একটু হিসেব করে সব কাজ করতে ভালোবাসেন লাক্সতারকা শানারেই দেবী শানু। মাঝে সংসারের প্রয়োজনে কিছুটা সময় বিরতি নিলেও তার বর্তমানের ব্যস্ততা অভিনয়কে ঘিরেই। এই গুণী অভিনেত্রীকে নিয়ে লিখেছেন
অজেয় চৌধুরী
ও ছবি তুলেছেন আশীষ সেনগুপ্ত
ছোটবেলা থেকেই সংস্কৃতির নানা শাখায় ছিল তার অবাধ বিচরণ। নাচ, গান, আবৃত্তি, বিতর্ক, অভিনয়—সবই ছিল তার নখদর্পণে। তার বাবা এ কে শেয়াম আর মা চন্দ্রাদেবী দুজনই ছিলেন সংস্কৃতিমনা। তাদের উত্সাহেই শানু নিজেকে এতদূর নিয়ে আসতে পেরেছেন বলে জানালেন। স্কুল-কলেজে পড়াকালীন জাতীয় শিশু সপ্তাহ ও জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহে জাতীয় পর্যায়ে স্বর্ণপদকসহ অনেকগুলো পুরস্কার অর্জন করেন তিনি। শুধু কী তাই? সংস্কৃতির নানা শাখায় সাফল্যের পাশাপাশি একাডেমিক ক্যারিয়ারও তার স্বর্ণোজ্জ্বল। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়ে ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করেছেন। শানু জানান, মাস্টার্স পরীক্ষায় তিনি মেধা তালিকায় জাতীয় পর্যায়ে ৯ম স্থান অধিকার করেন। এত মেধাবী একজন মানুষের তো প্রথম শ্রেণীর সরকারি কর্মকর্তা অথবা কর্পোরেট তারকা হওয়ার কথা ছিল। তা না হয়ে তিনি হয়ে গেলেন শোবিজ তারকা। এমন কথা শুনে হাসতে হাসতে শানু বলেন, ‘আমাদের শোবিজ বিশেষ করে টিভি মিডিয়ায় এখন অনেক ভালো কাজ হচ্ছে। ভালোভাবে বেঁচে থাকার মতো জীবনযাপন করার সুযোগ আছে। সুতরাং এখানেও টিকে থাকা সম্ভব। মেধাবী মানুষরা শুধু কর্পোরেট তারকা আর সরকারি কর্মকর্তা হলে শোবিজে মেধাবী মানুষের সংকট দেখা দেবে।’ মিডিয়ায় নিজের স্বপ্ন পূরণের গল্প জানতে চাইলে শানারেই দেবী শানুর চোখ দুটি কিছুটা উজ্জ্বল হলো। কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে বলা শুরু করলেন, ‘আমার স্বপ্নের প্রথম ধাপটি ছিল লাক্স-আনন্দধারা মিস ফটোজেনিকে অংশগ্রহণ। ওই প্রতিযোগিতায় সেরা দশের একজন হই। এ অর্জনটা একেবারেই অনাকাঙ্ক্ষিত ছিল। এরপর আমার স্বপ্নগুলো আরও উত্সাহিত হয়ে মূলধারার মিডিয়ায় পাখা মেলতে শুরু করেছিল। কিন্তু বাবা কিছুটা বাদ সাধলেন। বললেন, উচ্চ মাধ্যমিক শেষ হোক, তুমি আরও বড় হও, তারপর তোমার স্বপ্নপূরণ। অবশেষে বাবার বাধ্যগত হলাম, আমার শহর সিলেটেই থেকে গেলাম। এরই মধ্যে বাংলাদেশ বেতার সিলেট কেন্দ্রের তালিকাভুক্ত শিল্পী হলাম। মঞ্চেও কিছু ভালো কাজ করছিলাম। ২০০৪ সালে এল একটি দারুণ সুযোগ, সিলেটের আঞ্চলিক ভাষায় নির্মিত শাকুর মজিদের ‘বৈরাতী’তে অভিনয় করলাম। কিছু বোঝার আগেই ‘ঝিলিক-চ্যানেল আই ঈদ অনুষ্ঠান পুরস্কার’-এ শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেত্রীর পুরস্কারটা পেয়ে গেলাম। এরপর এল ২০০৫ সাল। আমার স্বপ্নপূরণের আরেকটি বছর। আমার অমোঘ স্বপ্ন আবার আমাকে ‘লাক্স-চ্যানেল আই সুপারস্টার’ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতে বাধ্য করল। যদিও এতটা বেশি কল্পনা আমিও করিনি। যখন সেরা সুন্দরীর মুকুটটা বাংলাদেশের প্রথিতযশা অভিনেত্রী সুবর্ণা মুস্তাফা আমাকে পরালেন, তখন মনে হলো ‘আহা! এ মুহূর্তটার জন্যই কি আমি ছোটবেলায় খেলাচ্ছলে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অভিনয় করতাম!’ অসাধারণ অনুভূতি। পুরোপুরি বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। স্বপ্নের হাওয়ায় ভাসছিলাম। এখন আমার স্বপ্নগুলো পাখা মেলে মূলধারার মিডিয়ায় চলে এসেছে। সেরা সুন্দরী হওয়ার পর থেকে গুণী নির্মাতাদের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছি। আরও অনেক ভালো কাজ করে যেতে চাই। এরই মধ্যে বেশ কাজ করেছি।’ শানু অভিনীত উল্লেখযোগ্য নাটকগুলো হলো—শাকুর মজিদের ‘বৈরাগী’, ইমদাদুল হক মিলনের ‘পলাশ ফুলের গন্ধ’, হুমায়ূন আহমেদের ‘কবি’, সালাউদ্দিন লাভলুর ‘সাকিন সারিসুরি’, রেজানুর রহমানের ‘আহ! ফুটবল বাহ! ফুটবল’, সাগর জাহানের ‘আরমান ভাই বিরাট টেনশনে’, শিমুল সরকারের ‘চোরকাব্য’, রিপন নবীর ‘আপনঘর’, অরণ্য আনোয়ারের ‘কবিরাজ গোলাপ শাহ’ প্রমুখ। মাঝে সংসারের প্রয়োজনে তিনি মিডিয়া থেকে সাময়িক বিরতি নিয়েছিলেন। তিনি এখন অভিনয় করছেন বেশ কয়েকটি ধারাবাহিক নাটকে। এরমধ্যে আনোয়ারের পরিচালনায় ‘কর্তাকাহিনী’ ও ‘বুকে তার চন্দনের ঘ্রাণ’, দেবাশীষ বড়ুয়া দীপের ‘জ্যোতিরাজ টিপু সুলতান’ ও ‘ইলেকশান ইলেকশান’, আপেল মাহমুদের ‘ছবির হাট’, ফয়সাল রাজীবের ‘পর্দার আড়ালে কে’ ও ‘রুপালি ও রুপালি পর্দার গল্প’ প্রভৃতি। এখন তার ব্যস্ততা ঈদের নাটকের শুটিং নিয়ে। বর্তমানে শুটিং করছেন ঈদের জন্য নির্মিত অরণ্য আনোয়ারের পরিচালনায় ‘অপেক্ষা সুরঞ্জনার জন্য’। সামনে অভিনয় নিয়ে নতুন কোনো পরিকল্পনা আছে কি না জানতে চাইলে লাক্সতারকা শানু বলেন, ‘না আপাতত নতুন কোনো পরিকল্পনা নেই। ভালো কাজ হলে করব। যেকোনো ভালো কাজই করতে চাই।’
