আমার স্বামীসহ বুদ্ধিজীবী হত্যার বিচার চাই

আপডেট : ১০ জুলাই ২০১৩, ২২:৪০
জামায়াতের আমীর মতিউর রহমান নিজামীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের ১৩তম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দিয়েছেন শহীদ ডা. আব্দুল আলীম চৌধুরীর স্ত্রী শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী। গতকাল বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীরের নেতৃত্বাধীন যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ দেয়া জবানবন্দিতে তিনি বলেন, ‘১৯৭১ সালের ১৫ ডিসেম্বর আল বদর সদস্যরা হাই কমান্ডের নির্দেশে আমার স্বামীকে ধরে নিয়ে যায়। এরপর ১৮ ডিসেম্বর রায়েরবাজার বদ্ধভূমিতে আরো অনেক বুদ্ধিজীবীর সঙ্গে আব্দুল আলীমের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।’ জবানবন্দির শেষদিকে তিনি বলেন, ‘আমার নিরপরাধ স্বামীসহ বুদ্ধিজীবীদের যারা নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করেছে, আমার সন্তানদের পিতৃহারা করেছে আমি তাদের বিচার চাই। আমি ৪২টি বছর এই বিচারের অপেক্ষা করে আসছি। মৃত্যুর আগে আমি বুদ্ধিজীবী হত্যার সঙ্গে জড়িত আল বদর সদস্য ও এর হাই কমান্ডের বিচার ও সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানাই।’ জবানবন্দি শেষে তাকে জেরা করেন আসামিপক্ষের আইনজীবী মিজানুল ইসলাম। জেরা অসমাপ্ত অবস্থায় মামলার কার্যক্রম আজ বৃহস্পতিবার পর্যন্ত মুলতবি করা হয়েছে। উদয়ন স্কুলের প্রাক্তন প্রিন্সিপাল শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী প্রথমে তার এবং স্বামী আলীমের পরিচয় তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ১৯৬৫ সালে ডা. আলীমের সাথে আমার বিয়ে হয়। আমার স্বামী অত্যন্ত প্রগতিশীল এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী মানুষ ছিলেন। মহান ভাষা আন্দোলনেরও একজন সৈনিক ছিলেন। এছাড়া আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে তার সক্রিয় ভূমিকা ছিল। তিনি ডাক্তারির চেম্বার থেকে যা আয় করতেন তার অর্ধেকই সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যয় করতেন। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের পর থেকে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে নানা রকম কাজ করেন। ২৫শে মার্চ রাতে বাংলাদেশের অস্থায়ী রাষ্ট্রপ্রধান সৈয়দ নজরুল ইসলাম আমাদের বাড়িতে আশ্রয় নেন। ২৭ মার্চ কারফিউ শিথিল হওয়ার পর আমার স্বামী তাকে নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছে দেন। তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময় পল্টনে আমাদের তত্কালীন বাড়িতে আব্দুল মান্নান নামে একজন অপরিচিত লোক এসে তার বাড়ি পুড়ে গেছে বলে আশ্রয় চায়। আমাদের প্রতিবেশী মতিনের অনুরোধে আমরা তাকে আশ্রয় দেই। এর কিছুদিন পর আব্দুল মান্নান আমাদের বাড়িওয়ালার সাথে কথা বলে ওই বাড়ির নিচতলা ভাড়া নেয়। তার বাসায় পাকিস্তানি আর্মিদের যাতায়াত ছিল। তিনি বলেন, একাত্তর সালে আগস্টের শুরুর দিকে ছাই রঙের প্যান্ট এবং নীল রঙের শার্ট পরা অস্ত্র হাতে কিছু লোকের বাড়িটি ঘিরে রাখতে দেখি। এ বিষয়ে আমার স্বামী মান্নানকে জিজ্ঞাসা করলে সে জানায় এরা আল বদরের সদস্য এবং তিনি আল বদরের একজন সংগঠক। সাক্ষী বলেন, আল বদর সম্পর্কে জানতাম তারা স্বাধীনতার বিপক্ষে। মূলত ইসলামী ছাত্র সংঘের সদস্যরা আল বদর বাহিনী গঠন করে। তাদের কেন্দ্রীয় নেতা ছিলেন গোলাম আযম, মতিউর রহমান নিজামী ও আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ। বাঙালি নিধনে পাকিস্তানি সেনাদের সহায়তা করেছিলো আল বদরের সদস্যরা। তিনি বলেন, একাত্তরের ১৫ ডিসেম্বর বিকাল সাড়ে চারটার দিকে আমি, আমার স্বামী ও আমার মা ভারতীয় বিমান বাহিনীর বোম্বিং করার দৃশ্য দেখছিলাম। হঠাত্ আমি গাড়ির শব্দ শুনতে পাই। কাদামাখা একটি মাইক্রোবাস মান্নানের গেটের কাছে থামে। এর প্রায় ৩০ মিনিট পর আমাদের বাড়ির উত্তর দিকের দরজায় প্রচণ্ড ধাক্কার শব্দ শুনতে পেলাম। জানালা দিয়ে দেখি তিনজন লোক অস্ত্র হাতে নিয়ে আমাদের দরজায় লাথি মারছে। তখন আমার স্বামী দৌড়ে নিচে নেমে মান্নানের বাসায় গিয়ে দরজা খুলতে বললেন। মান্নান দরজা না খুলে একটু ফাঁকা করে বললেন আপনি যান আমি আছি। এরপর আমার স্বামী উপরের দরজা দিয়ে উঠে আসার চেষ্টা করে। তখন আল বদর সদস্যরা তাকে হাত উপরে উঠাতে বলে। আমার স্বামী তাদের কারণ জিজ্ঞাসা করলে তারা বলে, আমাদের সাথে চলেন। গেলেই জানতে পারবেন। আল বদর হাই কমান্ড নিজামীর নির্দেশে আপনাকে নিয়ে যেতে এসেছি। আমার স্বামী কাপড় বদলাতে চাইলেও তারা সে সুযোগ দিল না। এরপর আমার স্বামীকে রাতে ফিরে আসতে দেয়নি। তখন মান্নানের কাছে সাহায্য চাইলে সে আমাকে স্বামীর কাছে নিয়ে যেতে রাজি হয়। কিন্তু আমার মা আমাকে যেতে দেয়নি। পরদিন দেশ স্বাধীন হলো। ১৮ ডিসেম্বর শোনা গেল বদ্ধভূমিতে অনেক লাশ পড়ে আছে। সেখানে আমার স্বামীর ভাই হাফিজ চৌধুরী ও চেম্বারের সহকারী হাকিম ও মতিনসহ আত্মীয়-স্বজন গিয়ে রায়ের বাজার বদ্ধভূমিতে আমার স্বামীর লাশ পায়। সেখানে ডা. ফজলে রাব্বী, সাংবাদিক সেলিনা পারভীনসহ আরো বুদ্ধিজীবীর লাশ পড়েছিলো। তিনি বলেন, আমার স্বামীর হাত ও চোখ বাঁধা ছিলো। শরীর রক্তাক্ত ছিলো, বুক ঝাঁজরা হয়ে গিয়েছিলো গুলিতে। কোন মানুষ এভাবে আরেকজনকে মারতে পারে না। আমি আমার স্বামীসহ বুদ্ধিজীবী হত্যার সঙ্গে জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড চাই। তার জবানবন্দি নেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী তুরিন আফরোজ। এরপর জেরায় আসামিপক্ষের প্রথম প্রশ্নের জবাবে সাক্ষী বলেন, আমি এই প্রথম স্বচক্ষে মতিউর রহমান নিজামীকে দেখলাম। এর আগে পত্র-পত্রিকায় ও টেলিভিশনে দেখেছি। জেরা অসমাপ্ত অবস্থায় মামলার কার্যক্রম আজ বৃহস্পতিবার পর্যন্ত মুলতবি করা হয়েছে। এদিকে একই ট্রাইব্যুনালে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মামলার কার্যক্রম চার সপ্তাহের জন্য মুলতবি চেয়ে আসামিপক্ষের আবেদনের পর মামলার কার্যক্রম আগামী রবিবার পর্যন্ত মুলতবি করা হয়েছে।