মিসরে আবার মুসলিম ব্রাদারহুড!

আপডেট : ১৪ জুলাই ২০১৩, ২০:৩২
মিসরে দু’টি ড্রাগ আছে। একজন আহমেদ শফি যে আপনাকে হত্যা করে এবং অন্যজন মোহাম্মদ মুরসি যে আপনার পাকস্থলিতে ব্যথা সৃষ্টি করেছে। তাই আমরা মুরসিকে ভোট দেব। কারণ সে অন্তত হত্যা করে না। তাকে চার বছর সময় দেব। দেশ চালাতে ব্যর্থ হলে আমরা আবার তাহরির স্কয়ারে ফিরে যাবো এবং তার পতন ঘটাবো। ২০১১ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি দীর্ঘ ৩০ বছরের প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারকের পতনের পর সেনাবাহিনী ক্ষমতায় আসে। তারা নির্বাচন দেয়। ওই নির্বাচনের ভোট দেয়ার আগে আবদেল হাদি নামের এক নাগরিক এই মত ব্যক্ত করেন। আর হাদির মতো নাগরিকরা একবছর পর মুরসির ব্যর্থতাকে মানতে পারেননি। দেশটির সেনাবাহিনী এখন ক্ষমতার কলকাঠি নাড়ছেন। সাধারণ নাগরিকরা সেনাবাহিনীকে স্বাগত জানিয়েছে। সেনাবাহিনী এবং জনগণের একটি অংশ চাইছে মিসরকে একটি উদার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত করতে। তবে সেটা কতটুকু সম্ভব হবে তা নির্ভর করছে মিসরের জনগণ ও আন্তর্জাতিক বিশ্বের গতি-প্রকৃতি বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের ওপর। গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত মিসরের প্রেসিডেন্ট মুরসিকে সেনাবাহিনী ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়ার পর রাজপথে অবস্থান নিয়েছে মুরসির সমর্থক ও বিরোধীরা। দু’পক্ষের সংঘাতে গত কয়েকদিনে নিহত হয়েছে কমপক্ষে ৮০ জন। এ অবস্থায় মিসর কোন পথে এগোচ্ছে তা নিয়ে চলছে বিচার-বিশ্লেষণ। মুরসি মোটেও জনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট ছিলেন না। রাজনৈতিক ক্যারিশমাও ছিল না তার। দেশের অন্যতম সমস্যা দারিদ্র্য এবং বেকারত্বের সমাধানে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। দীর্ঘ তিন দশকের স্বৈরশাসনের পর মিসরে গণতন্ত্র আসার পর মানুষের প্রত্যাশা অনেক বাড়িয়ে দিয়েছিলেন মুরসি। কোনো প্রেসিডেন্টের পক্ষে এ প্রত্যাশা পূরণ সম্ভব নয়। তবে মুসলিম ব্রাদারহুড নেতা মুরসি ওই প্রত্যাশা পূরণে চেষ্টা করতে পারতেন। মিসরের ক্ষমতায় আবার মুরসির দল মুসলিম ব্রাদারহুড ক্ষমতায় ফিরবে কিনা তা নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এ অবস্থায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো নতুন করে নির্বাচন হলে মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রার্থীই আবার বিজয়ী হবে কিনা। মুসলিম ব্রাদারহুডই দেশের সবচেয়ে সংগঠিত শক্তি। এখন তাদের সঙ্গে করা অন্তর্বর্তী সরকারের আচরণে সাধারণ মানুষ ক্ষুব্ধ হতে পারে এবং ব্রাদারহুড লাভবান হতে পারে। সাধারণ মানুষের এ ক্ষোভ আবার তাদের ক্ষমতায় নিয়ে আসতে পারে। তবে সেনাবাহিনী সেই নির্বাচনের ফলাফল মেনে নেবে কিনা তার ওপর এটি নির্ভর করছে। শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্র মুরসিকে মুক্তি দিতে দেশটির সেনাবাহিনী ও অন্তর্বর্তী নেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। মিসরের সার্বিক পরিস্থিতিতে দেশটিতে মার্কিন সহায়তা পর্যালোচনা করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। যুক্তরাষ্ট্র মনে করছে, মিসরে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে দেশটির সেনাবাহিনীকে বাধ্য করতে আর্থিক সহায়তা বন্ধের হুঁশিয়ারি ফলপ্রসূ হবে। ১৯৮৫ সালের একটি মার্কিন আইনে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, সেনাবাহিনীর হাতে কোনো দেশের বৈধ নির্বাচিত সরকার উত্খাত হলে দেশটিতে মার্কিন সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা অবশ্যই স্থগিত করা হবে। ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট অব নিয়ার ইস্ট পলিসির পরিচালক রবার্ট স্যাটলফ বলেন, ওবামা প্রশাসন যত শিগগির সম্ভব মিসরে বেসামরিক নির্বাচিত কর্তৃপক্ষের হাতে ক্ষমতা দেখতে চায়। বিশ্লেষকদের মতে, মিসরের সামরিক অভ্যুত্থানকে ক্যু হিসেবে আখ্যায়িত না করে মার্কিন প্রশাসন হয়তো মিসরীয় জেনারেলদের খাটো করতে চাইছেন না। ওবামা প্রশাসনের প্রত্যাশা, ২০১১ সালে হোসনি মোবারকের পতনের পর যুক্তরাষ্ট্র যে পদক্ষেপ নিয়েছিল, সেভাবেই ওয়াশিংটন দেশটিকে আবারও গণতন্ত্রের পথে এগিয়ে নিতে পারবে। মিসর নিয়ে মার্কিন আইনের এক বিশেষ ধারায় বলা হয়েছে, বেসামরিক সরকার ব্যবস্থায় উত্তরণে সরকারকে অবশ্যই সহায়তা করতে হবে। এই ধারায় মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তাগত স্বার্থে শর্ত স্থগিত রেখে মিসরকে সহায়তা অনুমোদনের ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। ঘনিষ্ঠ আরব মিত্র এবং প্রভাবশালী আঞ্চলিক শক্তি মিসরকে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিবছর প্রায় ১৫০ কোটি ডলার সহায়তা দেয়। এর প্রায় ১৩০ কোটি ডলারই সামরিক সহায়তা। মিসরীয় সেনাবাহিনীর বার্ষিক উপকরণ ও সরঞ্জাম ব্যয়ের ৮০ শতাংশই জোগান দিয়ে থাকে যুক্তরাষ্ট্র। রবার্ট স্যাটলফ বলেন, মার্কিন প্রশাসন এখন চাইলে মিসরকে উপকরণ সরবরাহ করা বন্ধ রাখতে পারে। তবে এরই মধ্যে এসব উপকরণ বাবদ অর্থ বরাদ্দ এবং এর অনেকটাই খরচও হয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র সেনাবাহিনীর ক্ষমতায় আসাকে অভ্যুত্থান হিসেবে আখ্যা দেননি। ইসরাইলও সমর্থন দিচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকারকে। ইসরাইল যুক্তরাষ্ট্রকে মিসরে আর্থিক সহায়তা বন্ধ না করার আহবান জানিয়েছে। বিরোধীদের বিক্ষোভের মুখে সেনাবাহিনী গত ১ জুলাই দেশের অচলাবস্থা নিরসনে মুরসিকে ৪৮ ঘণ্টা সময় বেঁধে দেয়। তখন মুরসি বিরোধী বিক্ষুব্ধরা এটাকে স্বাগত জানিয়েছিল। পুলিশ, চার্চ এবং বিচার বিভাগও সেনাবাহিনীর ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছিল। ব্রাদারহুড এবং তাদের অনুসারী কয়েকটি দল বাদে সবাই খুশি হয়েছিল। ব্রাদারহুড রাজনৈতিক সমাধানের চেয়ে তাদের অনুসারীদের বিরোধীদের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণার জন্য প্রস্তুতি নিতে বলেছিল। তখন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা অনেকেই মনে করেছিলেন, অভ্যুত্থান আসন্ন। ঠিকই তখন মুরসি ক্ষমতাচ্যুত হন। সেনাবাহিনী হয়তো মিসরে উদারনৈতিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কথা চিন্তা করছে। সেনাবাহিনী জনগণকে রক্ষার জন্য রক্তপাতহীন ‘অভ্যুত্থান’ করেছে। গত মার্চে ইবনে খালেদুন সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট জনগণের মধ্যে একটি জরিপ চালায়। তারা জানতে চায়, সেনাবাহিনী আবার ফিরে আসলে সমর্থন দিবে কিনা। শতকরা ৮২ ভাগ সমর্থন দেয় সেনবাহিনীকে। তাদের অধিকাংশেরই বয়স ৩৫ বছরের নিচে। অথচ এদের অনেকে কয়েক মাস আগে সেনাবাহিনীর বিরোধিতা করেছিল। মিসরের জনগণ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের চেয়ে সেনাবাহিনীকে বেশি বিশ্বাস করে। তার কারণ মিসরে ঐতিহাসিকভাবে সেনাবাহিনী প্রভাবশালী। কারণ সেনাবাহিনী মিসরের অন্যতম একটি গঠন কাঠামো। তারা মিসর ছাড়া অন্য কারো প্রতি অনুগত নয়। সেনাবাহিনীর মধ্যে পেশাদারিত্ব আছে। তাই সিদ্ধান্ত গ্রহণে তারা স্বাধীনতা পায়। সেনাবাহিনীর স্বার্থ কোনো সরকারের ওপর নির্ভরশীল নয়। আর এজন্যই ২০১১ সালে জনগণের পক্ষে এবং মোবারকের বিরুদ্ধে যেতে পেরেছিল সেনাবাহিনী। সেনাবাহিনী বলে, তারা কখনো রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে চায় না কিংবা শাসন করতে চায় না। জনগণ বিশ্বাস করে যে সেনাবাহিনী স্বাধীন এবং নিরপেক্ষ। সেনাবাহিনী এবং জনগণ উভয়ই জানে, সেনাবাহিনী কখনো ভাল রাজনীতিবিদ হতে পারে না। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রেসিডেন্ট আদলি মানসুর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে হাজেম আল-বেবলাউয়ি ও ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে জাতিসংঘের আণবিক শক্তি সংস্থার সাবেক প্রধান এলবারাদিকে নিয়োগ দিয়েছেন। আগামী সপ্তাহের শেষনাগাদ অন্তর্বর্তীকালীন মন্ত্রিসভা শপথ নিতে পারে। মন্ত্রিসভায় উদারপন্থীদের পাশাপাশি মুসলিম ব্রাদারহুডের নেতারাও থাকতে পারেন বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তবে সরকারে অংশগ্রহণের বিষয়টি নাকচ করেছে ব্রাদারহুড। সংবিধান সংশোধন ও নির্বাচনের রূপরেখা ঘোষণা করা হয়েছে। জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্য সংস্থা (এফএও) মিসরে সহিংসতা এবং বিদেশি মুদ্রার মজুদের পরিমাণ সংকটজনক পর্যায়ে থাকার কারণে দেশটির খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছে।