ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা এবং উত্সাহ-উদ্দীপনার মধ্যদিয়ে সনাতন হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম উত্সব রথযাত্রা বুধবার রাজধানীতে শুরু হয়েছে। এ উপলক্ষে শোভাযাত্রা ও আলোচনা সভাসহ বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেন ভক্তরা। রাজধানীর ঢাকেশ্বরী মন্দির, স্বামীবাগের ইসকন আশ্রম, রামসীতা মন্দিরসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বর্ণাঢ্য রথযাত্রার আয়োজন করে। প্রতিবছর আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া তিথিতে এ রথযাত্রা পালিত হয়। রথের শীর্ষে থাকেন তিন দেবতা জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা। রথটিকে ভক্তরা টেনে নিয়ে যান একটি নির্দিষ্ট জায়গায়। সনাতন ধর্মীয় বিভিন্ন সংগঠন এ উপলক্ষে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করে। আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ ইসকন রথযাত্রা উপলক্ষে ৮ দিনের কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। রথযাত্রা উপলক্ষে দুপুরে স্বামীবাগ ইসকন মন্দিরে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন ইসকন স্বামীবাগ আশ্রমের সভাপতি যশোদানন্দন আচার্য। মঙ্গলপ্রদীপ জ্বেলে ৯ দিনের রথযাত্রা অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক চারুচন্দ্র। এরপরই বিকালে শুরু হয় রথ টানা। ইসকন মন্দির থেকে শোভাযাত্রাসহ রথ তিনটি টেনে টিকাটুলি, ইত্তেফাক মোড়, শাপলা চত্বর, দৈনিক বাংলা, পল্টন মোড়, দোয়েল চত্বর, টিএসসি, জগন্নাথ হলের সামনে দিয়ে পলাশী হয়ে ঢাকেশ্বরী মন্দিরে নিয়ে যাওয়া হয়।
গাজীপুর প্রতিনিধি জানান, গতকাল বুধবার থেকে শুরু হয়েছে ভাওয়াল রাজাদের দ্বারা প্রচলিত গাজীপুরের ঐতিহ্যবাহী শ্রী শ্রী মানিক্য মাধবের ৯ দিনব্যাপী রথযাত্রা ও রথমেলা। সকালে শহরের রথখোলায় সরকারি গণগন্থাগার সংলগ্ন বটমূলে অতিথি হিসেবে রথযাত্রার উদ্বোধন করেন মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি এমপি। গাজীপুরের জেলা প্রশাসক মো. নূরুল ইসলামের সভাপতিত্বে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) শাহ নওয়াজ দিলরুবা খান, শিক্ষাবিদ নূরুল ইসলাম ভাওয়াল রত্ন, গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের নবনির্বাচিত কাউন্সিলর হাসান আজমল ভুঁইয়া, আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল হাদী শামীম, রথমেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব অধ্যাপক মুকুল কুমার মল্লিক, যুগ্ম সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট সুদীপ কুমার চক্রবর্তী, সদস্য মানিক সরকার মাধব, সুশান্ত কুমার সরকার, রঞ্জিত মালাকার, সুভল পাল, ভজনদে প্রমুখ। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে রথটানে নারী-পুরুষসহ হাজার হাজার সনাতন ধর্মাবলম্বীরা অংশ নেয়। আগামী ১৮ জুলাই বৃহস্পতিবার উল্টো রথযাত্রার মাধ্যমে সমাপ্তি ঘটবে। তবে মেলা চলবে ২০ দিন।
রথযাত্রাকে ঘিরে শহরের রথখোলা ময়দানে বিশাল মেলা বসেছে। মেলা উপলক্ষে শহরের রথখোলায় রকমারি পণ্যের স্টল বসেছে। মেলায় সার্কাস, পুতুল নাচ, রাধাচক্কর ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের কাঠের আসবাবপত্র, মাটির তৈরি জিনিস, তৈজসপত্র, বাঁশ-বেতের জিনিস, চুড়ি, খেলনা ইত্যাদি নানারকমের পসরা বসেছে। রথযাত্রা ও রথমেলায় হিন্দু সমপ্রদায়ের লোকজন ছাড়াও ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দূর- দূরান্ত থেকে হাজার হাজার লোকের সমাবেশ ঘটে।
নরসিংদী প্রতিনিধি জানান, জগন্নাথদেবের রথযাত্রা উপলক্ষে গতকাল আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইসকন) নরসিংদীর উদ্যোগে শহরের বৌয়াকুড় দুর্গা মন্দির থেকে র্যালি বের হয়ে সেবা সংঘ এবং বাগবিতান ক্লাব হয়ে হাজার হাজার নারী-পুরুষ, শিশু সমন্বয়ে বর্ণাঢ্য র্যালিটি নরসিংদী শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে পলাশ উপজেলার বরাবব কুঞ্জু মেলায় গিয়ে মিলিত হয়। পরে সেখান থেকে পুনরায় র্যালিটি নরসিংদী এসে সমাপ্তি হয়। র্যালিতে নেতৃত্ব দেন রাম দাস, অধ্যক্ষ অহিভূষণ চক্রবর্তী, রঞ্জিত সাহা, দীপক সাহা, সুভাষ সাহা, তারপদ সাহা ভূষণ, নারায়ণ সাহা, সুপদ সাহা, স্বপন দাস, সুজিত্ মেম্বার প্রমুখ। জগন্নাথ বলদেব শুভদ্রা মহারানীর উল্টো রথযাত্রা হবে আগামী ১৮ জুলাই।
চট্টগ্রাম অফিস জানায়, উত্সবমুখর পরিবেশে চট্টগ্রামে শ্রী জগন্নাথদেবের রথযাত্রা উত্সব উদযাপিত হয়েছে। বিকাল ৪টায় নগরীর প্রবর্তক সংঘ মোড়ে রথযাত্রা উত্সবের উদ্বোধন করেন সিটি মেয়র এম মনজুর আলম। রথযাত্রার আয়োজন করে কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ ইসকন। এছাড়া গোলপাহাড় কালিবাড়ি মন্দির থেকেও একটি রথযাত্রা বের হয়। রথযাত্রাটি নগরীর বিভিন্ন সড়ক অতিক্রম করে ডিসি হিল হয়ে নন্দনকানন রাধামাধব মন্দিরে গিয়ে শেষ হয়। এসময় রাস্তার উভয় পাশে বিপুল সংখ্যক পুণ্যার্থী রথদর্শন ও প্রসাদ গ্রহণ করেন। দিবসের অন্যান্য কর্মসূচির মধ্যে ছিল মঙ্গলারতি, গুরুপূজা, তুলসিপূজা, নৃসিংহ বন্দনা, দর্শনারতি, শ্রীমদ্ভগবত পাঠ, বৈদিক যজ্ঞ, ভোগারতি, সংকীর্তন, ধর্মীয় আলোচনা এবং ডিসি হিল ‘নজরুল স্কোয়ারে’ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। রথযাত্রা চলাকালে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবেলায় নগরীর বিভিন্ন মোড়ে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করা হয়।
খুলনা অফিস জানায়, শ্রী শ্রী জগন্নাথ দেবের রথযাত্রা উত্সব গতকাল বুধবার খুলনায় বিপুল উত্সাহ, উদ্দীপনা ও ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতায় উত্সব মুখর পরিবেশে উদযাপন করা হয়। উত্সবের কর্মসূচীর মধ্যে ছিলো আলোচনা সভা, বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার মাধ্যমে রথটান, পূজা, প্রার্থনা, রথের মেলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং প্রসাদ বিতরণ।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ, খুলনা জেলা শাখার আয়োজনে ও বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ খুলনা জেলা ও মহানগর শাখার সহযোগিতায় নগরীর টুটপাড়া গাছতলা মন্দির প্রাঙ্গণে রথযাত্রা উদযাপন পরিষদের আহবায়ক স্বপন কুমার কুণ্ডুর সভাপতিত্বে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী বেগম মন্নুজান সুফিয়ান। এছাড়া বিশেষ অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন খুলনা জেলা পরিষদ প্রশাসক ও খুলনা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হারুনুর রশিদ, খুলনা মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি, সাবেক মেয়র আলহাজ্ব তালুকদার আব্দুল খালেক, খুলনা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এস এম মোস্তফা রশিদী সুজা ও মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আলহাজ্ব মিজানুর রহমান মিজান প্রমুখ। এদিকে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ খুলনা মহানগর শাখার উদ্যোগে জগন্নাথ দেবেন রথযাত্রা উত্সবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান আর্য ধর্ম সভা মন্দিরে অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন খুলনা বিভাগীয় কমিশনার মো. আব্দুল জলিল। বিশেষ অতিথি ছিলেন উপ-পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) হাসান মো. শওকত আলী, পূজা পরিষদের কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা সুজিত সাহা এবং ইস্কন খুলনার প্রধান উপদেষ্টা ড. তপচৈতন্য দাস ব্রহ্মচারী।
বরিশাল অফিস জানায়, শ্রী শ্রী জগন্নাথ দেব ও শুভদ্রা দেবীর রথযাত্রা উপলক্ষে নগরীতে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের করা হয়। আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবামৃত ইসকন ও জগন্নাথ দেবের মন্দিরসহ বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয়ের উদ্যোগে এ শোভাযাত্রা বের করা হয়। গতকাল বুধবার বিকেল ৫টায় নগরীর নতুনবাজারস্থ ইসকন মন্দির থেকে শোভাযাত্রাটি বের হয়ে সদর রোড ও চকবাজার রোডসহ বিভিন্ন সড়ক ঘুরে নতুন বাজারস্থ ইসকন মন্দিরে গিয়ে শেষ হয়।
খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি জানায়, খাগড়াছড়ি জেলার আটটি উপজেলায় গতকাল শ্রী শ্রী জগন্নাথ দেবের রথযাত্রা উত্সব পালন করেছে। পার্বত্য খাগড়াছড়ি জেলা সদরের শ্রী শ্রী রাধা বঙ্কু বিহারী মন্দির ( ইস্কন) পরিচালনা কমিটির উদ্যোগে শাপলা চত্বর মুক্তমঞ্চ প্রাঙ্গণে গতকাল বুধবার বিকেলে রথযাত্রা উত্সবের উদ্বোধন করেন খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও খাগড়াছড়ি জেলা আওয়ামী লীগ-এর সভাপতি কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক মো. মাসুদ করিম, পুলিশ সুপার শেখ মিজানুর রহমান, জেলা আওয়ামী লীগের নেতা মো. জাহেদুল আলম, আশীষ ভট্টাচার্য, শিব শঙ্কর দেব বক্তব্য রাখেন। জেলার ভাইবোনছড়া, গাছবান, ঠাকুরছড়া, পানছড়ি, রামগড়, দীঘিনালা, নয়মাইল, মাটিরাঙ্গা, গুইমারা, গৌমতি, তবলছড়ি, মহালছড়ি, মাইচছড়ি ও মানিকছড়ি উপজেলায়ও বিপুল উত্সাহ-উদ্দীপনায় ও ধর্মীয় নানান আনুষ্ঠানিকতায় রথযাত্রা পালিত হয়েছে। রথযাত্রা উপলক্ষে জেলা সদরসহ সকল উপজেলার জগন্নাথ দেবের মন্দিরসমূহে দিনব্যাপী উপাসনা ও কীর্ত্তন পরিবেশন করা হয়।
বান্দরবান প্রতিনিধি জানান, রথযাত্রা উত্সবে মানুষের ঢল নেমেছে। গতকাল বান্দরবানে নানা আয়োজনে উল্টো রথযাত্রা উত্সবের উদ্বোধন করেন পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান বীর বাহাদুর এমপি। জেলা প্রশাসক কেএম তারিকুল ইসলাম, জেলা পুলিশ সুপার কামরুল আহসান, পৌর মেয়র মোহাম্মদ জাবেদ রেজা, কেন্দ্রীয় দুর্গামন্দির কমিটির সভাপতি লক্ষ্মী পদ দাসসহ হিন্দু ধর্মাবলম্বী নারী-পুরুষরা উপস্থিত ছিলেন।
বুধবার বিকালে কেন্দ্রীয় দুর্গামন্দিরের সামনে থেকে জগন্নাথদেব স্মরণে বিশেষ কায়দায় তৈরি রথটি রথযাত্রা সহকারে শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে।
