ইউরোপে বাড়ছে বেকারত্ব কমেছে জনসংখ্যা

আপডেট : ১৪ জুলাই ২০১৩, ২০:৩৪
সন্তানের কারণে পারিবারিক বন্ধন পূর্ণতা পায়। কিন্তু সবসময় এ বিবেচনায় সন্তান গ্রহণ করা হয় তা কিন্তু নয়। পারিপার্শ্বিক বিভিন্ন দিক বিবেচনায় সন্তান গ্রহণের প্রভাব দেখা যায় বিশ্বের অনেক উন্নত দেশে। যেমন ইউরোপের দেশগুলোতে। আর্থিক সঙ্গতি নির্ধারণ করে দিচ্ছে সন্তান গ্রহণের বিষয়টি। সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে, বেকারত্ব বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ইউরোপের দেশগুলোতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির ঊর্ধ্বমুখী হার থমকে গেছে। অনেক দেশে বৃদ্ধির হার কমেছে। গত এক দশকে ইউরোপে অর্থনৈতিক সংকট জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারের উপর বিশাল চাপ সৃষ্টি করেছে। বলা হয়, আর্থিক সংকট ছিল না এমন সময়ে নারীদের সন্তান গ্রহণের সংখ্যা বেশি ছিলো। সংকট শুরুর পর থেকে তা কমেছে। সম্প্রতি জার্মানির রসটকভিত্তিক ম্যাক্স প্লানক ইনস্টিটিউট ফর ডেমোগ্রাফিক রিসার্চের (এমপিআইডিআর) এক গবেষণায় এ তথ্য বেরিয়ে এসেছে। এমপিআইডিআরের জনসংখ্যাতাত্ত্বিক মিশেলা ক্রিয়েনফেল্ড, জসুয়া গোল্ডস্টেইন এবং এইভা জ্যাসিলিওনি সম্প্রতি তাদের এ গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করেন। গবেষণায় দেখা যায়, সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে তরুণ ও বয়স্কদের মধ্যে। বেকারত্ব বৃদ্ধির কারণে ইউরোপীয়দের মধ্যে যাদের বয়স ২৫ এর কম তারা সন্তান গ্রহণ থেকে বিরত থাকছেন। এছাড়া গত এক দশকে ইউরোপীয়দের মধ্যে পরিবার গঠনেরও ঝোঁকও কমে গেছে। গবেষণাপত্রে বলা হয়, বেকারত্ব বৃদ্ধির কারণে ইউরোপের ২৮টি দেশে সব বয়সীদের মধ্যে সন্তান গ্রহণের প্রবণতা কমেছে। তাদের মধ্যে তরুণরাই ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। বেকারত্বের হার এক শতাংশ বাড়লে ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সীদের সন্তান গ্রহণের হার কমেছে শূন্য দশমিক ২ শতাংশ। আর ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের মধ্যে কমেছে শূন্য দশমিক ১ শতাংশ হারে। বর্তমান আর্থিক অবস্থায় তাদের সন্তান কম বা না থাকাটা সকলের জানার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এমপিআইডিআরের জনসংখ্যাবিদ মিশেলা ক্রিয়েনফেল্ড বলেন, বেকারত্বের কারণে সন্তান গ্রহণের সংখ্যা কম হওয়ার বিষয়টি যত সহজে তরুণদের মাধ্যমে বিচার করা যায়, বয়স্কদের মাধ্যমে সেটা সম্ভব হয় না। কারণ যেসব ব্যক্তি ৪০ বছরের পরে গিয়ে সন্তান নেন তাদের ক্ষেত্রে বেকারত্বের বিষয়টি খুব কমই প্রভাব বিস্তার করে। গবেষণায় এমপিআইডিআরের বড় প্রশ্ন ছিলো অর্থনৈতিক অবস্থা সন্তান জন্মদানের ক্ষেত্রে কীভাবে প্রভাব বিস্তার করছে। আর তারা গবেষণার মাধ্যমে এ প্রশ্নের জবাব খুঁজে পেয়েছেন। তবে এক্ষেত্রে আরো কিছু বিষয়ও যুক্ত থাকে যেমন পারিবারিক কর্মপন্থা, চাকরির নিশ্চয়তা। গবেষণায় বলা হয়, ইউরোপের সব অংশে যে দৃশ্যপট একই রকম তা কিন্তু নয়। বরং দক্ষিণ ইউরোপে বেকারত্বের প্রভাবে সন্তান গ্রহণের হার কম। মূলত অস্থিতিশীল চাকরি পরিস্থিতির কারণে এটা হচ্ছে। আসলে ২০০৮ সালের পর থেকেই বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক মন্দা শুরু হয়। বন্ধ হয়ে যায় শত শত আর্থিক ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। বেকার হয় লাখ লাখ কর্মজীবী মানুষ। ঐ সময়ে আর্থিক মন্দার কারণে আক্রান্ত হয় ইউরোপও। কিন্তু দেখার বিষয় হলো তখন ইউরোপের অনেক দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ঊর্ধ্বমুখী ছিলো। এমপিআইডিআরের আগের একটি গবেষণায় দেখা যায়, ইউরোপে নিম্ন জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারের প্রবণতা শেষ হচ্ছে। কিন্তু গবেষণার ঠিক পর থেকে আর্থিক অস্থিরতার কারণে আবারো জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমে গেছে। ইউরোপের সব দেশেই যে এক চিত্র তা নয়। কিছু দেশে জনসংখ্যা ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা থমকে গেছে। অনেক দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমছে। স্পেন, হাঙ্গেরি, ক্রোয়েশিয়া, আয়ারল্যান্ড এবং লাটভিয়াতে স্পষ্টতই পরিবর্তন দেখা গেছে। ২০০০ সালের পর থেকে এসব দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিলো শতকরা ১ দশমিক ২৪ ভাগ। এর পর থেকে প্রতিবছর এই দেশগুলোতে জনসংখ্যার বৃদ্ধির হারে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যায়। ২০০৮ সালে তা দাঁড়ায় ১ দশমিক ৪৭ শতাংশে। কিন্তু ২০০৯ সালে অর্থনৈতিক মন্দা শুরুর পর জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমে ১ দশমিক ৪০ শতাংশ দাঁড়ায়। ২০০৮ সালে দেশগুলোতে বেকারত্বের হার ছিলো ৮ দশমিক ৩ শতাংশ। কিন্তু ২০০৯ সালে তা দাঁড়ায় ১১ দশমিক ৩ শতাংশে। স্পেনের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার এখনো কমছে। ২০১১ সালে দেশটিতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার দাঁড়ায় ১ দমমিক ৩৬ শংতাশে। আবার চেক প্রজাতন্ত্র, পোল্যান্ড, যুক্তরাজ্য এবং ইতালিতে আগেরকার জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রবণতা থমকে গেছে। তবে রাশিয়া, লুথিয়ানিয়ার মতো কয়েকটি দেশে বেকারত্বের ক্ষেত্রে তেমন কোনো প্রভাব দেখা যায়নি। এছাড়া জার্মানি, অস্ট্রিয়া এবং সুইজারল্যান্ডের মতো দেশে তাত্পর্যপূর্ণ তেমন কোন ফল পাওয়া যায়নি। কারণ এসব দেশে বেকারত্বের হার অনেক ক্ষেত্রে বাড়েনি। গবেষণায় ২০০১ থেকে ২০১০ সালের উপাত্ত ব্যবহার করা হয়েছে। তবে কিছু দেশের ২০১১ সালের উপাত্তর ব্যবহার করা হয়েছে। যার কারণে আর্থিক সংকট যে জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে প্রভাব ফেলেছে তা দেখানো সম্ভব হয়েছে।