিংবা নারায়ণগঞ্জ পুলিশ সুপার কার্যালয়ে পৌঁছেনি। পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, ময়না তদন্ত প্রতিবেদনটি সোনারগাঁও থানায় কিংবা জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে গেলে অভিযুক্ত ওই তিন পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে হত্যা মামলা হবে। এ কারণেই হয়তো ময়না তদন্ত রিপোর্টটি গায়েব করা হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ পুলিশ সুপার নূরুল ইসলাম বলেন, গতকাল পর্যন্ত শামীমের ময়না তদন্ত রিপোর্ট তার কার্যালয়ে আসেনি। সোনারগাঁও এর ফোর মার্ডারের তদন্ত ডিবি পুলিশ করছে। তদন্তে কোন ধরনের গাফিলতি হলে ব্যবস্থা নিবেন বলে জানান।