রোজা সংযম এবং সামাজিকতা

আপডেট : ১৪ জুলাই ২০১৩, ১৯:৫৭
রোজা মানে সংযম। মুসলিমপ্রধান আমাদের দেশে রোজার মাস অনেকটা উত্সবমুখর থাকে। ইফতার পার্টিগুলোতে নতুন করে পুরাতন সম্পর্কগুলো ঝালিয়ে নেয়ার সুযোগ মেলে। পাশাপাশি মুসলমান ছাড়াও অন্য ধর্মের বন্ধুবান্ধব কিংবা অফিসের সহকর্মীদের সাথে ইফতার করা হয়। এতে বাড়ে ধর্মীয় সমপ্রীতি, সামাজিক মেলবন্ধন। আর বাড়িতে আয়োজন তো চলেই। বাড়ির আয়োজনের প্রাণকেন্দ্র গৃহিণী। রোজার মাসের সংযম এবং সামাজিকতা নিয়ে আমাদের এই প্রতিবেদনটি লিখেছেন— সামিহা সুলতানা অনন্যা অফিস শেষে রিকশায় বসেই ফোন করতে বসেছে আয়েশা। তার আজ বাড়ি ফিরতে দেরি হয়ে গেছে। বাড়ির গৃহকর্মীকে বুঝিয়ে বলছে ডাল বাটা করতে, বেগুন কেটে রাখতে। বাড়িতে গিয়েই সে ইফতার বানাবে, নিজ হাতে প্রস্তুত ইফতারী পরিবারকে খাওয়াবে। এভাবেই কর্মজীবী নারীকে অফিসের পাশাপাশি সেহরি-ইফতারের আয়োজনের দায়িত্ব পালন করতে হয়। অফিসে দায়িত্বশীল কর্মকর্তা আর বাসায় দায়িত্বশীল গৃহিণী। বছর ঘুরে আবার এল পবিত্র মাহে রমজান। রমজান ধৈর্য ও সংযমের মাস। রমজানে পরিবারের সকলে মিলে ইফতারী করার মধ্য দিয়ে পারিবারিক বন্ধনের পাশাপাশি, সামাজিক বন্ধনও বাড়ে। রমজানে ইফতারীর মাধ্যমে পারিবারিক সম্প্রীতি রক্ষার দায়িত্বটি পালন করে মূলত নারী। পরিবারের সকলে মিলে দিন শেষে ইফতারী এবং শেষ রাতে সেহরীর মধ্য দিয়ে পারিবারিক রুটিনমাফিক জীবনে যোগ হয় এক নতুন মাত্রা। রোজায় আশেপাশে পাড়া প্রতিবেশীদের কাছ থেকে পাঠানো হয় নানারকম ইফতারী। তেমনি নিজ হাতে তৈরি ইফতারী তাদের বাড়িতে বাড়িতে পাঠানো হয়। এর মধ্য দিয়ে পাড়া প্রতিবেশীদের সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধি পেতে থাকে। রোজায় সবাই মিলে ইফতারীর মধ্য দিয়ে সামাজিক সম্পর্ক আরও গভীর হয়। রোজায় অফিসে সকলে মিলে ইফতারীর আয়োজন করা হয়। এর মধ্য দিয়ে অফিসিয়াল সম্পর্কের বাইরে বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে উঠে। একসাথে মুড়ি-পেঁয়াজু-বেগুনি মাখিয়ে খাওয়ার মধ্য দিয়ে অফিসের সব কর্মচারীর মধ্যে জাগে এক উত্সব উত্সব পরিবেশ। সকলে মিলে যে তারা এক বড় পরিবারের সদস্য সে অনুভূতি আরও গাঢ় হয়। অনেক সময় অফিসের কর্মচারীদের পরিবারও সে ইফতারীতে অংশগ্রহণ করে থাকে। তাতে পারিবারের কাছে চির অচেনা অফিস ও অফিসাররা যেমন পরিচিত হয়ে উঠে তেমনি অফিসাররাও তাদের সহকর্মীর পরিবারের সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পায়। বিশেষভাবে ঈদের আগের দিনগুলোয় দোকান কর্মকর্তা, ব্যাংকারসহ নানা প্রতিষ্ঠানের নারী-পুরুষ সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীর উপর দিয়ে এক বড় ধকল যায়। সে সময় বাধ্য হয়ে কাজের চাপে হলেও একত্রে ইফতারী করতে হয়। দিনভর রোজার ক্লান্তিকে জয় করে খেটে একসাথে ইফতারী করার যে আনন্দ তা এক কথায় বিরল। রোজা-ইফতারী কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য এক বিশেষ উত্সব। সারাদিন ধৈর্য ও সংযমের সাথে রোজা পালন ও নানা জায়গায় টিউশনি শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের রুমে রুমে ছাত্র-ছাত্রীরা যেন এক উত্সবে মেতে ওঠে। একত্রে কক্ষের সবাই মিলে ইফতার করে। আবার হলের পক্ষ থেকে আলাদাভাবে ইফতারীর ব্যবস্থাও করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে একসাথে ইফতার করার মধ্য দিয়ে যে মজা তা জীবনে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকে। সে ইফতারীর আয়োজন যেমনই হোক না কেন। কখনও হয়ত তা হয় পথের দোকান থেকে কেনা, তো কখনও চানাচুর মুড়ি মাখা। আবার প্রতিটি ব্যাচ থেকে আলাদাভাবে ইফতারের ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে। কার্জন হল, কলা ভবন, টিএসসি এ সময় ছাত্রছাত্রীদের কোলাহলে থাকে পরিপূর্ণ। আবার রোজার মাস প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীদের জন্য এক আনন্দমুখর মিলনের সময় হিসেবে গণ্য হয়। পাস করে যাওয়া ছাত্রছাত্রীরা তাদের পুরনো স্মৃতি রোমন্থন করতে এদিন একত্রিত হয়। সেদিন সন্ধ্যায় থাকে ইফতারের বিশেষ আয়োজন। তাদের বর্তমান চাকরিজীবন ও পুরনো দিনের স্মৃতি দিয়েই রোজার সেই দিনটি হয়ে উঠে পরিপূর্ণ। সম্পূর্ণ রোজার মাসটিতে সেদিনের অপেক্ষায়ই তারা বসে থাকে। হয়ত চাকরি, পরীক্ষার পড়া পড়তে পড়তেও একত্রে মাটিতে বসে ইফতার করা হয়। তাই পবিত্র রমজান মাস সমাজের জন্যও এক গুরুত্বপূর্ণ অর্থ বহন করে। ধর্মীয় অনুভূতির দিক থেকে এর মাহাত্ম্যের পাশাপাশি সামাজিকভাবেও এর গুরুত্ব অনেক। সকলে মিলে রোজা পালন করার মধ্য দিয়ে পথের না খেয়ে থাকা শিশুটির কষ্ট উপলব্ধি করা যায়। সে মাসটির জন্য হলেও সকলে অনুভব করে সারাদিন না খেয়ে থাকার কি কষ্ট। পথের রিকশাচালক থেকে শুরু করে সকল দিনমজুরও একসাথে ইফতার করে। কখনও রিক্সাযাত্রীও সেই ইফতারে শরিক হয়। তা হোক না কলা-রুটি বা অন্য কিছু। সেখানে ধনী-গরিবের পার্থক্য থাকে না। মানুষের প্রতি মানুষের মমত্ববোধ বড় হয়ে ওঠে। রমজানে শুধু বাড়ি একা বসে না থেকে, সকলে মিলে ইফতার করার মধ্য দিয়ে সামাজিক যোগাযোগ বাড়ে, দূরের অতিথি কাছের মানুষে পরিণত হয়। এভাবে পবিত্র রমজান মাসে রোজা পালন ও একত্রে ইফতার করার মধ্য দিয়ে ধর্মের পাশাপাশি আমাদের সামাজিক বন্ধনও দৃঢ় হয়।