২০১১ সালের ২ মে। ভোর হবার আগেই পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় এলাকা অ্যাবোটাবাদের এক বাড়িতে শুরু হয় মার্কিন অভিযান। ঘরে ঢুকে আল-কায়েদার শীর্ষ নেতা ও আমেরিকার সন্ত্রাসী তালিকায় মোস্ট ওয়ান্টেড ওসামা বিন লাদেনকে গুলি করে হত্যা করে মার্কিন নেভি সিল বাহিনীর দুর্ধর্ষ সদস্যরা। সে সময় ইসলামাবাদকে না জানিয়ে এমন অভিযানের তীব্র সমালোচনা করেছিলো পাকিস্তান। দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েনও শুরু হয় এরপর থেকে। অথচ এর আগে পাকিস্তানের কোথাও লাদেন লুকিয়ে আছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এমন সন্দেহ ও অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছিলো পাকিস্তান। সেই কাহিনী সবার জানা। ঐ ঘটনা তদন্তে তাত্ক্ষণিকভাবে একটি স্বাধীন কমিশন গঠন করে পাকিস্তানের পার্লামেন্ট। ‘অ্যাবোটাবাদ কমিশন’ নামের ঐ তদন্ত কমিটি সাড়ে ছয় মাসে যে প্রতিবেদন তৈরি করে তা অবশ্য কাউকেই জানতে দেয়া হয়নি। সম্প্রতি ঐ প্রতিবেদনের তথ্য ফাঁস হয়েছে বলে দাবি করেছে আল-জাজিরা। এই রিপোর্ট কীভাবে ফাঁস হলো তা বের করতে পাকিস্তান একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করেছে।
অ্যাবোটাবাদ কমিশনের কাজ ছিলো লাদেনকে সনাক্ত করতে ইসলামাবাদ প্রশাসনের ব্যর্থতার কারণ খতিয়ে দেখা। ব্যর্থতার জন্য সেনা, নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের অযোগ্যতা দায়ী, না-কি এর সাথে আল-কায়েদার প্রতি সমর্থন-সহযোগিতা সম্পর্কিত, তা তদন্ত করা। একই সাথে পাকিস্তানের মাটিতে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা- সিআইএর কার্যক্রম সনাক্ত করতে পাকিস্তানী গোয়েন্দাদের ব্যর্থতার কারণ বের করাও ছিলো কমিশনের মূল উদ্দেশ্য। তবে আল-জাজিরার ভাষ্য অনুসারে মার্কিন নেভি সিলের অভিযান ও এ ব্যাপারে ইসলামাবাদের মনোভাব এবং লাদেনের দৈনন্দিন জীবন-কাহিনীর অনেক খুঁটিনাটি তথ্যও বেরিয়ে এসেছে প্রতিবেদনে।
অ্যাবোটাবাদে যুক্তরাষ্ট্রের ঐ দুর্ধর্ষ অভিযানকে ‘যুদ্ধের শামিল’ বলে উল্লেখ করেছে পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদ কমিশন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঐ অভিযানের মাধ্যমে পাকিস্তানের জনগণের প্রতি চরম অবহেলা প্রদর্শন করা হয়েছে, যা ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তান ভাগ হবার পর প্রথম। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার নির্দেশে এমন অভিযান ‘ক্রিমিনাল অ্যাক্ট অব মার্ডার’। তবে অভিযানটি এড়ানো সম্ভব ছিলো। অভিযান পরিচালনাকারী মার্কিন হেলিকপ্টারকে ভূপাতিত করতে পাকিস্তানী জঙ্গি বিমান রওনা হলেও ততক্ষণে বড্ড দেরি হয়ে গিয়েছিলো বলে জানিয়েছে অ্যাবোটাবাদ কমিশন। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, পাকিস্তানের নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের অযোগ্যতা ও অবহেলার কারণেই ওসামা বিন লাদেন প্রায় এক দশক আগে পাকিস্তানের ভেতরে ঢুকতে পেরেছেন। প্রায় ছয় বছর ধরেই তিনি বসবাস করছিলেন অ্যাবোটাবাদের ঐ বাড়িতেই। অথচ তাকে কোনভাবেই সনাক্ত করা যায়নি।
আল-কায়েদা নেতা ২০০১ সালে আফগানিস্তান থেকে পাকিস্তানে ঢুকে কীভাবে দিনের পর দিন লুকিয়ে থেকেছেন, সে সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে ঐ প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়েছে, ২০০১ সালের ডিসেম্বরে আফগানিস্তানের তোরাবোরা পাহাড়ে সম্মুখযুদ্ধে মার্কিন সৈন্যদের হাত ফসকে কোনরকম পালাতে সক্ষম হন লাদেন। এরপর ২০০২ সালের গ্রীষ্ম বা বসন্তের কোন এক সময়ে হয়তো পাকিস্তানে ঢুকে পড়েন আল-কায়েদা নেতা। তবে শুরুতে তিনি ছিলেন দক্ষিণ ওয়াজিরিস্তানে। পরে বাজুর, পেশোয়ার, সোয়াত ও হরিপুর হয়ে ২০০৫ সালে অ্যাবোটাবাদের ঐ বাড়িতে তুলনামূলক স্থায়ী আবাস গড়েন আল-কায়েদা নেতা লাদেন।
লাদেনের এক সহযোগীর স্ত্রী মরিয়ম। অ্যাবোটাবাদ কমিশন তারও সাক্ষাত্কার নেয়। মরিয়ম জানান, সোয়াত উপত্যকা এলাকায় দ্রুতবেগে গাড়ি চালানোর কারণে পুলিশ একবার তাদের থামিয়েছিলো। কিন্তু লাদেনকে তারা চিনতে ভুল করে। মরিয়ম আরো জানান, অ্যাবোটাবাদের বাড়িতে অত্যন্ত সাদামাটাভাবেই চলতো লাদেনের দৈনন্দিন জীবন। কখনোই বাড়ির বাইরে বের হতেন না বা জনসমক্ষে আসতেন না তিনি। ঘর থেকে পায়চারি করতে বের হলেও রাখালের টুপি পরতেন, যাতে কোনভাবেই কেউ তাকে চিনতে না পারে। অ্যাবোটাবাদে পাকিস্তানী সেনা ঘাঁটির খুব কাছেই লাদেনের অবস্থানকে সনাক্ত করতে না পারার এটা একটা বড় কারণ। এছাড়াও এর সাথে জড়িয়ে আছে ঐ বাড়ির অস্বাভাবিক প্রকৃতি। বিশেষ করে ঐ বাড়ির বিস্ময়কর আকার, উঁচু কাঁটাতারের দেয়াল এবং মোটরযান ও দর্শনার্থীদের তেমন আসা-যাওয়া না থাকায় ছয় বছরেরও বেশি সময় ধরে বোকা বনে ছিলো ঐ বাড়ির আশপাশের মানুষ, পুলিশ, নিরাপত্তা কর্মী ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা।
তদন্ত রিপোর্টে একই সাথে সরকার ও সেনাবাহিনীকে দোষারোপ করে তাদের কঠোর সমালোচনা করে বলা হয়েছে, গোয়েন্দা ব্যর্থতা আসলে সরকারের অতি আস্ফাালনের ফল। এক্ষেত্রে সরকারের প্রায় প্রতিটি স্তরেই শাস্তিযোগ্য অবহেলা ও অযোগ্যতার প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত কমিশন। লাদেনকে হত্যায় যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনীর ঐ অভিযানে পাকিস্তানের কারো সহযোগিতার প্রমাণ পায়নি কমিশন। তবে সরকার ও সরকারের বাইরে এর সাথে কারো পরোক্ষ সংশ্লিষ্টতার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়নি। সবচেয়ে রূঢ় ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে নেভি সিল অভিযানের সমালোচনায়। অ্যাবোটাবাদের বাড়িতে লাদেনসহ অন্তত ২৫ জন বাস করতো। এদের মধ্যে আল-কায়েদা নেতার তিন স্ত্রীসহ অনেকেরই সাক্ষাত্কার নেয় তদন্ত কমিশন। সব মিলিয়ে ৩৩৬ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে দুই শতাধিক প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষাত্কার নেয়া হয়। এর মধ্যে মন্ত্রী, তত্কালীন গোয়েন্দা প্রধান, সেনাবাহিনী ও কিছু বেসামরিক কর্মকর্তাও আছেন। প্রতিবেদনের তথ্য ফাঁসের কথা অস্বীকার করেছেন অ্যাবোটাবাদ কমিশনের প্রধান জাভেদ ইকবাল। তিনি বলেন, ধারণার উপর ভিত্তি করে তথ্য ফাঁসের কথা বলা হচ্ছে। জাভেদ জানান, ঐ প্রতিবেদনে শতাধিক সুপারিশ সংযুক্ত করা হয়েছিলো। তার একটিও ফাঁস হওয়া প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই।
