অজো পাড়া গায়ের এক সময়ের ‘চন্দ্র হরির পাঠশালা’ আজ দেশ সেরা। আর এই ব্যতিক্রমী একটি বিদ্যালয় হলো ঠাকুরগাঁওয়ের রানীশংকৈল উপজেলার রানীশংকৈলের মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ২০০৮ সালে দেশসেরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের স্বীকৃতি পেয়েছে বিদ্যালয়টি। শিক্ষক-শিক্ষার্থী আর স্থানীয়দেও চেষ্টার ফসল এই অর্জন।
সরেজমিনে বিদ্যালয়টি পরিদর্শনকালে চত্বরে ঢুকতেই নজরে পড়ে স্কুলের নাম সম্বলিত বিশাল তোরণ। সে তোরণ পেরিয়ে স্কুল মাঠের চারদিক ঝকঝক-তকতকে পরিবেশ নজর কাড়ে। পতাকা দন্ডে পতপত করে উড়ছে জাতীয় পতাকা। পাশেই দেশের স্বাধীনতার জন্য যারা রক্ত দিয়েছেন তাদের স্মরণে স্মৃতিসৌধ। স্কুল ভবনের বারান্দায় সাজানো বিভিন্ন ফুলের টব।
শ্রেণীকক্ষের নাম রাখাা হয়েছে বিভিন্ন মনিষীর নামে। কক্ষের দেওয়ালে তাঁদের ছবিও আঁঁকা। মনীষীদের মধ্যে আছেন মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী,বীর শ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনের নামে রাখা হয়েছে শ্রেণী কক্ষের নাম, আবার কোন কক্ষের নাম দেওয়া হয়েছে সুফিয়া কামাল, বেগম রোকেয়া, নজরুল ইসলাম, রবীন্দ্র নাথ ঠাকুর, জসীমউদ্দীন ও ড. মুহম্মদ শহীদুলস্নাহ। শিশুদের ছোট থেকেই দেশের ইতিহাসের সঙ্গে পরিচিত করে দেওয়ার জন্য আঁঁকা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসও। রয়েছে বিখ্যাত মনিষীর বাণী।
বিদ্যালয়ের একটি কক্ষকে ব্যবহার করা হচ্ছে কমিম্পউটার ল্যাব হিসাবে। সেখানে রয়েছে ৩টি কম্পিউটার । তৃতীয় শ্রেণী থেকেই এখানে কম্পিউটার শিক্ষা বাধ্যতামূলক।
পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের মাল্টি মিডিয়া প্রজেক্টরে ই-বুকের মাধ্যমে গণিত বিষয়ে পাঠ নিচ্ছেন সহকারি শিক্ষকা ফারজানা আক্তার। তিনি জানালেন, আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পরিচিত করতে নিয়মিত মাল্টি মিডিয়ার মাধ্যমে পাঠ নেওয়া হয়। এতে অমনোযোগী শিক্ষার্থীদের ও আগ্রহ বেড়ে যায়। তাঁর পরনে দেখা গেল স্কুলের নির্ধারিত ইউনিফর্ম।
আরেকটি কক্ষে শোনা গেল তবলার তালে তালে হারমোনিয়ামের সুর। শিক্ষার্থীরা সমেবেতভাবে গাইছে ‘বিদ্যালয় মোদের বিদ্যালয় ,এখানে সভ্যতার ফুল ফোটানো হয়।’ সেই তালে তাল রেখে নাচছে ৬ ছাত্রী ।
অফিস কক্ষটি সাজানো হয়েছে বিভিন্ন স্মারক ও পুরস্কার দিয়ে। পাশের ৩টি আলমারিতে তাকে তাকে সাজানো শিশু মানস বই ও শিক্ষা উপকরণ।
দেওয়ালে সেটে দেওয়া হয়েছে তথ্য বোর্ড । বোর্ড থেকে জানা যায, বর্তমান ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা ৮৩৭ জন। ধারাবাহিকভাবে স্কুলের শতভাগ শিক্ষার্থী পাশ করছে। প্রাথমিক বৃত্তি পরীড়্গায় অংশ নিয়ে ২০১০ সাল পর্যন্ত্ম ২৩৯ জন ছাত্র-ছাত্রী বৃত্তি লাভ করেছে। ২০১০ সালে প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় অংশ নেয় ১৪২ জন। ওরা সকলেই উত্তীর্ণ হয়েছে।
প্রাক প্রাথমিকসহ ছয়টি শ্রেণীর ১১টি শাখা রয়েছে । প্রতিটি শাখায় ৫০জন ছাত্র-ছাত্রী, তাদের মধ্যে একজন ক্লাস ক্যাপ্টেন। ফুলের নাম নিয়ে প্রতিটি শাখায় রয়েছে ১০ জন করে উপ দল। মেধা অনুসারে আলাদা করা হয়েছে দলগুলো। দলগুলোর দলপতি শিক্ষার্থীদের সুবিধা-অসুবিধা স্কুল কর্তৃপক্ষকে অবহিত করে। প্রতিটি কক্ষেই রয়েছে নিরাপদ পানির ব্যবস্থা।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৩০ সালের দিকে রানীশংকৈল উপজেলার পালপাড়া গ্রামের চন্দ্র হরিপাল নিজ বাড়িতে একটি পাঠশালা খুলেন । নাম দেন ‘চন্দ্র হরির পাঠশালা’। তাঁর মৃত্যুর পর বন্ধ হয়ে যায় পাঠশালাটি। এরপর এলাকার সহোদর চিকিত্সক ধীরেন্দ্রনাথ রক্ষিত ও সুরেন্দ্রনাথ রক্ষিত এক একর ৫ শতক জমি দান করার পর চন্দ্রহরির পাঠশালাটির নাম পরিবর্তন করে রানীশংকৈল প্রাথমিক বিদ্যালয় নামকরণ করা হয়। এরপর ১৯৭৩ সালে বিদ্যালয়টি জাতীয়করণ করা হয়। ১৯৯২ সালে রানীশংকৈল প্রাথমিক বিদ্যালয়কে উপজেলার মডেল বিদ্যালয়ে রুপান্ত্মরিত করা হয়। সেই থেকে রানীশংকৈল মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয়।
বিদ্যালয়ের বয়োজোষ্ঠ্য সহকারি শিক্ষিকা রেবা রানী রায় জানান, ১৯৯২ সালে বর্তমান প্রধান শিক্ষক বিজয়কুমার যোগদান। তখন যোগদানের পর স্কুলের পরিবেশ দেখে তাঁর মন বিষন্ন হয়ে যায়। পর্যাপ্ত শ্রেণী কক্ষ নেই, মাঠের নোংরা আবর্জনার দূর্গন্ধ । একদিন স্কুলের সব শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ডেকে বললেন, স্কুলটি কার? উত্তরে ছাত্র-ছাত্রীরা সমস্বরে চিত্কার করে বললো ‘কেন আমাদের’। এর জবাবে তিনি আবার জানতে চাইলেন,তবে স্কুলের মাঠ এত নোংরা কেন ? এরপর প্রধান শিক্ষক নিজেই বললেন, ‘আজ আমরা স্কুল মাঠের শুধুমাত্র চার হাত জায়গা পরিস্কার করবো।’ এই বলে তিনি মাঠ পরিস্কার শুরু করলেন। তাঁর সঙ্গে যোগ দিলেন শিক্ষক ও ছাত্র-ছাত্রী সবাই।সেই শুরু বিদ্যালয়ের বদলে যাওয়া।
এরপর প্রধান শিক্ষক এলাকার সুধীজনদের নিয়ে বিদ্যালয়ের পড়ালেখার পরিবেশ সৃষ্টি করতে সহযোগিতা চাইলেন। সেদিনই সুধী সমাজের সহায়তায় স্কুলে বিদ্যুত্ত- সংযোগ দেওয়া হয়। পরে সবার সহযোগিতায় নির্মাণ করা হলো দুইটি শ্রেণী কক্ষ। প্রধান শিক্ষকের পরিকল্পনায় শিক্ষকরা প্রতিটি শিক্ষার্থীর বাড়ি বাড়ি পরিদর্শন করে কথা বলেন অভিভাবকদের সঙ্গে।
বিদ্যালয়ে মা সমাবেশ শুরু হলো। উপজেলার সব রাজনৈতিক দলের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের নিয়ে সার্বজনীন কমিটি করা হলো। সবার সহযোগিতায় পর্যায়ক্রমে নিশি্চত হলো শিক্ষার পরিবেশ, বাড়লো ছাত্র-ছাত্রীদের উপস্থিতির হার, সেই সঙ্গে ফলাফল।
বিদ্যালয়ের উন্নয়নে স্কুল পরিচালনা পরিষদের পাশাপাশি গঠন করা হয়েছে শিক্ষক অভিভাবক কল্যাণ সমিতি। কমিটিগুলো স্কুলের উন্নয়নে একযোগে কাজ করেন ও সেই সঙ্গে লেখাপড়ার দেখভাল করে থাকেন। ছেলে-মেয়ের শিক্ষা প্রতি মায়েদের সচেতন করতে আয়োজন করা হয় মা সমাবেশ।
২০০৮ সালে প্রতিটি অভিভাবকের কাছ থেকে মাথাপিছু অতিরিক্ত ২ টাকা করে নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে একটি কল্যাণ তহবিল । সেই তহবিল থেকে চলতি মাসে ১৩৩ জন শিক্ষার্থীকে বিদ্যালয়ের নতুন পোশাক ও একজনকে চিকিত্সার জন্য অর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। এছাড়াও দরিদ্রদের বিনা মূল্যে বিতরণ করা হয় খাতা , কলম ও বই।
স্কুলের দূর্বল ছাত্র-ছাত্রীদের রাতে আড়াই ঘন্টা পাঠদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের জন্য রাখা হয়েছে নিজস্ব জেনারেটর। এখানে অতিরিক্ত আরও ৪ জন শিক্ষক শিক্ষা দেন। তাদের সম্মানী দেওয়া হয় অভিভাবক কল্যাণ সমিতি থেকে।
স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের শিক্ষার খোজ খবর নেওয়ার জন্য সব অভিভাবকদের মুঠোফোন নম্বর সংরক্ষণ করা হয়েছে। উপস্থিতি বাড়াতে পরীক্ষায় উপস্থিতির ওপর রাখা হয়েছে ৫০ নম্বর।
রানীশংকৈল উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা উকিল চন্দ্র রায় জানান, ২০০৮ সালে রানীশংকৈল মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে দেশের সেরা বিদ্যালয়ের স্বীকৃতি দেয় প্রাথমিক ও গণ শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এছাড়াও বিদ্যালয়টি শিক্ষার্থীর উপস্থিতি ক্যাটাগরিতে ২০১০ সালে রংপুর বিভাগে শ্রেষ্ঠ স্থান লাভ করে।
