উত্তরাঞ্চলসহ সারাদেশে বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। পদ্মা-যমুনা, তিস্তা-ধরলায় পানি বৃদ্ধির ফলে তীব্র ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। ফেরি-লঞ্চ চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। লাখ লাখ মানুষ পানিবন্দী হয়ে খাদ্য ও ত্রাণের অভাবে মানবেতর জীবনযাপন করছে। এ বিষয়ে আমাদের প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো খবর।
জামালপুর
জামালপুরের বন্যা পরিস্থিতি আরও অবনতি হয়েছে। গত ২৪ ঘন্টায় বাহাদুরাবাদ ঘাট পয়েন্টে ১৬ সেন্টিমিটার পানি বৃদ্ধি পেয়ে বৃহস্পতিবার দুপুরে যমুনায় বন্যার পানি বিপদসীমার ৯ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। জামালপুরের পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, ইসলামপুর উপজেলার পাথর্শী, কুলকান্দি, বেলগাছা, চিনাডুলি, সাপধরী, নোয়ারপাড়া, ইসলামপুর, দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার চুকাইবাড়ি, চিকাজানি, হাতিভাঙ্গা, ডাংধরা, বাহাদুরাবাদ, বকশীগঞ্জ উপজেলার মেরুরচর, সাধুপাড়া, নিলক্ষিয়া, মেলান্দহ উপজেলার কুলিয়া ও মাহমুদপুরসহ জেলার প্রায় ২০টি ইউনিয়ন বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। দেওয়ানগঞ্জের সানন্দবাড়ী এলাকায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ যমুনা গর্ভে বিলিন হয়েছে। এতে ইসলামপুরের কুলকান্দি, বেলগাছা ও শিংভাঙ্গা গ্রামসমূহের প্রায় ২ হাজার বসত-ভিটাসহ শত শত একর ফসলি জমি যমুনা গর্ভে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। জামালপুরের বন্যা কবলিত এলাকাসমূহে কমপক্ষে ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে।
ঠাকুরগাঁও
এদিকে টাঙ্গন, শুক, সেনুয়া, কুলি ও তিরনই নদের পানি কমতে থাকায় ঠাকুরগাঁওয়ের বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। উজানের ঢলের পানি বসতবাড়ি থেকে দ্রুত নেমে যাওয়ায় ঘর-বাড়ি ছেড়ে যাওয়া লোকজন নিজ নিজ বাড়িতে ফিরতে শুরু করেছে। ঠাকুরগাঁও পাউবো সূত্রে জানা গেছে, উজান থেকে নেমে আসা পানির পরিমাণ কমে যাওয়ায় আগামী ২৪ ঘন্টার মধ্যে জলবদ্ধতা আরও কমে আসবে। শুক্রবার সকালে ঠাকুরগাঁও শহরের ডিসিবস্তি, হঠাত্পাড়া, খালপাড়া, জলেশ্বরীতলায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, অধিকাংশ বসতবাড়ি থেকে অবিরাম বৃষ্টিপাত ও উজানের ঢলের পানি নেমে গেছে। পানি নেমে যাওয়ায় অনেক লোকজন বাড়ি ঘরে ফিরতে শুরু করেছেন।
কুড়িগ্রাম
কুড়িগ্রামের উপর দিয়ে প্রবাহিত নদ-নদীর পানি অব্যাহতভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বৃহস্পতিবার ধরলা নদীর পানি বিপদসীমার ১৮ সে. মি. উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। পানিতে আংশিক তলিয়ে গেছে ৩০টি ইউনিয়নের দুই শতাধিক গ্রাম। পানিবন্দী হয়ে পড়েছে প্রায় এক লাখ মানুষ। তলিয়ে গেছে প্রায় দু’শতাধিক হেক্টর জমির আমন বীজতলা ও উঠতি শাক-সবজির বাগান। চর এলাকার রাস্তা তলিয়ে যাওয়ায় বানভাসী মানুষ চরম দুর্ভোগকে সাথী করে নৌকা ও কলাগাছের ভেলায় যাতায়াত করছে।
দিনাজপুর
দিনাজপুরে ৪টি নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করে বেড়ে যাওয়ায় ১০টি উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে অসংখ্য মানুষ পানিবন্দী হয়ে দুর্ভোগের শিকার হয়েছে। জেলা ত্রাণ বিভাগ পানিবন্দী মানুষদের জন্য গত ২ দিনে ৯৮ টন চাল বিতরণ করেছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী এ এইচ এম মাহমুদ আলী বৃহস্পতিবার বন্যা দুর্গত এলাকা পরিদর্শন করেন। জানা যায়, জেলার ৪টি প্রধান নদী পুনভবা, করতোয়া, আত্রাই ও ইছামতির পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। নদীর পানি ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়ায় ১০টি উপজেলা দিনাজপুর সদর, বিরল, বোচাগঞ্জ, কাহারোল, খানসামা, চিরিরবন্দর, পার্বতীপুর, নবাবগঞ্জ, ঘোড়াঘাট ও ফুলবাড়ী উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দী মানুষ স্কুল, মাদ্রাসা ও বাঁধের উপর আশ্রয় নিয়েছে।
শিবালয় (মানিকগঞ্জ)
পদ্মা-যমুনায় পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় মানিকগঞ্জের দৌলতপুর, শিবালয়, হরিরামপুর উপজেলার বিভিন্ন সিকস্তি-পয়স্তি এলাকায় নতুন করে ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। পদ্মা-যমুনার তীব্র স্রোত ও ঢেউয়ের কারণে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া এবং আরিচা-কাজিরহাট নৌরুটে ফেরি-লঞ্চ, কার্গো-নৌকা ও অন্যান্য নৌযান চলাচল মারাত্মক ব্যাহত হচ্ছে। স্রোতের টানে বোঝাই ফেরি ডুবোচরে আটকে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে। আটকে যাওয়া ফেরি উদ্ধারে সময় লাগায় যাত্রী দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। এ কারণে উভয় ঘাটে যানজট তীব্র হচ্ছে। এদিকে, শিবালয় উপজেলার গোয়ারিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কমিউনিটি ক্লিনিক যমুনায় বিলীন হওয়ার উপক্রম হয়েছে। যেকোন সময় এ ভবনসহ আশপাশ এলাকা বিলীনের আশঙ্কা করা হচ্ছে। দুর্গম আলোকদিয়া, মধ্যনগর, পারুরিয়া, তিসুড়ী, তিসুন্দী, বাকসাটিয়া, চরকালক্যাপুর, বাঁচামরা ও বাঘুটিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় ভাঙ্গন তীব্র হয়েছে। এছাড়া ইছামতি, কালিগঙ্গা, ধলেশ্বরীতে অস্বাভাবিক পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নতুন নতুন এলাকা ভাঙ্গনের মুখে পড়েছে।
পীরগাছা (রংপুর)
গত দু’দিনে বৃহস্পতিবার প্রবল স্রোতে তিস্তার ভাঙ্গনে চর গাবুড়া গ্রামের একশ’ দশটি পরিবারের বসতবাড়ি, আবাদি জমি ও অসংখ্য গাছপালা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। গতকাল শুক্রবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, ভাঙ্গনের কবলে পড়া মানুষ ঘর-বাড়ি ও গাছপালা কেটে অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছেন। বন্যায় পানিবন্দী অনেকেই বন্যা আশ্রয় কেন্দ্রসহ বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নিয়েছে। বন্যা দুর্গত এলাকায় খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানি সংকট দেখা দিয়েছে। সরকারি কোন প্রশাসন বন্যা দুর্গত এলাকায় পরিদর্শন করেনি।
সাঘাটা (গাইবান্ধা)
উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ী ঢলে যমুনা নদীতে অস্বাভাবিকভাবে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় উপজেলার ৫টি ইউনিয়নের ২৬টি মৌজা প্লাবিত হয়ে বিশ সহস্রাধিক মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। সেই সাথে নদী ভাঙ্গন ভয়াবহ রুপ ধারণ করেছে।
সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, গত দুই দিনে পাহাড়ী ঢলে উপজেলার বিশ সহস্রাধিক মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। সেই সাথে নদীভাঙ্গন ভয়াবহ রুপ নিয়েছে। গোবিন্দী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও হাসিলকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ বিশাল জনবসতি হুমকির মুখে পড়েছে।
ফুলছড়ি (গাইবান্ধা)
ফুলছড়িতে বন্যা পরিস্থিতি অবনতি ঘটেছে। ২০ গ্রামের ১৫ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। বন্যা কবলিত এলাকার মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা স্থবির হয়ে পড়েছে। তাদের মধ্যে দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানিও খাদ্যের অভাব। পানির নীচে তলিয়ে গেছে চিনা, তিল, আমন বীজ তলা, উঠতি পাট, পটল, ঢেঁড়সসহ বর্ষাকালীন ফসল। পানি বৃদ্ধির পাশা পাশি তীব্র স্রোতে ব্যাপক ভাবে নদী ভাঙন শুরু হয়েছে। নদী ভাঙনে ৪ ইউনিয়নের ৪টি প্রাথমিক বিদ্যালয় ২ টি মসজিদ ৭শ’ বাড়িঘর ও ৬০ একর আবাদী জমি গাছপালা ভিটেমাটি নদীগর্েভ বিলীন হয়ে গেছে। জেলা প্রশাসক শুক্রবার রতনপুর, কাবিলপুর, ফজলুপুর, খাটিয়ামারি, কালাসোনা, নিশ্চিতপুর, খঞ্চাপাড়া গ্রাম পরিদর্শন করে ৩শ’ পরিবারের মাঝে ১০ কেজি করে চাল বিতরণ করেন।
নাগেশ্বরী (কুড়িগ্রাম)
নাগেশ্বরীতে বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় ব্রিজ ও সংযোগ সড়ক ভেঙ্গে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে। পানিবন্দী মানুষের কাছে এখনো পৌঁছায়নি কোন ত্রাণ সামগ্রী। শুকনো খাবারের উপর নির্ভরশীলদের মাঝে দেখা দিয়েছে খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট। বিপাকে পড়েছে গবাদী পশু নিয়েও। সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় বানভাসীরা চলাচল করছে কলা গাছের ভেলা ও নৌকায় করে।
