দেড় কোটি টাকায় ফিরে পাওয়া জীবন

আপডেট : ১১ জুলাই ২০১৩, ২৩:২৪
আগুনে পুড়ে যাওয়ার কী যন্ত্রণা তা বোঝানো যাবে না কোন উপমা দিয়েই। ধরেই নিয়েছিলাম মৃত্যুটা নিশ্চিত। আর আমার মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে পথে বসবে আমার পরিবার। কারণ আমি পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। মৃত্যু শয্যায় বার বার মনে পড়ছিল বাবা, মা, স্ত্রী ও এক মাত্র সন্তানের মুখটি। আমার অনুপস্থিতে তাদের দেখার কেউ থাকবে না। কিন্তু আল্লার রহমতে আমি বেঁচে আছি। এ জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও পুলিশ প্রধানসহ সবার কাছে আমি কৃতজ্ঞ। এ কথাগুলো পুলিশ কস্টেবল পিয়ারুল ইসলামের। তিনি বর্তমানে রাজারবাগ কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালে চিকিত্সাধীন। কিছুদিনের মধ্যেই পুরোপুরি সুস্থ হয়ে কাজে যোগদান করবেন বলে আশা করছেন। গত ৫ মে হেফাজত ইসলামের ঢাকা অবরোধকালে দুর্বৃত্তরা ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ডিসি পূর্ব ট্রাফিক অফিসে অগ্নিসংযোগ করে। এ সময় অফিসের দোতলায় দায়িত্বরত ছিলেন পিয়ারুল। তিনি জীবনকে তুচ্ছ করে চেষ্টা করেছেন আগুনের কবল থেকে অফিসের মূল্যবান কাগজপত্র রক্ষা করার। কিন্তু শেষটায় নিজেই অগ্নিদগ্ধ হন। অগ্নিকাণ্ডে পিয়ারুলের শরীরের ৪৬ ভাগ পুরো যায়। প্রথমে তাকে ভর্তি করা হয়েছিল ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ বার্ন ইউনিটে। অবস্থার অবনতি ঘটলে পিয়ারুলের চিকিত্সায় গঠিত মেডিক্যাল বোর্ড তাকে উন্নত চিকিত্সার জন্য বিদেশে প্রেরণের সুপারিশ করেন। এ অবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত উদ্যোগ এবং ঐকান্তিক আগ্রহে পিয়ারুলকে উন্নত চিকিত্সার জন্য গত ১৪ মে এয়ার এ্যাম্বলেন্সযোগে পাঠানো হয় সিঙ্গাপুরে। সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে উন্নত চিকিত্সা শেষে গত ২৯ জুন তিনি দেশে ফেরেন। বাংলাদেশ পুলিশ প্রধান হাসান মাহমুদ খন্দকার বলেন, পিয়ারুলের চিকিত্সা জন্য দেড় কোটি টাকা খরচ হয়েছে। পুরো টাকাই প্রদান করেছেন প্রধানমন্ত্রী। পিয়ারুল ইসলাম সুস্থ হয়ে উঠেছেন। খুব শিগগিরই তিনি কাজে যোগদান করতে পারবেন। পিয়ারুল ইসলামের গ্রামের বাড়ি নওগাঁও পোরশা। ২০০২ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি পুলিশ বাহিনীতে যোগদান করেন। দু’বোনের একমাত্র ভাই। বাবা মা ও স্ত্রী থাকেন গ্রামে বাড়িতে। ডিএমপিতে পোস্টিং পাওয়ায় পিয়ারুল থাকতেন রাজারবাগ পুলিশ লাইন ব্যারাকে। প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলার সময় পিয়ারুল কিছুটা আবেগাচ্ছন্ন হয়ে পড়েন। এসময় তার পাশে ছিলেন স্ত্রী শাহনাজ পারভিন শ্যামলী ও মেয়ে দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী সানজিদা ইসলাম পুস্প। পিয়ারুল ইসলাম কথা বলার শুরুতে তার উন্নত চিকিত্সার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও পুলিশের আইজি হাসান মাহমুদকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, আমি পুলিশের ছোট পদে চাকরি করছি। যে চিকিত্সা সহায়তা পেয়েছি তা ছিল আমার কল্পনাতীত। ৩০ লাখ টাকায় ভাড়া করা এয়ার এ্যামু্বলেন্সযোগে যখন সিঙ্গাপুর যাই তখন কিছু বোঝার মত অনুভূতিই ছিল না। সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে চিকিত্সায় আস্তে আস্তে সুস্থ হয়ে উঠতে থাকি। পর্যায়ক্রমে জানতে পারি বিস্তারিত ঘটনা। দেড়মাস চিকিত্সা শেষে দেশে ফিরি। সিঙ্গাপুর হাসপাতালে অবস্থানকালীন সময় পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নিয়মিত খোঁজ-খবর রেখেছেন। পুলিশ বাহিনীর প্রতিটি সদস্য আমার আরোগ্য লাভ কামনা করেছেন। ফলে সবার ভালবাসায় সব কষ্ট-বেদন ভুলতে সক্ষম হয়েছি। এজন্য সবার প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। পিয়ারুলের স্ত্রী শাহনাজ পারভিন শ্যামলী বলেন, ঘটনার সময় আমরা কেউ ঢাকায় ছিলাম না। দুর্ঘটনার খবর পেয়ে ঢাকায় আসি। আমরা তো আশাই ছেড়ে দিয়েছিলাম, পিয়ারুলকে বাঁচানো সম্ভব হবে না। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী ও আইজি স্যারের সর্বাত্মক আন্তরিকতা ও চেষ্টার জন্যই স্বামীকে ফিরে পেয়েছি। তাদের কৃতজ্ঞভরে ধন্যবাদ জানাই। তিনি বলেন, আশা করি খুব শিগগিরই পিয়ারুল সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে কাজে যোগদান করতে পারবেন। শ্যামলী তার স্বামী পিয়ারুলের আশু আরোগ্য লাভের জন্য সকলের দোয়া কামনা করেছেন।