অব্যাহত নদী ভাঙনে বিলীন বিস্তীর্ণ জনপদ

আপডেট : ১৪ জুলাই ২০১৩, ২০:৫৬
দেশের বিভিন্ন নদীতে অব্যাহত পানি বৃদ্ধির ফলে বন্যার পাশাপাশি ব্যাপক ভাঙন দেখা দিয়েছে। এর ফলে বিলীন হচ্ছে জনপদ, ঘর-বাড়ি ও সড়কসহ বিভিন্ন স্থাপনা। হুমকির মুখে পড়েছে বেড়িবাঁধ ও ফসলি জমি। এ বিষয়ে আমাদের প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো খবর। জামালপুর জেলার সরিষাবাড়ী যমুনা নদীর তীব্র ভাঙনে তারাকান্দি-ভুয়াপুর মহাসড়ক হুমকির মুখে পড়েছে। অব্যাহত ভাঙনের ফলে গত বৃহস্পতিবার থেকে মহাসড়কে সকল প্রকার ভারি যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। এতে যমুনা সার কারখানার ১৮ জেলায় নিয়মিত সার সরবরাহ বিঘ্নিত হচ্ছে। জানা যায়, তারাকান্দি থেকে উত্তরবঙ্গে যেতে প্রায় ৬০ কি.মি. ঘুরে যেতে হচ্ছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সময় মতো কাজ না করায় তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে। কুবলিবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আক্তারুজ্জামান জানান, যমুনার অব্যাহত ভাঙনে যেকোন সময় বিদ্যালয় ভবন নদীগর্ভে বিলীন হতে পারে। এ আতঙ্কে অভিভাবকরা শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছে। মুন্সীগঞ্জ শনিবার পদ্মায় আরো ৮ সেন্টিমিটার পানি বৃদ্ধি পেয়ে মুন্সীগঞ্জের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে পদ্মা তীরের গ্রামগুলো জলমগ্ন হয়েছে। পানিবন্দী রয়েছে বহু পরিবার। স্থানীয় একটি সূত্র দাবি করেছে লৌহজংয়ের দুই শতাধিক পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। এছাড়া পানিতে তলিয়ে গেছে বসতভিটা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, অভ্যন্তরীণ সড়ক ও বাড়ির আঙিনাসহ ফসলি জমি। কুড়িগ্রাম নদ-নদীর পানি কমতে থাকায় কুড়িগ্রামের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। ফলে বন্যাদুর্গত হাজার হাজার মানুষের দুর্ভোগ কমেনি। দেখা দিয়েছে ডায়রিয়া, আমাশয়সহ পানিবাহিত বিভিন্ন রোগ। পানি হ্রাস পাওয়ায় ধরলা, ব্রহ্ম?পুত্র, তিস্তা ও দুধকুমর নদীতে ভাঙন ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। গত তিন দিনে জেলায় ১৭৫টি পরিবার ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছে। এ নিয়ে চলতি মৌসুমে কুড়িগ্রাম জেলায় ভাঙনের শিকার হয়ে গৃহহীন হয়েছে এক হাজার ২২২টি পরিবার। রবিবার বন্যার পানিতে ডুবে উলিপুর উপজেলার শুকারুর চরের আবুল কাশেমের কন্যা আলমিনা (৪) ও বেলাল হোসেনের কন্যা বিউটি বেগম (২) শিশুর মৃত্যু হয়েছে। উলিপুরের হাতিয়া ইউনিয়নের একটি বাঁধে ব্রহ্মপুত্র নদের তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে। আশংকা করা হচ্ছে যেকোন মহূর্তে বাঁধটি ভেঙে আশপাশের এলাকার কয়েক হাজার একর জমিতে বালু পড়ে অনাবাদি হয়ে পড়বে। সেইসাথে অনন্তপুর বাজারের সাথে এ ইউনিয়নের প্রায় সাড়ে ৩ হাজার পরিবার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। স্থানীয়ভাবে বালুভর্তি বস্তা ফেলে ভাঙন রোধের চেষ্টা করা হলেও পানি উন্নয়ন বোর্ড এখন পর্যন্ত কোন উদ্যোগ নেয়নি। নাগেশ্বরীতে বন্যার পানি কমার সাথে বেড়েছে বানভাসী মানুষের দুর্ভোগ। ভাঙছে নদী। ছড়াচ্ছে পানিবাহিত রোগ। গো-খাদ্যের সংকট তীব্র। বন্যা পরবর্তী ভাঙনের তীব্রতা দেখা দিয়েছে ব্রহ্মপুত্র, গঙ্গাধর, সংকোষ, দুধকুমর ও ফুলকুমরে। গত দুদিনে প্রায় অর্ধ শতাধিক বাড়িঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। নদী ভাঙনের শিকার পরিবারগুলো সরকারি বিভিন্ন উঁচু বাঁধ, রাস্তায় আশ্রয় নিয়েছে। নদী ভাঙনের কবলে নদী তীরবর্তী লোকদের দুর্ভোগের শেষ নেই। গোদাগাড়ী (রাজশাহী) গোদাগাড়ীর চরাঞ্চলে নদী ভাঙনের মুখে পড়েছে বাড়ি-ঘর, বিঘা ফসলি জমি ও ফলদ ও বনজ গাছ। স্থানীয় লোকজন জানান, উপজেলার নির্মলচর থেকে চর বয়ারমারী পর্যন্ত ৮ কিলোমিটার জুড়ে পদ্মা নদীর তীর ভাঙছে। প্রতিদিন ২ থেকে ৩ ফুট করে পদ্মা নদীর পাড় ভাঙার কারণে চর নওশেরা, ডাকরিপাড়া, আমতলা খাসমহল, চর বয়ারমারী গ্রামের শত শত বাড়িঘর, হাজার হাজার বিঘা ফসলি জমি, লাখ লাখ ফলদ-বনজ গাছ ও রাস্তা, মসজিদ, স্কুলসহ মূল্যবান স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ডাকরিপাড়া গ্রামের আব্দুস সালাম বলেন, প্রতিদিন যেভাবে নদীর পাড় ভাঙছে তাতে গ্রামের অধিকাংশ বাড়িঘর পদ্মা নদীতে বিলীন হয়ে যেতে পারে। মোরেলগঞ্জ (বাগেরহাট) উপজেলার হাজার হাজার একর জমি ও বসতবাড়ি প্রমত্তা পানগুছি নদীর ভাঙনে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। পানগুছি নদীর দুই তীরের হাজার হাজার মানুষ এখন নদী ভাঙনের কবলে পড়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। গৃহহীন হয়ে অনেক পরিবার এখন ভিটেমাটি হারিয়ে ছিন্নমূল হয়ে দিনাতিপাত করছে। এলাকাবাসী জানায়, ভাঙনের কবলে পড়ে অনেকে শেষ আশ্রয়টুকুও হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছে। পানগুছির করাল গ্রাসের শিকার হয়েছে এককালের লিট্যাল কোলকাতা মোরেলগঞ্জ বন্দরসহ উপজেলার বহু ঐতিহাসিক স্মৃতিবিজড়িত নিদর্শন। এছাড়াও সোনাখালী, ফুলহাতা, ঘষিয়াখালী, বহরবুনিয়া, পঞ্চকরণ বাজারসহ মোরেলগঞ্জ বাজারের তিন-চতুর্থাংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। বর্তমানে ভাঙনের মুখে রয়েছে বহু এলাকা। নদীর অব্যাহত ভাঙনের কারনে শরণখোলা, সন্ন্যাসী বাজার ও খাউলিয়ার সাথে মোরেলগঞ্জের পরিবহন ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন রয়েছে। বোরহানউদ্দিন (ভোলা) গত ৪ দিনের অমাবশ্যার অতি জোয়ারে নির্মাণাধীন বেড়িবাঁধ ভেঙে ও ভাঙাবাঁধ দিয়ে পানি ঢুকে ৩য় বারের মতো প্লাবিত হয়েছে ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার ২১টি গ্রাম। গ্রামের বাজারগুলোতেও এখন কোমর সমান পানি। পানিবন্দী হয়ে পড়েছে ৮০ হাজার মানুষ। ঘর-বাড়ি প্রায় ৩ থেকে ৪ ফুট পানিতে ডুবে থাকায় মানবিক বিপর্যয় নেমে এসেছে। ডুবে আছে মেঘনা পাড়ের অর্ধশতাধিক হাটবাজার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ, মন্দির, খেতের ফসল। জোয়ারের পানিতে ভেসে গেছে কয়েক হাজার পুকুর ও ঘেরের মাছ। পানি ঠেকানো অন্তত ৫০ কি.মি. পাকা ও কাঁচা সড়ক ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে গেছে। বোরহানউদ্দিনের বড় মানিকা, কুতুবা, পক্ষীয়া ও হাসাননগর ইউনিয়নের প্রায় ১৬ হাজার পরিবার সরকারি রাস্তা উঁচু বাঁধ ও সাইক্লোন সেল্টারে আশ্রয় নিয়েছে বলে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানিয়েছেন। কাজীপুর (সিরাজগঞ্জ) কাজীপুরে যমুনা নদীতে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় বাঐখোলা বিকল্প বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভাঙনের মুখে পড়েছে। ঘরবাড়ি ও বসতভিটা রক্ষায় স্বেচ্ছাশ্রম দিয়ে নদী ভাঙনের কবল থেকে রক্ষার জন্য কাজ করছেন এলাকার লোকজন। জানা গেছে, বাঐখোলা, পূর্ব খুকশিয়া, শুভগাছা, সীমান্তবাজার এলাকা নদী ভাঙন থেকে রক্ষার জন্য সংসদ সদস্য তানভীর শাকিল জয়ের নিজস্ব প্রচেষ্ঠায় এই বিকল্প বাঁধের নির্মাণ কাজ শুরু হয়। বাঁধের কাজ প্রায় শেষ হয়ে এসেছিলো। কিন্তু যমুনায় বন্যার পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রচণ্ড ঘুর্ণাবর্তের সৃষ্টি হয়ে বাঁধটি ভাঙনের মুখে পড়ে। সদরপুর (ফরিদপুর) সদরপুরে পদ্মা ও আড়িয়াল খাঁ নদে অস্বাভাবিকভাবে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় বন্যার পানি বিপদসীমা ছুঁই ছুঁই অবস্থানে। পানি বৃদ্ধির ফলে উপজেলার পদ্মার চরাঞ্চলের ৫টি ইউনিয়ন বন্যা কবলিত হয়ে পড়েছে। ঐসব এলাকার নিম্নাঞ্চলের ঘরবাড়িতে পানি উঠছে ও উঠতি আউশ ধান , শাক-সবজির মাঠ তলিয়ে গেছে। পানি বৃদ্ধির পাশাপাশি ৫টি ইউনিয়নের ব্যাপক এলাকাজুড়ে পদ্মা ও আড়িয়াল খাঁর ভাঙন বৃদ্ধি পেয়েছে।