শিক্ষার আলো, শিক্ষিত নারী তাদের জন্য হুমকি

আপডেট : ১৪ জুলাই ২০১৩, ১৯:৫৯
গত ১২ জুন জাতিসংঘে ভাষণ দিয়েছেন মালালা ইউসুফজাই। এইদিন ছিল মালালার ষোলতম জন্মদিন। এই কিশোরী তার ভাষণে শিক্ষা এবং নারীদের সমঅধিকারের বিষয়ে কথা বলেন। তার এ ভাষণের উল্লেখযোগ্য অংশ নিয়ে আমাদের এই আয়োজন— আজ জাতিসংঘ আমাকে এখানে আমন্ত্রণ জানানোয় নিজেকে খুব সৌভাগ্যবান মনে হচ্ছে। আমার জীবন ফিরে পাওয়ার জন্য যারা অবদান রেখেছেন এবং দোয়া করেছেন আমার জন্য তাদের সকলকে আবারও ধন্যবাদ। প্রিয় ভাই-বোনেরা, আপনারা একটা কথা মনে রাখবেন-‘মালালা দিবস’ আমার ব্যক্তিগত কোনো বিষয় না। এটা সারাবিশ্বের যে নারী, শিশু, কিশোর তাদের অধিকার আদায়ের জন্য উচ্চকণ্ঠ হয়েছে তাদের জন্য। শ’ শ’ মানবাধিকার কর্মী রয়েছেন যারা শুধু মানবাধিকারই না শান্তি, শিক্ষা, সমঅধিকারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য অর্জন করতে পারছেন না। সন্ত্রাসীরা হাজার হাজার মানুষকে হত্যা এবং লাখ লাখ মানুষকে আঘাত করেছে। আমি তাদেরই একজন। আমি আজ এখানে নিজের কথা বলতে আসিনি। আমি তাদের কথা বলছি যাদের কণ্ঠ না শুনেও কথা বোঝা যায়, যারা নিজেদের শিক্ষা, শান্তি ইত্যাদি অধিকার আদায়ের জন্য যুদ্ধ করেছে। ২০১২ সালের ৯ অক্টোবরে তালেবানরা আমার মাথায় সামনের দিকে বামপাশে গুলি করে। তারা আমার বন্ধুদেরকে গুলি করে। তারা মনে করেছিল তাদের বুলেট আমাদেরকে থামিয়ে দেবে। তারা মনে করেছিল আমরা আমাদের অধিকার আদায়ের দাবি থেকে সরে আসবো। কিন্তু তারা ব্যর্থ। হাজার হাজার নিশ্চুপ কণ্ঠ আজ উচ্চকিত হচ্ছে। দুর্বলতা, ভয় এবং নিরাশার বদলে ওই ঘটনা আমার জীবনে শক্তি, সামর্থ্য এবং আত্মবিশ্বাসের জন্ম দিয়েছে। এছাড়া আমি যে মালালা ছিলাম, আমার যে লক্ষ্যগুলো ছিল সেগুলোই রয়েছে। এবং আমার স্বপ্নগুলোও একই আছে। আমি কারো বিরুদ্ধে নই। আমি এখানে তালেবান বা অন্য কারো বিরুদ্ধে কথা বলার জন্য এখানে আসিনি। আমি এখানে এসেছি পৃথিবীর সকল শিশুর শিক্ষার অধিকার আদায়ের দাবি জানাতে। আমি চাই তালেবানসহ সকল মৌলবাদী সংগঠন সদস্যদের সন্তানেরাও শিক্ষা গ্রহণ করুক। আমি জানি না তালেবানদের কোন্ ব্যক্তি আমাকে গুলি করেছিল। আর আমি যদি তা জানতে পারি এবং তাকে আমার সামনে দাঁড় করিয়ে আমার হাতে একটি বন্দুক ধরিয়ে দেয়া হয় আমি তাকে গুলি করবো না। এই শিক্ষা আমি পেয়েছি আমার মা-বাবা এবং মহান মানুষদের জীবনী থেকে। আমার হূদয় আমাকে সবসময় বলে শান্তিপূর্ণ হতে এবং মানুষকে ভালোবাসতে। আমরা আজ চুপ থাকা এবং অধিকারের দাবি নিয়ে সোচ্চার হওয়ার মধ্যে সমাজে যে পরিবর্তন আসে সে সম্পর্কে অবহিত। আমরা পাকিস্তানের সোয়াতের বাসিন্দারা বইয়ের গুরুত্ব এবং এবং অস্ত্রের ভয়াবহতা সম্পর্কে সজাগ হয়েছি। বলা হয়— অস্ত্রের থেকে কলমের শক্তি বেশি। মৌলবাদীরা শিক্ষার আলো থেকে সবসময় দূরে থেকেছে। শিক্ষার আলো, শিক্ষিত নারী তাদের জন্য হুমকি। এজন্যই তারা এই হামলাগুলো চালিয়ে আসছে। আমরা সমাজে যে পরিবর্তন আনতে চাই তাতে তারা ভীত। আমার স্কুলে সাংবাদিকরা এক বালককে জিজ্ঞাসা করেছিল— তালেবানরা কেন স্কুল বন্ধ করতে চায়! জবাবে সে তার হাতের বইয়ের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলেছিল— তারা জানে না এই বইয়ের মধ্যে কী লেখা আছে। তারা মনে করে নারীরা স্কুলে গেলে জাহান্নামী হবে। সন্ত্রাসীরা নিজেদের স্বার্থে ইসলামের নাম খারাপ করে এই অপকর্মগুলো চালাচ্ছে। আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ শিক্ষিত হতে চায়। আর ইসলাম মানুষকে শিক্ষা অর্জনের জন্য বলেছে, নারীদের শিক্ষাগ্রহণ নিষিদ্ধ করা হয়নি ইসলামে। শিক্ষার জন্য শান্তি অবশ্যম্ভাবী। বিশেষ করে পাকিস্তান এবং আফগানিস্তানের শিশুরা যুদ্ধের জন্য স্কুলে যেতে পারছে না। আমরা এই যুদ্ধে বিরক্ত। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে নারী এবং শিশুরা বিভিন্নভাবে বঞ্চনার শিকার হচ্ছে। ভারতের শিশুরা শিশুশ্রমের শিকার। নাইজেরিয়ার বহু স্কুল ধ্বংস করা হয়েছে। ন্যায়বিচারের অভাব, শিক্ষাহীনতা এবং অশান্তি নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই হুমকি। আমি আজকে নারীদের শিক্ষার উপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। কারণ এই সমস্যাগুলোতে নারীরাই বেশি ভুগছে। একটা সময় ছিল যখন নারীরা তাদের অধিকার আদায়ের জন্য পুরুষকর্মীদের দ্বারস্থ হতো। কিন্তু এখন অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। আমরা নিজেদের অধিকার নিজেরা আদায় করবো। প্রিয় ভাইবোনেরা, এটাই সময় আমাদের উচ্চকণ্ঠ হওয়ার। বিশ্ব নেতৃবৃন্দের জন্য এটাই সময় যুদ্ধ-বিগ্রহ পরিহার করে শান্তির পথে অগ্রসর হওয়ার। নারী এবং শিশুদের অধিকার আদায়ের জন্য উপযুক্ত নীতিমালা গ্রহণের আহ্বান জানাচ্ছি বিশ্ব নেতৃবৃন্দের কাছে। সারা বিশ্বের সকল সরকারের কাছে আমার আবেদন-সকল শিশুর শিক্ষা বাধ্যতামূলক এবং অবৈতনিক করা হোক। নারীদের শিক্ষা গ্রহণে বাধা হতে পারে এমন কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা যাবে না। আমাদের মনে রাখতে হবে আমাদের অর্ধেক বিকলাঙ্গ রেখে উন্নয়ন করতে পারবো না। নারীদের নিজেদের অন্তর্নিহিত শক্তি এবং সক্ষমতাকে উপলব্ধি করার জন্য আমি নারীদেরকে আরো সাহসী এবং বলিষ্ঠ হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি। শিক্ষা গ্রহণের এবং শিক্ষা বিস্তারের যে লক্ষ্যে আমরা অগ্রসর হচ্ছি তা বাস্তবায়ন করবো। কেউ আমাদেরকে বিরত রাখতে পারবে না। সাংবাদিকরা এক বালককে জিজ্ঞাসা করেছিল, তালেবানরা কেন স্কুল বন্ধ করতে চায়! জবাবে সে তার হাতের বইয়ের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলেছিল— তারা জানে না এই বইয়ের মধ্যে কী লেখা আছে। তারা মনে করে নারীরা স্কুলে গেলে জাহান্নামী হবে