১৯৮৪ সালে বৃহত্তর দিনাজপুর জেলাকে ভেঙে ৩ টি জেলা করা হয়। এর মধ্যে পঞ্চগড় ও দিনাজপুরের মাঝখানে ঠাকুরগাঁও জেলা। এ জেলার মোট জনসংখ্যা প্রায় ১৫ লাখ। আয়তন প্রায় ১ হাজার ৬শ বর্গমাইল।
ধর্মীয় দিক দিয়ে জেলায় মোট জনসংখ্যার শতকরা ৭৫ ভাগ মুসলমান, হিন্দু শতকরা ২৪ ভাগ এবং খ্রীষ্টান, আদিবাসী ও অন্যান্য জনসংখ্যা মোট জনসংখ্যার শতকরা ১ ভাগ। মুসলমানের সংখ্যার আধিক্য থাকলেও এখানে অন্য ধর্মাবলম্বীদের সাথে সহাবস্থান রয়েছে। জেলায় সাঁওতাল, ওরাও-সহ বেশকিছু আদিবাসী রয়েছে। জেলায় শিক্ষিতের হার মোট জনসংখ্যার শতকরা ৭৩ ভাগ। জেলায় ঠাকুরগাঁওয়ের স্থানীয় বাসিন্দার পাশাপাশি বিভিন্ন জেলার বিশেষ করে, রংপুরের নদী ভাঙন এলাকার, ময়মনসিংহ জেলাসহ মালদহ এলাকার বাসিন্দা রয়েছে।
জেলায় আবাদি জমির পরিমাণ ১ লাখ ৪২ হাজার ৩শ৩০ হেক্টর। ঠাকুরগাঁও মূলতঃ কৃষিনির্ভর এলাকা। শতকরা ৯৫ জন মানুষই কৃষির ওপর নির্ভরশীল। এলাকায় ভারী শিল্পের তেমন বিস্তার না থাকলেও জেলা সদরে রয়েছে একটি চিনিকল এবং একটি রেশম কারখানা। রেশম কারখানাটি বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ, রানিশংকৈল, হরিপুর ও বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা ভারতীয় সীমানা সংলগ্ন। এ কারণে সীমান্ত এলাকার লোকজন ভারতের সাথে বিভিন্ন ব্যবসা বাণিজ্যে লিপ্ত।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ঃ বর্তমানে ঠাকুরগাঁওয়ের ৩টি সংসদীয় আসনের ঠাকুরগাঁও-০১, ঠাকুরগাঁও-০২ আওয়ামী লীগের এবং ঠাকুরগাঁও-০৩ আসনটি জাতীয় পার্টির দখলে রয়েছে। ২০০১ সালের নির্বাচনে আঃ লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টিও দখলে একটি করে আসন ছিল। ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের সংসদীয় নির্বাচনে ৩ টি আসনের সব কটি আসনেই আওয়ামী লীগের দখলে ছিল। ২০০৮ সালের নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-০২ আসনে মাত্র কয়েকশত ভোটের ব্যবধানে আওয়াম লীগের কাছে পরাজিত হয় জামায়াত। ঠাকুরগাঁও জেলার ৫টি উপজেলায় জোটবদ্ধ ছাড়া এককভাবে ৪ টি রাজনৈতিক দল আঃ লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও জামায়াত বেশ সক্রিয় এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। হালনাগাদ ভোটার অনুযায়ী ঠাকুরগাঁও-০১ আসনে ভোটারের সংখ্যা মোট ৩ লাখ ৭০ হাজার, ঠাকুরগাঁও-০২ আসনে ২লাখ ১৫ হাজার, ঠাকুরগাঁও-০৩ আসনে ২লাখ ৯০ হাজার।
ঠাকুরগাঁওয়ের ৫টি উপজেলার মধ্যে বালিয়াডাঙ্গী, রানিশংকৈল, হরিপুর ও পীরগঞ্জ এলাকা ভারতীয় সীমান্তঘেঁষা। প্রায় ১ হাজার ৬শ বর্গমাইলের ঠাকুরগাঁও জেলায় মোট জনসংখ্যা প্রায় ১৫ লাখ। ঠাকুরগাঁও-০১ আসনের আওয়ামী লীগের সাংসদ রমেশ চন্দ সেন সরকারের পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্বে রয়েছেন। অপরদিকে একই আসনে ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি থেকে জয়ী সাংসদ মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সে সময় সরকারের কৃষি প্রতিমন্ত্রী পরে বেসামরিক বিমান ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকেন। বর্তমানে তিনি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্বে রয়েছেন।
প্রতিশ্রুতি ঃ
আওয়ামী লীগ, বিএনপি এবং জাতীয় পার্টির দখলে ৩ টি আসনে ক্রমান্বয়ে নির্বাচিত আসনগুলোতে ভোটের আগে রাস্তাঘাট উন্নয়ন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান উন্নয়ন, ব্রীজ কালভার্ট নির্মাণ, ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসার, সরকারি-বেসরকারি চাকরিতে বেকার শিক্ষিতদের নিয়োগ, বিমান বন্দর চালু, রেল সেবার আধুনিকীকরণ ইত্যাদি প্রতিশ্রুতি দিলেও নির্বাচনের পরে নির্বাচিত সাংসদরা দলীয় রাজনৈতিক চক্রে আবির্ভূত হন। তারা দলীয়করণ এবং নিজস্ব আয় রোজকার নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। আওয়ামী লীগ-বিএনপি দু-মন্ত্রী এবং প্রতিমন্ত্রী বিমান বন্দর চালুকরণ এবং রেলওয়ের আধুনিকীকরণ এবং স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নের কথা বললেও তারা প্রতিশ্রুতি পূরণ করেননি।
দলীয় কোন্দল ঃ
ঠাকুরগাঁও-০১ আসনে ঃ আওয়ামী লীগের আভ্যন্তরিক কোন্দল প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। এ ছাড়াও মহাজোটের জাতীয় পার্টির সাথে কোন্দলে একেবারে অমীমাংসিত অবস্থায় গিয়ে পৌঁছেছে। এক্ষেত্রে বিএনপি ও জামায়াত রয়েছে দলীয় কোন্দলের ঊর্ধ্বে।
জেলা জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা চেয়ারম্যান সুলতানুল ফেরদৌস নম্র চৌধুরীর বাড়ি দখল করার ঘটনায় জাতীয় পার্টির সাথে বিরোধের শুরু হয়। তারপর থেকে জোটবদ্ধ হওয়ার পরেও জাতীয় পার্টির সাথে এখানে বিরোধ তুঙ্গে। জাতীয় পার্টি নেতাদের মতে সারাদেশে জাতীয় পার্টির সাথে আওয়ামী লীগ পুনরায় জোটবদ্ধভাবে নির্বাচন করলেও ঠাকুরগাঁওয়ে বিরোধ মীমাংসার কোন সুযোগ নাই। তাছাড়াও টেন্ডারবাজি, আইলা নিয়ে দুর্নীতি, নদী খনন নিয়ে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে। অপরদিকে আওয়ামী লীগ নেতারাও বিগত আমলের বিএনপির দুর্নীতি বিশেষ করে ঠাকুরগাঁও বিমান বন্দর চালুর নামে কয়েকশত কোটি টাকার দুর্নীতি, বরেন্দ প্রকল্পের দুর্নীতি নিয়ে কথা বলেন।
ঠাকুরগাঁও-০২ ঃ আওয়ামী লীগের আভ্যন্তরীণ কোন্দল ও একাধিক গ্রুপ থাকায় দলীয় বিশৃঙ্খল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এ কারণে জাতীয় পার্টিতেও ভাঙন ধরেছে। এরই সুযোগে বিএনপি-জামায়াত দলীয় কোন্দলের ঊর্ধ্বে থেকে দল গোছানোর কাজে লিপ্ত রয়েছে। তবে বিএনপি এ আসন থেকে মনোনয়ন পেলে জামায়াত হয়তো দলীয় কন্দোলে লিপ্ত হয়ে পড়বে।
ঠাকুরগাঁও-০৩ ঃ আওয়ামী লীগের দলীয় আভ্যন্তরীণ কোন্দল ও একাধিক গ্রুপ এ বিভক্ত হয়ে পড়েছে। মহাজোটের জাতীয় পার্টির সাথে আওয়ামী লীগের বিরোধপূর্ণ অবস্থান তৈরি হয়েছে। জাতীয় পার্টির বর্তমান ও আওয়ামী লীগের কর্মকান্ডে ক্ষুব্ধতার সুযোগ নিয়েছে বিএনপি-জামায়াত। একেবারে তৃতীয় অবস্থানে থাকা বিএনপি-জামায়াত দলীয় কোন্দল এড়িয়ে চলছে।
