আদিবাসী কোল সম্প্রদায়। পাঁচটি এলাকা পাঁচ জন সর্দার নিয়ন্ত্রন করে। এলাকাগুলোকে সবাই ‘কোল পাড়া’ বলে জানে। পাড়ার সর্দারদের ক্ষমতা অপরিসীম। চেইন অব কমান্ড খুবই পোক্ত। তাদের টপকিয়ে বা এড়িয়ে কোনো কিছু করা সম্ভব নয়। ছোট সর্দারেরা বয়সে বড় সর্দারকে মুরুব্বি বলে মানে। কোমর থেকে হাঁটু পর্যন্ত ‘কোপনি’ (হাফ ধুতি)—গায়ে ফতুয়া-মাথায় একটা ছোট্ট পাগড়ি খুবই সাদা-সিধে পোশাক সর্দারদের। সব সময় হাসি-মুখ; ‘কী খেদমত করতে পারি’—এ রকম গদ গদ ভাব। প্রাথমিক সাক্ষাতে বোঝাই যাবেনা এরা কত বুদ্ধিমান ও ধূর্ত। অনেক সময় এদের বুদ্ধির কাছে অনেক বড় ডিপ্লোম্যাটিও হার মানতে বাধ্য।
ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে এবার একই ওয়ার্ড থেকে দুই সত্ ভাই ওয়ার্ড মেম্বার পদে প্রতিযোগিতায় নামল। কমল চৌধুরী এবং সজল চৌধুরী। দুই ভাইয়ের মধ্যে কথা হয় না। তবে জনসমক্ষে ছোট ভাই সজল, বড় ভাইকে দেখলে হাতের সিগারেট লুকায় অথবা রাস্তার এক পাশে সরে লোক দেখানো সম্মান দেখায়। বড় ভাই কমল ধীর স্থির লোক। কোনো ঘোরপ্যাঁচের মধ্যে নেই। কোনটা সত্যি কোনটা মিথ্যে সরাসরি প্রকাশ করে লোকের বিরাগভাজন হয়। তবে কেউ তাকে মিথ্যাবাদী বা সুবিধাবাদী বলে না। ছোট জনের ধারণা সে খুবই বুদ্ধিমান। এবার নির্বাচনে জেতার নতুন ফন্দি বের করল সে। একবার যদি পাঁচজন লোক সর্দারকে হাত করতে পারে তা হলেই কেল্লা ফতে। কোল পাড়ার একটা ভোটও হাতছাড়া হবে না—তার জয়ও কেউ ঠেকাতে পারবে না। অতএব যেভাবেই হোক এদের কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে হবে এবং তার জন্য যা যা করার দরকার সবই করতে হবে।
ভোটের ব্লু প্রিন্ট অনুযায়ী ঠিক পনের দিন আগে পথে নামল সে। ছেঁড়াকাঁথা, বালিশ, রংচটা চাদর, আর একটা ভারী বক্সে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে সোজা ঠেলে উঠল কোল পাড়ার এক কর্মকারের ঝুপড়িতে। সে ভেবেছিল তার আগমনে বিরাট হই চই পড়ে যাবে কিন্ত তা হলো না। সর্দাররা একটু মুচকি হেসে সেলাম দিয়েই আপাতত দায়িত্ব পালন করল। সজল চৌধুরী বদ্ধপরিকর—এ পকেট থেকে পুরো ভোট আদায় করতেই হবে। সে জন্য ভোটারদের ত্রুটি বিচ্যুতি নিম পাতার মতো তেতো দেওয়া চলবে না। অতএব আত্মত্যাগের কসরত শুরু হলো। সকাল ভোরে তুলসীতলায় কিছুক্ষণ জপ অর্চনা করা, পাতায় করে ধাপড়ি রুটি ভাজি খাওয়া, জন খাটা শ্রমিকের মতো ওদের কাজে সাহায্য করা, শুধু গামছা পরে এঁদো পুকুরে চান করা, বিকেলে রং-চটা মগে করে চা মুড়ি খাওয়া, এমনকি রাতে নাচ গানের ফাঁকে হাড়িয়া পর্যন্ত টানা ইত্যাদি ইত্যাদি হরেক রকম কাজ। ভাবখান এই চেয়ে দেখ আমি তোমাদের সাথে মিশে গেছি, ভোটের উপহারটি আমাকেই দিও। মাঝে মাঝে তার একটু খটকা যে লাগে না তা নয়; এরা ভোটের ব্যাপারে কোনো কথা বলেনা কেন? হয়তো আগে থেকে গোপন তথ্য ফাঁস করতে চায় না তাই। যা-ই হোক অভিলাষের অভিযান চলতে থাকে।
দিন ঘনিয়ে এল। আর এক দিন বাকি। আশাবাদী সজল কথা আদায় করে নিশ্চিত হতে চায়। অনেক কষ্টে সুযোগ পেল বিকালে চা-মুড়ির আসরে। সবার সামনেই বড় সর্দারকে বলল—‘তা হলে বাবাজি, কালকে ভোটের দিন, আমি তো আর আসতে পারব না। তোমরা সকাল সকাল সবাইকে গুছিয়ে নিয়ে আমার জন্য ভোটটা দিয়ে এসো। দেরি করে লাভ কী?’
বড় সর্দার একবার মাথা ঘুরিয়ে সঙ্গীদের মুখের দিকে চেয়ে নিল। তারপর এক খাবলা মুড়ি মুখের ভেতর চালান করে সশব্দে চায়ের মগে চুমুক দিয়ে বলল; ‘বাবুজি, একটা কোথা (কথা) বুলবেক (বলব) তুই কিসু মনে করিস লাই (না)।’
সজল তো আকাশের চাঁদ হাতে পেল। সে ভাবল এরা বোধ হয় টাকা-পয়সা চায়। এর জন্য সে তো আগে থেকে প্রস্তুত, শুধু নিজে থেকে বলতে পারছিল না। সুযোগ লুফে নিয়ে বলল—‘অবিশ্যি (আবশ্যই), বলো কী বলতে চাও?’
সর্দারের উত্তর, ‘বাবুজি হামরা গরিব মানুষ, হামাদের ঘরে চেয়ার টেবুল কিসুই লাই। কেল (কাল) সকালে একটা চেয়ার আর একটা টেবুল চেয়ে এনে তুলসীতলায় রাইখে দিব। দাওয়াত থাকল তোরা দুই ভাই সকালে আসিস। চেয়ার থাকবে বসে পড়িস।’
একটা চেয়ারে দুজন বসা সম্ভব নয়। ওদের ভুলটা ধরিয়ে দেবার জন্য ব্যস্ত হয়ে বলল সজল ‘একটা চেয়ারে দুই জন কীভাবে বসব? উনি আমার বড় ভাই ওনার সামনে কি আমি বসতে পারি? আগে এসে বসলেওতো ওনাকে দেখে চেয়ার ছাড়তে হবে।’
বড় সর্দার একটু দম নিয়ে জোরে জোরে মন্তব্য করল।
‘তা হলে তুই বল বাবু ভোট টা কারে দিব? তুহাকে চেয়ার দিলেও তো ছাড়ে দিবি রে। যে লোকটা বসে থাকার ক্ষমতা রাখে চেয়ার তো তারি পাওয়া উচিত। লয় কি?’
