তারা ৪২ বছর ধরে কাঁদছে। কিন্তু আজও পায়নি তাদের স্বামীহত্যার বিচার। এই কান্না বুকের মধ্যে চেপে রেখে টেনে নিয়ে যায় জীবনের দুঃসহ বোঝাকে। এদিকে প্রিয়তম স্বামী হারানোর বেদনা আর অন্যদিকে জীবন যাপনের যন্ত্রণা-এ নিয়ে দারুণ কষ্টে তারা পার করছে দীর্ঘ ৪২টি বছর। ওরা প্রায় আড়াইশ’ বিধবা রমণী।
ঠাকুরগাও সদর উপজেলা জাটিভাঙ্গা গ্রামের পৈশাচিক গণহত্যায় নৃশংসভাবে যাদের হত্যা করা হয়েছিল একাত্তরের এপ্রিলে। জাটিভাঙ্গায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তার এ দেশীয় দোসররা একই সঙ্গে ৩ হাজারেরও বেশি নিরীহ মানুষকে হত্যা করে এখানে। এখানেই ঘাতকের গুলিতে প্রাণ হারায় এই বিধবাদের স্বামী ও স্বজনরা।
এদের মধ্যে প্রায় ৩শ’ শহীদের স্ত্রী বর্তমানে দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে আছেন অর্ধাহারে-অনাহারে। কর্মক্ষমতা হারিয়ে সেই সব বিধবার অনেকেই অর্থের অভাবে চিকিত্সা করাতে না পেরে বিছানায় শুয়েই কাতরাচ্ছেন।
গণহত্যার প্রত্যক্ষ সাক্ষী সদর উপজেলার জগন্নাথপুর গ্রামের কান্দরি বেওয়া (৭০) বয়সের ভারে আজ ন্যুয়ে গেছেন। ১৯৭১ সালে স্থানীয় রাজাকারদের সহায়তায় পাক বাহিনী জাঠিভাঙ্গায় গণহত্যায় স্বামী গাঠু রামসহ স্বজন হারিয়েছেন তিনি। কোলে দু’সন্তান নিয়ে সহ্য করেছেন অনেক যন্ত্রণা। স্বজনহারা বেদনায় চোখের জল ফেলতে ফেলতে আজ ছানি পড়েছে দু’চোখেই। কর্মঅক্ষম হয়ে পড়ায় অথের্র অভাবে চিকিত্সা করতে না পেরে একটি ভাঙ্গা ঘরেই মৃত্যুযন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন কান্দরি। তার মতো তিরপা মোহন গণহত্যায় গুলিবিদ্ধ হয়ে নানা রোগে ভোগে বিছানায় পড়ে আছেন। প্যারালাইসিস রোগে আক্রান্ত চিকিত্সা করতে না পেরে পঙ্গু জীবন যাপন করছেন তিনি।
মৃত্যু পথযাত্রী কান্দরি বেওয়া বলেন, “স্বামী হারিয়ে সন্তান নিয়ে সহ্য করেছি অনেক কষ্ট। দু’চোখে জল ঝরতে ঝরতে আজ অন্ধ হয়ে গেছি। খেয়ে না খেয়ে কোনোমতে দিন পার করছি। তবু সেই রাজাকারদের বিচার চাই। দু’চোখে দেখতে না পারলেও রাজাকারদের বিচার হলে শান্তি পাব।”
পঙ্গুত্ব বরণ করে আজ কথাও বলতে পারছে না তিরপা মোহন। তার ছোট বোন শুকানী রানি বলেন, “অর্থের অভাবেই বড়ভাইয়ের চিকিত্সা বন্ধ রয়েছে। শুধু এ দু’জনেই নয়, সেই তাণ্ডবে তাদের মতো গণহত্যায় আত্মদানকারী পরিবারের ৩ শতাধিক বিধবা বেঁচে আছেন জীবনের সঙ্গে লড়াই করে। তাদের অভিযোগ স্বাধীনতার ৪২ বছরেও কেউ তাদের খোঁজ নেয়নি। অনেকের ভাগ্যে জোটেনি বয়স্ক বা বিধবা ভাতাও। স্বজন হারানোর বিচারের আশায় এই বিধবারা রাস্তায় নেমেছেন যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে।”
জগন্নাথপুরের আশামনি বেওয়া ও জাঠিভাঙ্গা বুড়াশিব গ্রামের ভুটরী বেওয়া অভিযোগ করে বলেন, “একটি বিধবা ভাতার কার্ডে ৩ মাস পরপর পাই মাত্র ৯শ টাকা। এ দিয়ে কি সংসার চলে? আর শীতের মৌসুম এলে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাই একটি কম্বল। সারা বছর আর কেউ রাখে না কোনো খবর।”
