দেশের ব্যবসা বাণিজ্য পরিচালনার ক্ষেত্রে উদ্যোক্তারা কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছেন। একদিকে ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদের হার অপরদিকে বিদ্যুত্ এবং গ্যাসসহ নানা অবকাঠামো সমস্যার কারণে অনেক উদ্যোক্তার পক্ষে টিকে থাকা মুশকিল হয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে, দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নেয়ার লক্ষ্যে নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা তো দূরের কথা অনেক উদ্যোক্তা নিজেদের কারখানার উত্পাদন বন্ধ রেখেছেন। গত কয়েকদশকে দেশে যে উদ্যমী উদ্যোক্তা শ্রেণী তৈরি হয়েছিলো তাদের অনেকে ব্যবসা ছেড়ে যাচ্ছেন। চূড়ান্তভাবে এর প্রভাব পড়ছে দেশের অর্থনীতির ওপর।উদ্যোক্তাদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, নানা সমস্যার কারণে তাদেরকে দৈনন্দিন কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে। শিল্প স্থাপনের ক্ষেত্রে উদ্যোক্তাদের প্রাথমিক মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠে ব্যাংকঋণ। পৃথিবীর অন্যান্য দেশে শিল্পঋণের সুদের হার সিংগেল ডিজিট হলেও বাংলাদেশে তা কোন কোন ক্ষেত্রে ২০ শতাংশ। কোন কোন ক্ষেত্রে ব্যাংক এবং গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে সুদের হার নির্ধারিত হয়ে থাকলেও সেটির হার ১৬ শতাংশের কম নয়। এছাড়া মেয়াদি ঋণের সুদের হার বেশি হওয়ায় অনেকে শিল্প স্থাপনের চিন্তা থেকে সরে আসেন। জানা গেছে, মেয়াদি ঋণের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো দুই ধরনের সুদের হার নির্ধারণ করে থাকে। এর একটি হলো সুদের স্থায়ী হার। আরেকটি হলো ঘূর্ণায়মান হার। স্থায়ী সুদে ঋণ নিলে উদ্যোক্তারা শেষ পর্যন্ত নির্দেশিত হার সুদে ঋণ পরিশোধ করেন। আবার ঘূর্ণায়মান সুদের হারে ঋণ নিলে তার সুদের হার সময়ে সময়ে পরিবর্তিত হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটে দেয়া তথ্য মতে, কোন ব্যাংকেরই সুদের হার ১৭ শতাংশের কাছাকাছির বেশি না হলেও বাজার পরিস্থিতি একেবারেই ভিন্ন। এ বিষয়ে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই এ সহ-সভাপতি হেলাল উদ্দিন ইত্তেফাককে বলেছেন, বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা এখন ২০ শতাংশের ওপরে সুদ দিয়ে ঋণ নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করছে। এই হারে সুদ দিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করা একেবারেই দুরূহ। তিনি বলেন, যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক তারা রাজনৈতিক বিবেচনায় ব্যাংকের অনুমতি দিয়ে থাকে। এসব ব্যাংকের উদ্যোক্তাদের অনেকে ব্যবসার সাথে যুক্ত না থাকায় তারা ব্যবসায়ীদের কষ্ট বুঝতে পারে না। তাদের উদ্দেশ্য থাকে অতিরিক্ত মুনাফা। অন্য ব্যাংকগুলো তখন তাদের সাথে প্রতিযোগিতায় নামে। এই ব্যবসায়ী নেতার মতে, এমনিতেই আমরা নানা সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। তার ওপর ব্যাংকঋণের উচচ সুদের হারের কারণে ব্যবসায় টিকে থাকা অনেকের পক্ষে মুশকিল হয়ে পড়ছে।
এদিকে, কারখানাগুলোতে লাইন বসানো হলেও তাতে গ্যাসের সংযোগ দেয়া হচ্ছে না। আবার সংযোগ থাকলেও তাতে গ্যাসের চাপ থাকছে না। বিদ্যুতের লাইন থাকলেও অধিকাংশ সময় থাকতে হচ্ছে বিদ্যুিবহীন। এদিকে অনেকে ডিজেল জেনারেটর দিয়ে তাদের উত্পাদন সচল রাখছেন। উদ্যোক্তাদের অনেকের নামে ডিমান্ড নোট ইস্যু করার পর টাকাও জমা দেয়া হয়েছে। কিন্তু তারাও গ্যাস সংযোগ পাননি। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগে একটি চিঠি পাঠিয়েছে এফবিসিসিআই। এরপরও কোন প্রতিকার হয়নি। জানা গেছে, ব্যাংক একজন বিনিয়োগকারীর বিনিয়োগ প্রস্তাব বিবেচনা করার সময় অনেকগুলো বিষয় আমলে নেয়। এর মধ্যে গ্যাস এবং বিদ্যুত্ সংযোগ অন্যতম। যেসব উদ্যোক্তারা গ্যাস সংযোগ পাননি তাদের সবাই ব্যাংকের কাছে যে প্রস্তাব দিয়েছেন তাতে গ্যাস সংযোগের কথা উল্লেখ ছিলো।
শুধু ব্যাংক ঋণই নয়, দেশে ব্যবসা বাণিজ্য পরিচালনার ক্ষেত্রে আরো অনেক বাধা দিন দিন তীব্র হচ্ছে। ব্যাংকঋণ নিয়ে ব্যবসা করেন এমন একজন উদ্যোক্তা তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক সহ-সভাপতি এবিএম সামছুদ্দিন ইত্তেফাকের কাছে তার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাংকঋণ যেমন সমস্যা তার সাথে সাথে অন্য সমস্যাওগুলো প্রকট হয়ে উঠছে। ব্যাংকঋণের সুদের হার অনেক সময় ব্যাংক এবং গ্রাহক সম্পর্কের ওপর নির্ভর করে। এর ওপরও বাংলাদেশে ব্যাংক ঋণের সুদের হার পৃথিবীর যে কোন ব্যাংকের সুদের হারের চেয়ে বেশি। তাঁর মতে, ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদের হার ছাড়াও বিদ্যুত্ এবং গ্যাস সমস্যা প্রকট হবার কারণে উত্পাদন খরচের সাথে বাড়তি অর্থ যোগ হচ্ছে। নিয়মিত বিদ্যুত্ না থাকার কারণে তিনি তার কারখানায় প্রতিমাসে কয়েক কোটি টাকারও বেশি ডিজেল দিয়ে জেনারেটর চালান বলে জানিয়েছেন। এর ওপর শ্রমিকদের বেতন বাবদ প্রতিমাসে কোটি কোটি টাকা তাকে ব্যাংক ঋণ নিতে হচ্ছে। রপ্তানির বিপরীতে তিনি বিদেশ থেকে যে অর্থ পান তার প্রায় পুরোটাই তিনি ব্যাংকঋণের সাথে সমন্বয় করেন বলে জানান। এবিএম সামছুদ্দিন এর মতে, কাঁচামালের জন্য একজন উদ্যোক্তা ৬০ থেকে ৯০ দিনের জন্য ব্যাক-টুব্যাক এলসি খুলে। কিন্তু রপ্তানির ৯০ থেকে একশ দিনের মাথায় ওই পণ্য রপ্তানিমূল্য প্রত্যাবাসিত হয়। যার ফলে উদ্যোক্তাদেরকে ব্যাংকঋণ নিয়ে ব্যাক-টু-ব্যাক এলসির অর্থ পরিশোধ করতে হয়। তাঁর মতে, ডলারের মূল্যের তারতম্যের কারণেও উদ্যোক্তারা এখন নানা সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। চারমাস আগে প্রতিডলার ৭৯ টাকা করে কেনা হলেও এখন রপ্তানি মূল্যের সাথে তা ৭৭ টাকা দরে সমন্বয় হচ্ছে। এগুলোর সাথে পরিবহন খরচ উদ্যোক্তাদের জন্য একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে তিনি মনে করেন। তিনি জানান, গতবছর এই সময়টাতে গাজীপুরের কারখানা থেকে এক ট্রাক পণ্য চট্টগ্রামে পাঠাতে তার খরচ হতো ১০ হাজার টাকা। এখন তা কোন কোন ক্ষেত্রে ৩০ হাজার টাকার বেশি। বাড়তি এ অর্থ যোগ হচ্ছে উত্পাদন খরচের সাথে।
এদিকে শুধু রপ্তানির ক্ষেত্রেই নয়, ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদের হারের কারণে দেশে আমদানিকৃত নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম চড়ে যাচ্ছে। দেশে উত্পাদিত পণ্যের দাম বেশি তো পড়ছেই, সাথে সাথে ১৮ থেকে ২০ শতাংশ সুদে এলসির অর্থ নিয়ে বাজারে ন্যায্যমূল্যে ভোক্তাদের কাছে জিনিসপত্র পাঠানো কষ্টকর হয়ে পড়েছে।
