‘কবিতা সব সময় তারুণ্যের মুখাপেক্ষী’

আপডেট : ১১ জুলাই ২০১৩, ১৮:১৩
বাংলা কবিতার বিরলপ্রজ কবিপ্রতিভা আল মাহমুদ। সমগ্র বিশ্বের বাংলা ভাষাভাষী মানুষদের মধ্যে প্রবলভাবে উচ্চারিত এক নাম। কবির জন্মদিন উপলক্ষে তাঁর মুখোমুখি হয়েছিলেন কবি শাহীন রেজা। প্রশ্ন : এখন দুই বাংলাতেই আপনি প্রধান কবি হিসেবে উচ্চারিত। বিষয়টিকে কীভাবে উপভোগ করেন? উত্তর : আমি প্রধান কবি হওয়ার জন্য কোনোদিন কবিতা লিখিনি। আমি চিরকাল শুধু একজন কবি হতে চেয়েছি। আজ সর্বত্র, বিশেষ করে এই উপমহাদেশসহ সমগ্র বিশ্বে বাংলা ভাষাভাষিদের মুখে আমার নাম উচ্চারিত হচ্ছে। এতে আমি অবাক হই না। এটা তো হতেই পারে। আমি তাদের কাছে কৃতজ্ঞতা জানাই। আর উপভোগের কথা বলছেন— ভালোই তো লাগে। জীবন সায়াহ্নে তাদের এই উচ্চারণ আমাকে উজ্জীবিত করে, আপ্লুত করে। প্রশ্ন : আপনি প্রায়শই বলেন কবি না হলে সংগীতজ্ঞ হতেন। এর নেপথ্য কারণ সম্পর্কে যদি কিছু বলতেন? উত্তর : যে শহরে আমার জন্ম সেই শহরকে সেসময়ে সেই কালে সংগীতের শহর বলা হতো। সেখানে বড় বড় ওস্তাদেরা ঘোরাফেরা করতেন—বাদ্যযন্ত্রের কারণে। তাঁরা সেখান থেকে বাদ্যযন্ত্র সংগ্রহ করতেন। আমাদের শহরের কারিগররা বাদ্যযন্ত্রের খোল-নলচে তৈরি করতেন, বাঁধাসাধা করতেন। শিরিষ কাগজ দিয়ে ঘসে আঠা লাগাতেন। আমি তাদের ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা একাগ্রতার সাথে তাদের কর্মকাণ্ড দেখতাম। তারা অনেক সময় আমাকে একটি টুল ঠেলে দিয়ে বসতে বলতেন। জানতে চাইতেন আমার বাড়ির কথা। মোল্লা বাড়ির ছেলে শুনে তারা উত্সাহিত হতেন। জানতে চাইতেন আমি বাদ্য বাজাতে চাই কি না। আমি বলতাম, আমি কি পারব? আমি যে শুধু কবিতা লিখতে পারি। এ কারণেই বলছি—কবি না হলে সংগীতের শহরে আমি নিশ্চয়ই একজন সংগীতজ্ঞ হয়ে বেড়ে উঠতাম। প্রশ্ন : সবাই বলে, ‘সোনালী কাবিন’-এর জন্য কবি আল মাহমুদ নোবেল পাওয়ার যোগ্য। আপনি কী বলেন— উত্তর : এটা যদি লোকে বলে তাহলে আমার কি আর বলার কিছুৃ আছে? তবে পৃথিবীতে অনেক বড় কবি আছেন যাঁরা নোবেল পাননি অথচ তাঁদের কবিতা আমাদের নিত্য-পাঠ্য। আমি মনে করি, কবিতা কবিতাই। কবিতা কখনোই কোনো নোবেল পুরস্কারের মুখাপেক্ষী নয়। প্রশ্ন : জীবনানন্দ দাশকে আধুনিক বাংলা কবিতার প্রবর্তক বলা হয়। তাহলে কি রবীন্দ্রনাথ-নজরুল আধুনিক নন? উত্তর : সন্দেহ নাই যে জীবনানন্দ দাশ আধুুনিক কবি। কিন্তু বাংলা কাব্যে আধুনিকতার প্রবর্তক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। প্রশ্ন : এক সময়ের প্রবল কবি ফররুখ আহমদ কিংবা জসীমউদ্দীন এখন অনেকটাই আড়ালে—বিষয়টিকে কীভাবে মূল্যায়ন করেন? উত্তর : আমি বিষয়টিকে মূল্যায়ন করি এভাবে—কালচক্রে যাঁরা কবিতায় নতুনত্ব নিয়ে আসেন নিঃসন্দেহে জসীমউদ্দীন তাঁদের একজন। জসীমউদ্দীনের কবিতার একটি লাইন আমি বলছি—‘কাল সে আসিবে মুখখানি যার নতুন চরের মতো’—এই পঙিক্তটি বাংলা কাব্যে বিপ্লব সৃষ্টি করেছিল। এর আগে কেউ মাটির সাথে, চরের সাথে প্রিয়তম নারীর মুখের তুলনা দেয়নি। যত তুলনা এর আগে দেওয়া হয়েছে সব চাঁদের সাথে। জসীমউদ্দীন প্রথম এই ধারা ভঙ্গ করেন। কোনো সৃজনশীল কবি কখনোই আঁড়ালে যান না। হয়তো নতুনত্বের জোয়ারে তাঁরা একটু পাশে সরে থাকেন। ফররুখ কিংবা জসীমউদ্দীনের ক্ষেত্রে এটিই ঘটেছে। প্রশ্ন : অনেকে বলেন, জীবনানন্দ দাশের অনেক কবিতাই ইয়েটস কিংবা কিটেসর ট্রান্সক্রিয়েশন। আপনি কী বলেন? উত্তর : এটা হলো ঔদ্ধত্য প্রকাশ। কারণ যারা চসার থেকে ইয়েটস পড়েছেন তারা জানেন ইংরেজি কবিতার মাধুর্য কী। না পড়ে বা না হূদয়ে ধারণ করে কিছু বলা অন্তত কাব্যের ক্ষেত্রে আমি সমীচীন মনে করি না। প্রশ্ন : বাংলাদেশের বর্তমান কবি ও কবিতা সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী? উত্তর : একসময় বলা হতো বাংলাদেশে নাকি কাকের চেয়ে কবির সংখ্যা বেশি। এটা শ্লেষ করে বলা হতো। কিন্তু এখন আমরা দেখছি শুধু কাকই কা কা করছে। কবিতা তো নেই। প্রশ্ন : একজন কবির চূড়ান্ত লক্ষ্য কী হওয়া উচিত? উত্তর : ছন্দের দোলা বুকে রেখে পঙিক্ত রচনা করা। প্রশ্ন : আমাদের দেশে কবিরা গোষ্ঠী বিভাজনে বিভক্ত—এটা কি আমাদের কবিতার জন্য ক্ষতিকর নয়? উত্তর : এটা কখনো কখনো ক্ষতিকর হয় তবে এই গোষ্ঠী বিভাজন সব সময়ই ছিল। সব কালেই ছিল। নানা গোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়ে ছিল কবির কোলাহল এবং কবির উচ্চারণই হলো ভাষার গতিবেগ নির্ধারণ। মানুষের ভাষা আছে আর কারও কোনো ভাষা নেই। প্রশ্ন : সৈয়দ আলী আহসান এবং আপনি—দুজনেই মুক্তিযুদ্ধের জন্য কাজ করেছেন। অথচ এক শ্রেণীর লেখক শুধুমাত্র ধর্মীয় আনুগত্যের বিচারে আপনাদের স্বাধীনতাবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করতে তত্পর। এ ব্যাপারে আপনার মন্তব্য কী? উত্তর : আমি তো মুক্তিযোদ্ধাই ছিলাম। আমি মনে করি, আমাদের বিরুদ্ধে প্রচারণাকারীরা বিজয়ী হয়নি। তারা পরাজিত হয়েছে। কালের ঘূর্ণনে কই তারা—কী নাম তাদের বলো? প্রশ্ন : আপনি প্রায়শঃই বলেন, ছন্দ-মাত্রা ছাড়া কবিতা পূর্ণতা লাভ করে না। তাহলে টানা গদ্যে লেখা কবিতা কি পূর্ণাঙ্গ কবিতা নয়? উত্তর : দেখ ভাই সত্য কথা হলো—আমি লিরিক্যাল পয়েট। গীতপ্রবণ কবি। অন্ত্যমিল ভালোবাসি, ছন্দের গীত ভালোবাসি। তুমি আমাকে একজন গীতপ্রবণ মানুষ বলতে পার। টানা গদ্যে লেখা কবিতাও কবিতা। তবে আমার পছন্দ গীত, ছন্দ। প্রশ্ন : বোদ্ধারা বলেন, একজন কবির জীবনে প্রেমের ভূমিকা অনস্বীকার্য। আপনি কি এর সাথে একমত? উত্তর : সব সময় হয়তো একমত হই না। তবে প্রেম কার না জীবনে আছে বলো? প্রেম আছে, একটি নারী আছে আত্মার ভেতরে। প্রশ্ন : রবীন্দ্রনাথ-নজরুল দুজনেই অসংখ্য গান লিখেছেন। আপনারা পঞ্চাশের কবিরা দুই-একজন বাদে (যেমন সৈয়দ শামসুল হক, মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান প্রমুখ) আর কেউ তেমনভাবে গান রচনায় এগিয়ে আসেননি—কেন? উত্তর : এটা হলো সাহিত্যের একটি স্বভাব যেটা আমরা অর্জন করেছিলাম এবং আধুনিকতার একটি পর্যায়কে অতিক্রম করেছিলাম। সেটা হলো আমরা গানের চেয়ে কাব্যের যে ছন্দ এবং মিল সেখানে সংগীত প্রবেশ করিয়ে দিয়েছিলাম। এ জন্য আর আমরা যন্ত্রের দোলায় ছন্দের শিক্ষা গ্রহণ করতে সময় পাইনি। কারণ কাজটি খুবই কঠিন ছিল। আমরা যেটা করেছি আজও করছি। প্রশ্ন : সাহিত্যের সাথে অর্থনীতির কোনো যোগসূত্র আছে কি? উত্তর : আছে। কবিরাও মানুষ—তাদেরও খেতে হয়, বাসাভাড়া দিতে হয়। প্রশ্ন : একজন কবির প্রকৃত অর্জন কী? পুরস্কার, পদক নাকি মানুষের ভালোবাসা? উত্তর : অবশ্যই মানুষের ভালোবাসা। অবশ্য পুরস্কার বা পদক কবিকে উত্সাহিত করে। প্রশ্ন : আপনার প্রিয় কবিদের সম্পর্কে যদি জানতে চাই— উত্তর :অবশ্যই রবীন্দ্রনাথ। আমাদের বাংলা কবিতায় তিনি চিরকালের আধুনিক একজন। রবীন্দ্রনাথ যিনি পাঠ করেছেন তিনি চিরকালের জন্য শিক্ষিত হয়ে গেছেন। প্রশ্ন : পঞ্চাশের পঞ্চপাণ্ডব হিসেবে আমরা যে পাঁচজন কবিকে শনাক্ত করি—তাঁরা হচ্ছেন—আপনি, শামসুর রাহমান, ফজল শাহাবুদ্দীন, সৈয়দ শামসুল হক এবং শহীদ কাদরী। আপনার এই সতীর্থদের সম্পর্কে জানতে চাই— উত্তর : এরা প্রত্যেকেই অনেক বড় মাপের কবি। আমি তাদের শ্রদ্ধা করি। তাদের সকলের সাথেই আমার বন্ধুত্বের সম্পর্ক। তবে যেহেতু আমরা সতীর্থ এবং সকলেই কবিতা লিখি তাই আমাদের মধ্যে কিছুটা ঈর্ষা কিছুটা প্রতিযোগিতা সব সময়ই ছিল। তার পরেও আমাদের মধ্যে উষ্ণতা ছিল ভালোবাসা ছিলো এবং এখনো আছে। শামসুর রাহমান তো চলেই গেছেন। তার সাথে আমার সম্পর্ক নিয়ে বাইরে অনেক কিছু প্রচলিত থাকলেও প্রকৃত অর্থে আমাদের সম্পর্ক ছিল অতিশয় নিবিড়। প্রশ্ন : বাংলা একাডেমী সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী? উত্তর : বাংলা একাডেমী তার কাজ করছে। আমি তাদের বর্তমান কাজ সম্পর্কে ততটা অবহিত নই। তবে যা দেখছি তাতে তো খারাপ কিছু দেখছি না। বইমেলা নিয়ে কিছু কথা ওঠে। এটা তো উঠতেই পারে। তবে সামগ্রিক বিচারে আমি আশাবাদী। প্রশ্ন : তরুণ কবিদের উদ্দেশে কিছু বলুন— উত্তর : কবিতা সব সময় তারুণ্যের মুখাপেক্ষী। তরুণরাই কাব্য সাহিত্যে নতুন কিছু নিয়ে আসে। আমি সব সময় এটা মনে করি। তরুণদের বলি—সত্ হও, মানুষ হও। প্রকৃত কবি হয়ে বেড়ে ওঠো।