ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে হেফাজতে ইসলামের আমীর আল্লামা শফী নারীদের নিয়ে যে বক্তব্য দিয়েছেন তা নিয়ে গতকাল রবিবার জাতীয় সংসদ অধিবেশনে রীতিমতো ‘ঝড়’ উঠেছিল। সরকারের সিনিয়র মন্ত্রীরাসহ মহিলা সংসদ সদস্যরা আল্লামা শফীর বক্তব্যের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভে ফেটে পড়েন। শফীর বক্তব্যকে তারা ‘কুরুচিপূর্ণ ও অশ্লীল’ বলে উল্লেখ করেন। তারা বলেন, এই শফীরা দেশকে আইয়ামে জাহিলিয়াতের যুগে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চায়। তাকে জাতির কাছে ক্ষমা চেয়ে নারীদের নিয়ে করা বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি জানান। তারা বলেন, সেদিন আর বেশী দূরে নয়, যেদিন নারী-পুরুষরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে এই শফীদের ধিক্কার ও ছিঃ ছিঃ ছিঃ জানাবে।
সরকারি দলের নারী সংসদ সদস্যরা শফীর মন্তব্যে তীব্র ঘৃণা প্রকাশ করলেও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা হেফাজতের পক্ষ নেন। তারা দাবি করেন, কিছু মিডিয়া শফীর বক্তব্য ‘বিকৃতভাবে’ উপস্থাপন করে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে। হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফায় নারী বিরোধী কিছু নেই বলেও তারা মন্তব্য করেন।
গতকাল রবিবার বেলা ১১টায় জাতীয় সংসদ অধিবেশনে পয়েন্ট অব অর্ডারে শফীর এই ভিডিও নিয়ে অনির্ধারিত বিতর্কের সূত্রপাত করেন সরকারি দলের সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য এ এন মাহফুজা খাতুন বেবী মওদুদ। পয়েন্ট অব অর্ডারে বিতর্কে অংশ নেন কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী, মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি, এডভোকেট তারানা হালিম, এডভোকেট ফজিলাতুন্নেছা বাপ্পী, বিএনপির সংরক্ষিত আসনের এমপি সৈয়দা আশিফা আশরাফি পাপিয়া। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ সময় উপস্থিত থাকলেও বিরোধী দলের নেতা খালেদা জিয়া অনুপস্থিত ছিলেন।
আল্লামা শফীর বক্তব্যকে কুরুচিপূর্ণ উল্লেখ করে কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী বলেন, নারী সমাজের অপমানের প্রতিবাদ করা একজন নারী হিসাবে আমার নৈতিক দায়িত্ব। আহমদ শফী ধর্মের নামে নারীদের সম্পর্কে চরম অবমাননাকর কথা বলেছেন। তিনি (আহমদ শফী) নিশ্চয় একজন মায়ের গর্ভে জন্ম নিয়েছেন, তারও স্ত্রী-কন্যা আছে। সেই নারী সম্পর্কে যে বক্তব্য আহমদ শফী দিয়েছেন, তাতে তার প্রতি জাতির ঘৃণা জন্মেছে। তিনি ঘৃণায় গা ঘিন ঘিন করা বক্তব্য দিয়েছেন। কৃষিমন্ত্রী আরো বলেন, বেশিক্ষণ নারীদের দিকে তাকিয়ে থাকলে শফী সাহেবের কী হয়, তা আমি অনুমান করতে চাই না। তার বক্তব্য শুনে আমার মনে হয়েছে, কেউ আমার গায়ে বমি করে দিয়েছে! পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন আয়াতের ব্যাখ্যা দিয়ে মতিয়া চৌধুরী বলেন, আইয়ামে জাহিলিয়াতের যুগে যখন কন্যা সন্তানকে পুঁতে ফেলা হতো, তখন আল্লাহ নারীদের রক্ষা করার জন্য কোরআনে একাধিক আয়াত নাজিল করেন। অথচ আল্লামা শফী ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে নারীদের আবারও সেই যুগে ঠেলে দিতে চাইছেন। বিরোধী দল আল্লামা শফীকে হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করতে চাইছেন। তার বক্তব্যকে সমর্থন করছেন। তাহলে শফীর বক্তব্যকে সম্মান জানাতে বিরোধী দলীয় নেত্রী খালেদা জিয়া ও তাদের মহিলা সংসদ সদস্যদের তো ঘরে বসে বাড়ির আসবাবপত্র হেফাজত করা এবং স্বামীর টাকা-পয়সার হিসাব রাখার কথা! জাতীয় সংসদে তাদের থাকার কথা নয়।
কৃষিমন্ত্রী আরো বলেন, একজনের উপার্জনে সংসার চলে না। শফীর বক্তব্য মানলে কোনো সন্তান না খেয়ে থাকলেও তার মা চাকরি করতে পারবেন না। সন্তানের মুখে বিষ ঢেলে দিয়ে মায়েরা আত্মহত্যা করবেন- এটাই কী চান শফী সাহেবরা। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় ক্যাম্পে মেয়েদের আটকে রেখে সম্ভ্রমহানি করা হতো। তখন গোলাম আযমরা বলতেন-যুদ্ধের সময় জেনা করা জায়েজ। তিনি বলেছিলেন, মেয়েরা ‘গণিমতের মাল’। দুঃখজনক হলেও সত্যি, এই যুগে এসেও মেয়েদের সম্পর্কে একই ধরনের নোংরা কথা বলা হচ্ছে। তিনি বলেন, শফী যে কুরুচিপূর্ণ-অশ্লীল বক্তব্য দিয়েছেন, নারী সমাজ তা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করবে। এই নোংরা ভাষার প্রতিবাদ জানাতে পুরুষ ভাইদেরকেও আমরা পাশে চাই। একদিন নারী-পুরুষ সবাই একতাবদ্ধ হয়ে আল্লামা শফীদের ধিক্কার ও ছিঃ ছিঃ জানাবে।
অপরদিকে, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী বলেন, নারীর অবমাননা সহ্য করা যায় না। যতই ষড়যন্ত্র করা হোক, বাংলাদেশকে আমরা কোনভাবেই মধ্যযুগে ফিরে যেতে দেব না। নারীর অগ্রগতি কেউ রোধ করতে পারবে না। ধর্মান্ধ ও ধর্মব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আবারও একাত্তরের মতো জেগে উঠতে হবে। শফী সাহেব নারী জাতিকে নিয়ে অশালীন বক্তব্য দিয়ে গোটা জাতিকেই অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিতে চাইছেন।
সরকারি দলের সংসদ সদস্য বেবী মওদুদ শফীর বক্তব্যকে ‘অশ্লীল, নোংরা, অসভ্য’ বলে উল্লেখ করে বলেন, এই বক্তব্য নারীর অধিকার ও স্বাধীনতাবিরোধী। তিনি এ ধরনের বক্তব্য দিয়ে সংবিধান ও প্রচলিত আইন লংঘন করেছেন। আমরা তাদের শাস্তি চাই। শফীকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, তিনি কী নারীদের ঘৃণ্য ও পশু বলে মনে করেন? তার মাকেও কী তিনি ঘৃণ্য বলে মনে করেন? এদেশের হাজার হাজার মেয়ে চাকরি করে জিবীকা নির্বাহ করেন। তারা কী চাকরি করতে গিয়ে জেনা করেন? গার্মেন্টস শিল্পের নারী শ্রমিকরা সকাল থেকে রাত পর্যন্ত নিরলসভাবে কাজ করেন। ঘাম ঝরিয়ে উপার্জন করেন। তারা কি জেনা করেন? এসব পাপীকে আমরা ঘৃণা করি।
মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি বলেন, বিরোধী দল হেফাজত আমীরের নোংরা ও অশ্লীল বক্তব্যের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছে। তাদের মদদেই আল্লামা শফীরা নারী সমাজকে অসম্মান করে কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য রাখছেন। একজন নারী হয়ে প্রধানমন্ত্রী সোচ্চার হলেও বিরোধী দলীয় নেতা চুপ কেন? আহমদ শফীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। বার বার মিথ্যা ও বিভ্রান্তি ছড়িয়ে নারীদের পিছনের দিকে ঠেলে দিতে চাইছে বিরোধী দল। এই দেশের মানুষ তালেবানি শাসন চায় না। এদেশের নারীরা তালেবানের রক্তচক্ষুকে ভয় পায় না, প্রতিরোধ গড়ে তুলেই এসব ষড়যন্ত্রকারীদের রুখে দেবেই।
সরকারি দলের আরেক সংসদ সদস্য বিশিষ্ট নাট্যাভিনেত্রী এডভোকেট তারানা হালিম বলেন, বিএনপির নারী সংসদ সদস্যরা শফী’র নোংরা-অসভ্য-জঘন্য বক্তব্যকে সমর্থন জানাচ্ছেন। এতে নারী হিসেবে আমি ভীষণ লজ্জিত। তাদের প্রতি ঘৃণা জানানোর ভাষা আমার জানা নেই। ’৯৩ বছর বয়সী আহমদ শফী’র কুরুচীপূর্ণ বক্তব্যের বিরুদ্ধে দেশের নারী সমাজ আজ জেগে উঠেছে। জাতির কাছে আল্লামা শফীকে ক্ষমা চাইতে হবে।
ফজিলাতুন্নেসা বাপ্পি আল্লামা শফী’র বক্তব্যের কঠোর সমালোচনা করে বলেন, সর্বপ্রথম ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন একজন নারী বিবি খাদিজা। আর জিহাদেও প্রথম শহীদ হয়েছিলেন একজন নারী বিবি সুমাইয়া। মা ফাতেমা নবীজীর (সা.) সঙ্গে যুদ্ধ করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধসহ সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনে নারী সমাজের বিশাল অবদান রয়েছে। এদেশের প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলীয় নেত্রী ও স্পীকার তিনজনই নারী। বাংলাদেশের নারীরা আজ হিমালয় জয় করছে। নারীর ক্ষমতায়ন আজ সারাবিশ্বে প্রশংসিত হচ্ছেন। তিনি বলেন, ইসলাম ধর্মে কুত্সা রটনা করে নারীর অবমাননা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু আল্লামা শফী নারীদের ‘তেঁতুলের’ সঙ্গে তুলনা করে নারী সমাজের সম্মানহানী করেছেন। তিনি বলেন, শফী সাহেবের মুখে এ ধরনের নোংরা ও অসভ্য বক্তব্য শুনে প্রশ্ন জাগে, তিনি কী কোন নারীর পেটে জন্ম নেননি? তাকে প্রশ্ন করি- যে নেত্রীর (খালেদা জিয়া) নির্দেশ শুনে তিনি মতিঝিলে ধ্বংসযজ্ঞ ও কোরআন শরিফ পুড়িয়েছেন- সেই নেত্রীকে দেখে কী তার জিহ্বায় পানি আসে? এ ধরনের বক্তব্য সংবিধান ও সব ধরনের আইনবিরোধী। দেশবাসীর সামনে শফীকে অবশ্যই ক্ষমা চেয়ে তার বক্তব্য প্রত্যাহার করতে হবে। নইলে তার বিচার হবে।
বিএনপির ভিন্ন সুর :আহমদ শফীর বক্তব্য নিয়ে সরকারি দল ক্ষোভে ফেটে পড়লেও বিএনপির সংসদ সদস্য সৈয়দা আশিফা আশরাফি পাপিয়া বলেন, আল্লামা শফী একজন আলেম মানুষ। এই সরকার তাকে কওমী মাদ্রাসা বোর্ডের চেয়ারম্যানসহ নানা পদ-পদবি দিয়েছে। অথচ তার বিরুদ্ধে এই সংসদে কেন বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে- সেটা আমরা বুঝতে পারছি না। তিনি বলেন, আল্লামা শফীর নামে যে বক্তব্য ছাপা হয়েছে, তা ‘মিডিয়ার ক্যু’র মাধ্যমে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে বলে আল্লামা শফী উল্লেখ করেছেন। হেফাজতের সেই বহুল আলোচিত ১৩ দফা প্রসঙ্গে পাপিয়া বলেন, ১৩ দফায় নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। সরকার সমর্থিত মিডিয়াগুলোর মাধ্যমে তার বক্তব্য বিকৃত করে সংসদে বক্তব্য দেওয়ার প্রেক্ষাপট তৈরি করা হচ্ছে। আহমদ শফী’র নামে মিথ্যাচার করা হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন। বিএনপির এই এমপি আরো বলেন, ১৩ দফার বিরুদ্ধে গার্মেন্টসের নারী শ্রমিকদের সমাবেশ ফ্লপ হয়েছিল। ১৩ দফার বিষয়ে তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানান তিনি। তিনি বলেন, ৫ মে শাপলা চত্ব্বরে হেফাজতের সমাবেশ চলাকালে ছাত্রলীগ-যুবলীগ ও পুলিশ দিয়ে হেফাজত কর্মীদের জবাই করে হত্যা করা হয়েছে। তিনি বলেন, শাহবাগে কাউকে মাসের পর মাস অবস্থান করতে দেওয়া হবে, আর হেফাজত শাপলা চত্ব্বরে অবস্থান নিতে চাইলে তাদের ওপর হামলা চালানো হবে -এটা ঠিক নয়।
