গোলাম আযমের মামলার রায় আজ

আপডেট : ১৪ জুলাই ২০১৩, ২২:৪৪
জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমীর অধ্যাপক গোলাম আযমের বিরুদ্ধে ’৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায় আজ সোমবার ঘোষণা করা হবে। গতকাল রবিবার যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান এটিএম ফজলে কবীর এক আদেশে এ রায়ের দিন ধার্য করেন। প্রায় তিন মাস আগে বিচার কাজ শেষে ১৭ এপ্রিল থেকে মামলাটির রায় ঘোষণা অপেক্ষমাণ রাখা হয়েছিলো। এটি হবে বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীরের নেতৃত্বাধীন এবং বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন ও বিচারপতি আনোয়ারুল হকের সমন্বয়ে গঠিত তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল-১ এর দ্বিতীয় রায়। এর আগে ২৮ ফেব্রুয়ারি জামায়াতের নায়েবে আমীর দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় রায় ঘোষণা করে ট্রাইব্যুনাল-১। গত বছরের ১৩ মে গোলাম আযমের বিরুদ্ধে পাঁচটি অভিযোগ গঠন করে ট্রাইব্যুনাল। বর্তমানে বার্ধক্যজনিত অসুস্থতার কারণে তাঁকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) কারাকক্ষে রাখা হয়েছে। এদিকে রায়ে অধ্যাপক গোলাম আযমের সর্বোচ্চ শাস্তির বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলিরা। তবে এ মামলার সকল অভিযোগ থেকে গোলাম আযম বেকসুর খালাস পাবেন বলে আশাবাদী আসামিপক্ষের আইনজীবীরা। উল্লেখ্য, ২০১০ সালের ২৫ মার্চ মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠিত হওয়ার পর গোলাম আযমের মামলার রায় হবে পঞ্চম এবং সবচেয়ে বিলম্বিত। এর আগে দুইটি ট্রাইব্যুনাল থেকে চারটি মামলার বিচার প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার প্রায় এক মাসের মধ্যে রায় ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু গোলাম আযমের মামলার রায় প্রায় তিন মাস পর ঘোষণা করা হচ্ছে। ট্রাইব্যুনাল থেকে এখন পর্যন্ত জামায়াতে ইসলামীর বহিষ্কৃত রুকন পলাতক আবুল কালাম আযাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকার, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল কাদের মোল্লা ও মোহাম্মদ কামারুজ্জামান এবং নায়েবে আমীর দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে মামলায় রায় ঘোষণা করা হয়েছে। রায়ে কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয় এবং বাকি তিনজনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। গতকাল ট্রাইব্যুনাল-১ এর কার্য তালিকায় গোলাম আযমের মামলাটি ৪ নম্বরে ছিল। বেলা পৌনে ১২টার দিকে বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীর বলেন, মামলার রায় প্রস্তুত করা হয়েছে। কাল রায় ঘোষণা করা হবে। আদেশের পর অভিযুক্ত জামায়াত নেতাদের প্রধান আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক ট্রাইব্যুনালকে বলেন, গোলাম আযম শারীরিকভাবে অসুস্থ। রায় ঘোষণার সময় তাঁকে ট্রাইব্যুনালে না আনার জন্য অনুমতি চাইছি। তখন ট্রাইব্যুনাল বলেন, আমরা এ বিষয়ে কোনো আদেশ দিচ্ছি না। অসুস্থ থাকলে তাঁকে আনার বিষয়টি জেল কর্তৃপক্ষ বিবেচনা করবে। এদিকে ট্রাইব্যুনালের আদেশের পর রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি জেয়াদ আল মালুম সাংবাদিকদের বলেন, গোলাম আযমের বিরুদ্ধে আনা সকল অভিযোগ রাষ্ট্রপক্ষ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করেছে। রায়ে তাঁর সর্বোচ্চ শাস্তি হবে বলে আমরা আশা করি। তিনি বলেন, মৃত্যুদণ্ড প্রদানের ক্ষেত্রে আজকের গোলাম আযমকে বিবেচনায় না এনে একাত্তরে গোলাম আযমের বয়সকে বিবেচনার জন্য আমরা ট্রাইব্যুনালকে অনুরোধ করেছি। অন্যদিকে, আসামিপক্ষের আইনজীবী আব্দুর রাজ্জাক বলেন, গোলাম আযমের বিরুদ্ধে আনা ষড়যন্ত্র, পরিকল্পনা, সম্পৃক্ততা, উস্কানি ও হত্যা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ প্রমাণে রাষ্ট্রপক্ষ ব্যর্থ হয়েছে। কোনো অপরাধের সঙ্গে গোলাম আযমের সম্পৃক্ততা তারা প্রমাণ করতে পারেনি। গোলাম আযমের সকল বক্তব্যই ছিলো রাজনৈতিক। তাই আন্তর্জাতিক ও দেশীয় আইনে তাঁর বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণিত হয়নি। আমরা আশা করি তিনি নির্দোষ হিসেবে খালাস পাবেন। উল্লেখ্য, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানের জামায়াতের আমির ছিলেন গোলাম আযম। ১৯৭১ সালে গোলাম আযম বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিপক্ষে অবস্থান নেয়ার জন্য মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতেও প্রকাশ্যে তদবির চালিয়েছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। আনুষ্ঠানিক অভিযোগ অনুসারে, একাত্তরের ২২ নভেম্বর তিনি পাকিস্তানে চলে যান। ১৯৭৩ সালের ১৮ এপ্রিল তাঁর বাংলাদেশের নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়। ১৯৭১ সালে পর থেকে তিনি ৭ বছর লন্ডনে অবস্থান করেন। ১৯৭৮ সালে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে আবার বাংলাদেশে আসেন এই জামায়াত নেতা। ১৯৯৯ সালে তিনি জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের আমিরের পদ থেকে অবসরে যান। মামলার বিচারিক কার্যক্রম: মানবতাবিরোধী অপরাধ তদন্ত সংস্থা ২০১০ সালের ১ আগস্ট গোলাম আযমের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ২০১১ সালের ১২ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করেন। তবে তা ‘অবিন্যস্ত ও অগোছালো’ উল্লেখ করে ট্রাইব্যুনাল অভিযোগ পুনরায় দাখিলের নির্দেশ দেন। রাষ্ট্রপক্ষ অভিযোগ পুনরায় দাখিল করলে ট্রাইব্যুনাল তা আমলে নিয়ে গত বছরের ১১ জানুয়ারি গোলাম আযমকে হাজির হতে বলেন। সে অনুযায়ী তিনি ট্রাইব্যুনালে হাজির হয়ে জামিনের আবেদন জানালে তা খারিজ করে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়। তবে পরে বার্ধক্যজনিত কারণে তাঁকে বিএসএমএমইউর কারাকক্ষে রাখা হয়। ১৩ মে তাঁর বিরুদ্ধে পাঁচটি অভিযোগ গঠন করেন ট্রাইব্যুনাল। গত বছরের ১০ জুন গোলাম আযমের বিরুদ্ধে সূচনা বক্তব্য (ওপেনিং স্টেটমেন্ট) উপস্থাপন করেন রাষ্ট্রপক্ষ। ১ জুলাই থেকে শুরু করে ৪ নভেম্বর পর্যন্ত রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীদের সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা সম্পন্ন হয়। তদন্ত কর্মকর্তা মতিউর রহমানসহ গোলাম আযমের বিরুদ্ধে জব্দ তালিকার ৭ সাক্ষীসহ রাষ্ট্রপক্ষের মোট ১৭ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন। তাদের মধ্যে একজন সাক্ষীর তদন্ত কর্মকর্তার কাছে দেয়া জবানবন্দিকেই সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেছেন ট্রাইব্যুনাল। অন্যদিকে, গোলাম আযমের পক্ষে তাঁর আইনজীবীরা দুই হাজার ৯৩৯ জন সাক্ষীর তালিকা জমা দিয়েছিলেন। এর মধ্যে ১২ জন সাফাই সাক্ষ্য দিতে পারবেন বলে নির্ধারণ করে দেন ট্রাইব্যুনাল। তবে একমাত্র সাফাই সাক্ষী হিসেবে ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেন গোলাম আযমের ছেলে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (বরখাস্তকৃত) আব্দুল্লাহিল আমান আজমী। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৮ মার্চ পর্যন্ত এবং ১৭ এপ্রিল ১১ কার্যদিবসে রাষ্ট্রপক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন চিফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপু, প্রসিকিউটর সৈয়দ হায়দার আলী, ড. তুরিন আফরোজ, জেয়াদ আল মালুম ও সুলতান মাহমুদ সীমন। ১২ কার্যদিবসে যুক্তি উপস্থাপন করেন আসামিপক্ষের আইনজীবীরা। আসামিপক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেন ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক, ইমরান সিদ্দিক, মিজানুল ইসলাম, তাজুল ইসলাম প্রমুখ। ১৭ এপ্রিল মামলাটি রায় ঘোষণার জন্য অপক্ষেমাণ রাখা হয়।