আঠারো গন্ডা পুকুর

আপডেট : ১৪ জুলাই ২০১৩, ১৯:৫৬
ইতিহাস এবং ঐতিহ্য যে কোন জাতির জন্য অহংকার এবং গৌরবের বিষয়। প্রত্যেক জাতি বা ভূখন্ডের নির্দিষ্ট কালের প্রয়োজনে গড়ে ওঠে যে শিল্প-বাণিজ্য, স্থাপত্য, সংস্কৃতি তাই তার কালীক ইতিহাস। একটি জাতির ইতিহাস মূলত: তার সংস্কৃতির ইতিহাস। সংস্কৃতি এক সময় ঐতিহ্যে পরিণত হয়। সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য পূর্ব পূরুষের কথা বলে, আর ব্যক্তি এবং সমস্টি আগামি দিনের সুন্দর কল্যানময় ভবিষ্যত নির্মাণে ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে প্রভাবক হিসেবে কাজে লাগায়। এই জন্য প্রজন্মের আজন্ম কৌতুহল ইতিহাস ও ঐতিহ্যের গূঢ় রহস্য উন্মোচনের। সেই আলোকে দেশের উত্তরপ্রান্তিক জেলা ঠাকুরগাওয়ের আঠার গন্ডা পুকুর দারুন বিষ্ময়ের উদ্রেক করে। পীরগঞ্জ উপজেলা পরিষদের পূর্ব পাড়ে প্রবহমান পূণর্ভবা নদী ও পশ্চিমে টাঙ্গনের মাঝখানে কোষারাণীগঞ্জ থেকে দানারহাট প্রায় দশ কিলোমিটার দীর্ঘ এলাকার মাঝখানে আজকের কোষা বিলকে রেখে দুই ধারে সারিবদ্ধভাবে ‘আঠার গন্ডা পুকুর’ অর্থাত্ ৭২টি পুকুর দেখা যায়। এবং এগুলোর আকারে ও নামের ভিন্নতা লক্ষ করা যায়। কোন কোন স্থানে মাটির উপরেই পুরোনো সাইজের ইটের সতূপ ও স্থাপনা দৃশ্যমান। শিবের ছোট আকারের মূর্তি ছাড়াও বিভিন্ন মূর্তি, ব্যবহার্য অলংকার এখানে পাওয়া গেছে এবং যাচ্ছে। এখনও ভূমি থেকে প্রায় দশ ফুট উঁচু ইটের সতূপ বিদ্যমান। প্রায় দশ কিলোমিটার সারিবদ্ধভাবে আঠার গন্ডা পুকুরের অবস্থান ও প্রাচীন ইটের আকার ও আয়তন নিশ্চিত করে সমৃদ্ধ ঐতিহ্যকে। হাতছানি দেয় বিষ্ময়কর ইতিহাসের। ইতিহাস পাঠে জানা যায়, প্রাক মুসলিম যুগে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্বাধীন রাজার অস্তিত্ব। সারিবদ্ধ আঠার গন্ডা পুকুর ও দশ ফুট উঁচু ইটের সতূপ দেখে ধারণা হয় যে, একদা এক বিশাল আকারের প্রতিরক্ষা বাহিনী ও জনগোষ্ঠীর প্রাত্যাহিক প্রয়োজনে এসব পুকুর খনন ও স্থাপনা গড়ে উঠেছিল। এ রকম অসংখ্য ইতিহাস ও ঐতিহ্যের নিদর্শন সমূহ মাটির গহ্বরে অনাবিষকৃত রয়ে গেছে এখানে। যা আবিষকৃত হলে অঞ্চলটি যেমন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে, একই সঙ্গে জাতি তার সামর্থ ও সমৃদ্ধি সম্পর্কে অবহিত হতে পারবে। আসুন আমরা আমাদের নিজ নিজ এলাকার ইতিহাস ও ঐতিহ্য রক্ষায় এবং অনুসন্ধানে উত্সাহী হই। আমরা আমাদের প্রজন্মকে জানাতে চাই- আমরা আকষ্মিক বা অনাহুত নই। দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট ও পঞ্চগড়ের (পাঁচটি গড়) মতই রয়েছে আমাদের অতীত মানব বসতির ইতিহাস, পার্শ্ববর্তী উপজেলা রাণীশংকৈলের ধর্মগড়, গন্ডগ্রাম গড়, রাণীশংকৈল গড় এবং রাণীশংকৈলে প্রায় দুই কিলোমিটর আয়তনের বাংলাগড়। বাংলাদেশ সৃষ্টির বহু আগে থেকেই এ মাটির গড়টি বাংলাগড় নামেই পরিচিত। পাথর নির্মিত মসজিদ, নেকমরদ বাজার শাহ্ সুফি নাসির উদ্দিনের নামানুসারে ইতিহাস বিখ্যাত নেকমরদ মেলা। এ অঞ্চলের উঁচু সমতল ভূমিতে দেখা যায় মানব বসতির প্রথম যুগ থেকেই জনবসতির উপস্থিতি। পরবর্তীতে উলে¬খিত এ স্থানগুলি আমাদেরকে প্রতিনিয়ত প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে, উত্তর জানবার। এ কথা সর্বজনবিদিত যে, প্রবাহমান নদীর মতই আমরা বহন করে চলেছি আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে। আশা করি উত্সাহী প্রশ্নতাত্ত্বিক, গবেষক, দায়বদ্ধ রাষ্ট্রীয় সংশি¬ষ্ট কর্তৃপক্ষ একদিন আঠার গন্ডা পুকুর সহ সকল প্রত্নস্থলের ইতিহাস উন্মোচনে দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে আসবেন। সুন্দর আগামীতে দ্যুতি ছড়াবে আমাদের অতীত। লেখক ঃ ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ, রাণীশংকৈল ডিগ্রি কলেজ, রাণীশংকৈল, ঠাকুরগাও।