সিরাজগঞ্জের কাজীপুর উপজেলার ঢেকুরিয়া এলাকায় যমুনা তীর সংরক্ষণ কাজের দুই নম্বর সাইটে ধস নেমেছে। প্রচণ্ড ঘূর্ণাবর্তের ফলে সংরক্ষণ কাজের ৭০ মিটার এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত স্থানে চার থেকে পাঁচ মিটার গভীরতা সৃষ্টি হয়েছে। এতে জনমনে আতঙ্ক বিরাজ করছে। ভাঙন প্লাবনের কবলে অগণিত মানুষের চরম দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, নিম্নমানের কাজ এবং শুষ্ক মৌসুমে বাঁধের নির্মাণ কাজ শেষ না হওয়ায় এই ধস নেমেছে। স্থানীয়রা ঐ ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে দায়ি করেছে।
বাকি বাঁধটি হুমকির মুখে পড়েছে। ধস ঠেকাতে কর্তৃপক্ষ সিসি ব্লক, জিও ট্যাক ডাম্পিং অব্যাহত রেখেছে।
গত বছর দুই নম্বর সাইডের ৫০০ মিটার কাজের জন্য ১৩ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়। ইতিমধ্যে কাজটির প্রায় ৮০ ভাগ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এদিকে পানি বাড়ার সাথে সাথে উল্লেখিত স্থানে পানির প্রবল তোড়ে ঘূর্ণাবর্তের সৃষ্টি হয়ে ধস নামে।
এব্যাপারে পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী সরোয়ার জাহান জানান, এই পয়েন্টের সামনের অংশে চর জেগে ওঠায় স্রোতের তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় ধস দেখা দেয়। এতে আতঙ্কিত হবার কোন কারণ নেই। আসছে শুষ্ক মৌসুমে আবারো ভেঙে যাওয়া অংশ মেরামত করা হবে।
গত দুইদিনে যমুনার নদীর পানি ব্যাপক বৃদ্ধি পাওয়ায় সিরাজগঞ্জের কাজীপুর উপজেলার বাঐখোলা বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভাঙনের কবলে পড়েছে। বাঁধ রক্ষায় স্থানীয় লোকজন দিবারাত্রি সমানতালে কাজ করে যাচ্ছে। বৃহস্পতিবার বাঁধে সরজমিনে গিয়ে জানা যায়, চলতি বছর গান্ধাইল ইউনিয়নের, বাঐখোলা, শুভগাছা ইউনিয়নের ঘাঁটি শুভগাছা, বেরেরচর, রতনকান্দি ইউনিয়নের কুড়ালিয়া, চিলগাছা, বাহুকা, শিমলা এলাকার বিশাল জনপদের লোকজনকে যমুনার ভাঙনের হাত থেকে রক্ষার জন্য কাজীপুরের গান্ধা-ইল ইউনিয়নের বাঐখোলা হতে শুভগাছা ইউনিয়নের উত্তর সিমানা পর্যন্ত প্রায় আড়াই কিলোমিটার এলাকা বাঁধ নির্মাণ করা হয়। গত দুইদিনে পানি ব্যাপক বৃদ্ধি পাওয়ায় নির্মাণাধীন বাঁধটির ভাটির অংশে পানির প্রবল চাপে ভাঙন দেখা দেয়।
কাজীপুর উপজেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। বাঁধের অভ্যন্তরের গ্রাম, রাস্তাঘাট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও মসজিদে বন্যার পানি প্রবেশ করেছে। বন্ধ হয়ে গেছে যমুনা নদী তীর সংরক্ষণ কাজ। ভাঙন ঝুঁকিতে রয়েছে বাঐখোলা বাঁধের অভ্যন্তরের সহস্রাধিক মানুষ। যমুনার কাজীপুর অংশে পানি বিপদসীমার কাছাকাছি চলে এসেছে। এতে করে কাজীপুরের মাইজবাড়ি ইউপির ঐতিহ্যবাহী ঢেকুরিয়া হাটসহ ঢেকুরিয়া, জগত্গঞ্জ, বিলচতল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কচিকণ্ঠ কিন্ডার গার্টেনে পানি ঢোকার ফলে বন্ধ হয়ে গেছে। ঢেকুরিয়া হাটের জামে মসজিদে পানি প্রবেশ করায় মুসল্লিগণ বিকল্প স্থানে তারাবি ও জুমার নামাজ আদায় করছেন। এছাড়া বাঁধ অভ্যন্তরের বিলচতল ও চরাঞ্চলের শ্রীপুর, বদুয়ার পাড়া, সুতানারা, মল্লিক পাড়া, ভাঙ্গারছেও, মাইজবাড়ি, নতুন মাইজবাড়ি ও হাটগাছা গ্রাম বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে। পাউবোর উপ-সহকারী প্রকৌশলী সরোয়ার জাহান টিপু জানান, যেভাবে পানি বাড়ছে তাতে আগামী দুয়েক দিনের মধ্যে কাজীপুরের বহু এলাকা বন্যা আক্রান্ত হয়ে পড়বে।
গত মঙ্গলবার স্থানীয় সংসদ সদস্য প্রকৌশলী তানভীর শাকিল জয় বাঁধ এলাকা পরিদর্শন করেন এবং জরুরি ভিত্তিতে বাঁধের ভাঙন ঠেকাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করার নির্দেশনা দেন। অপরদিকে সংসদ সদস্যের আশ্বাসের প্রেক্ষিতে ঐ দিন থেকেই কাজিপুর উপজেলা ছাত্রলীগ সভাপতি আল-আমিন, ইউপি সদস্য সরওয়ার, আব্দুল আজিজ, প্রবিণ ব্যক্তিত্ব আব্দুল মজিদ মাস্টারের নেতৃত্বে এলাকার লোকজন স্ব-প্রণোদিত হয়ে ভাঙ্গন ঠেকাতে দিন-রাত বাঁধে বালির বস্তা ফেলছেন।
যারা উপজেলা বাসীর সার্বিক নিরাপত্তা ও সুবিধার্থে নিজেকে সর্বক্ষণ নিয়োজিত রাখেন, তারাই এখন আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। এ অবস্থা এখন সিরাজগঞ্জের চৌহালী উপজেলা পরিষদের প্রতিটি কর্মকর্তা-কর্মচারীর। গত ১ সপ্তাহে উপজেলা পরিষদের গোডাউন, ইউএনওর বাস ভবন, উপজেলা নার্সারী অফিস বিলীন হয়েছে। বিলীন হবার পথে থানা অফিস, বিআরডিবি অফিস, সোনালী ও কৃষি ব্যাংক ভবনসহ উপজেলা পরিষদ মূল স্থাপনা যা এখন মাত্র ৫ থেকে ১০ মিটার দূরে অবস্থান করছে। তবে ভাঙন প্রতিরোধে জিও ব্যাগ ফেলার যে কাজটি হচ্ছে তা একেবারে অপ্রতুল।
ভাঙন তদারকির দায়িত্বে নিয়োজিত টাঙ্গাইল পাউবোর এসও ইউনুছ আলী ও এলাকাবাসী জানায়, সিরাজগঞ্জের চৌহালীতে গত ২ সপ্তাহ ধরে যমুনা নদীতে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় এলাকায় বন্যা হবার পাশাপাশি তীব্র স্রোতে ঘূর্ণাবর্তের সৃষ্টি হয়ে নদী তীরবর্তী যমুনার পূর্ব পাড় বোয়ালকান্দি থেকে দক্ষিণে পাথরাইল পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে দেখা দিয়েছে ভয়াবহ নদী ভাঙন। ১ সপ্তাহে বিলীন হয়েছে এ এলাকার প্রায় ৫ শতাধিক ঘরবাড়ি, বেশ কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং হাজার-হাজার একর আবাদি ফসলী জমি।
স্থানান্তর করা হয়েছে উপজেলা শাখা সোনালী, কৃষি ব্যাংক, আলিয়া মাদ্রাসায় স্থানান্তর করা হয়েছে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস, খাসকাউলিয়া উত্তরপাড়ায় অবস্থিত প্রাণি সম্পদ অফিসে মত্স্য অফিস, চর জাজুরিয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে নির্বাচন অফিস, কেআর পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে রেজিস্ট্রি ও আনছার-ভিডিপি অফিস স্থানান্তর করে কাজ করা হচ্ছে। চৌহালীর সমাজ সেবক হাবিবুর রহমান হাবীব, ইউপি চেয়ারম্যান আখতারুজ্জামান মন্টু, ফারুখ সরকার বলেছেন, আমরা সবাই নদী ভাঙন কবলিত ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ। তারপরও উপজেলা পরিষদ অর্থাত্ আমাদের অস্তিত্ব নিয়ে বেঁচে ছিলাম; কিন্তু তাও আজ বিলীনের পথে। আশা করবো, সরকার উপজেলাবাসীর শেষ ঠাঁই উপজেলা পরিষদ রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
এ ব্যাপারে চৌহালী উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ, উপজেলা প্রকৌশলী নাসির আহমেদ জানান, আমরা আতঙ্কের মধ্যে প্রতিটি সময় অতিবাহিত করছি। যমুনা নদী কখন যে কি করে ফেলে বলা মুশকিল। এখন যে ভাবে স্বল্প পরিসরে ভাঙন রোধে কাজ করা হচ্ছে তা দিয়ে প্রায় শত শত কোটি টাকার স্থাপনা রক্ষা করা সম্ভব হবে কিনা সন্দেহ।
টাঙ্গাইল পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী জ্যোতি প্রকাশ ঘোষ জানান, আমরা চৌহালী উপজেলা পরিষদ রক্ষায় ৪ কোটি টাকার বরাদ্দ চেয়েছিলাম। আর পেয়েছি মাত্র ৪০ লাখ টাকা।
