বিপুল গানের স্রষ্টার বিদায়

আপডেট : ১০ জুলাই ২০১৩, ১৯:৩৫
১৯৭১ সালে তাঁর বয়স ছিল মাত্র ১৬ বছর। তিনি তখন মেশিনগানের বিরুদ্ধে তাঁর গান এবং গলা দিয়ে যুদ্ধ করেছেন। মুক্তির গানে ১১টি গান আছে, যার অধিকাংশই লোকসুরভিত্তিক। এই গানগুলোর মধ্যে একটি ছাড়া বাকি সব গানই গেয়েছেন বিপুল ভট্টাচার্য। ১৯৭১ সালে গান নিয়ে তিনি ঘুরে বেড়িয়েছিলেন মাইলের পর মাইল। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত বিপুল ভট্টাচার্যের গাওয়া গান মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রেরণা জুগিয়েছে। বিপুল ভট্টাচার্য শরণার্থী শিবিরের হাজার হাজার মানুষের মনে সাহস সঞ্চার করেছিলেন গানের মাধ্যমে। তিনি ছিলেন মুক্তিসংগ্রামী শিল্পী সংস্থার সদস্য। মুক্তিসংগ্রামী শিল্পী সংস্থায় আরও ছিলেন লুবনা মরিয়ম, তারেক আলী, মাহমুদুর রহমান বেণু, নায়লা খান, স্বপন চৌধুরী, শাহিন সামাদ, দেবব্রত চৌধুরী, দুলালচন্দ্র শীল, মোশাদ আলী। সদস্যরা শরণার্থী শিবিরে, মুক্তি ফৌজের ক্যাম্পে এবং মুক্তাঞ্চলে গান গেয়ে বেড়াতেন। ১৯৯৩ সালে এই গানগুলো আবার ধারণ করা হয় ছবিতে ব্যবহারের জন্য। বিপুল ভট্টাচার্য মুক্তিযুদ্ধের পর কোনো সম্মান বা স্বীকৃতি পাননি। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের এই কণ্ঠযোদ্ধা গত ৫ জুলাই শুক্রবার সকাল সাড়ে ৯টায় রাজধানীর শংকর আহমেদ মেডিকেল সেন্টারে চিকিত্সাধীন অবস্থায় মারা যান। তার বয়স হয়েছিল ৬১ বছর। দীর্ঘদিন বিপুল ভট্টাচার্য ফুসফুসের ক্যান্সারে ভুগছিলেন। সম্প্রতি শ্বাসকষ্ট বেড়ে যাওয়ায় তাকে রাজধানীর শমরিতা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এরপর চিকিত্সার সুবিধার্থে অন্য হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। বিপুল ভট্টাচার্য ১৯৫২ সালে কিশোরগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি গান গেয়ে ও শিখিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। ফুসফুসে ক্যান্সার ধরা পড়ার পর তার চিকিত্সার বিশাল খরচ মেটাতে এগিয়ে আসেন সহযোদ্ধারা। তারেক মাসুদ পরিচালিত ‘মুক্তির গান’ চলচ্চিত্রে তার কাজ তুলে ধরা হয়েছে। ২০১০ সালে ভারতের মুম্বাইয়ে টাটা মেমোরিয়াল হাসপাতালে বিপুলের ফুসফুসে ক্যান্সার ধরা পড়ে। তখন টাকার অভাবে চিকিত্সা করাতে না পেরে দেশে ফিরে আসেন এই শিল্পী। এরপর ডেল্টা হাসপাতালে তাকে কেমো থেরাপি দেওয়া হয়। গত মাসে তিনি কিছুদিন রাজধানীর শমরিতা হাসপাতালে চিকিত্সা নিলেও পরে তাকে আহমদ মেডিকেলে স্থানান্তর করা হয়। জাতীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা আর সর্বস্তরের মানুষের ফুলেল শ্রদ্ধা নিবেদনের মধ্য দিয়ে গতকাল পোস্তগোলা শ্মশানে শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম কণ্ঠযোদ্ধা বিপুল ভট্টাচার্যের। এর আগে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের তত্ত্বাবধানে বারডেমের মরচুয়ারি থেকে বিপুল ভট্টাচার্যের মরদেহ নিয়ে আসা হয় জাতীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে। প্রথমেই ঢাকা জেলা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট অমিতাভ পরাগ তালুকদারের নেতৃত্বে পুলিশের একটি চৌকস দল রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার প্রদান করে। এরপর পর্যায়ক্রমে ফুলেল শ্রদ্ধা জানানো হয় প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে। আরও শ্রদ্ধা নিবেদন করেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অন্যতম শিল্পী আবদুল জব্বার, ফকির আলমগীর, মনোরঞ্জন ঘোষাল, বুলবুল মহালনবিস, ইন্দ্র মোহন রাজবংশী, ডালিয়া নওশীন, নমিতা ঘোষ, দেবেন্দ্র মালাকার, মলয় কুমার গাঙ্গুলি, শিবু রায়, কামাল উদ্দিনসহ আরও অনেকে। এ সময় শেষ শ্রদ্ধা জানাতে বিপুল ভট্টাচার্যের অগণিত ভক্ত-শুভানুধ্যায়ী ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, প্রধানমন্ত্রীর পিএস মাহবুবুল আলম শাকিল, নাট্যব্যক্তিত্ব খ ম হারুন, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু, কণ্ঠশিল্পী খুরশিদ আলম, রফিকুল আলম, কুদ্দুস বয়াতী, খায়রুল আনাম শাকিল, কিরণ চন্দ্র রায়, এস ডি রুবেল ছাড়াও অর্ধশতাধিক সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠন। এ সময় বিপুল ভট্টাচার্যের কফিনের পাশে ছিলেন তার স্ত্রী কুমকুম ভট্টাচার্য, ছেলে পার্থ ও কন্যা নীলিমা। সব শেষে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চুর সমাপনী বক্তব্য শেষে বিপুল ভট্টাচার্যের মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় পোস্তগোলা শ্মশানে। বেলা তিনটা নাগাদ সেখানে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।