রংপুর মেডিক্যালে শৃংখলা ভেঙে যায় বার বার

আপডেট : ১৪ জুলাই ২০১৩, ২২:৪৯
অনিয়ম-দুর্নীতি, অন্তর্দ্বন্দ্ব, অব্যবস্থাপনা, বহিরাগত দালাল ও ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের অবাধ প্রবেশসহ বিভিন্ন কারণে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের শৃঙ্খলা বার বার ভেঙ্গে যাচ্ছে। পাশাপাশি রয়েছে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বা ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তি ও রোগী বা লাশ বহনকারী গাড়ি সিন্ডিকেটের দাপট ও অতিরিক্ত দর্শনার্থীর পদচারণা। সবদিক থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে চিকিত্সাসেবা নিতে আসা রোগীরা। বার বার নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। বৃহত্তর রংপুর-দিনাজপুর অঞ্চলের মানুষকে চিকিত্সা সেবা প্রদানের লক্ষ্যে ১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল। ২০১৩ ইং সালে এসে বিভিন্ন আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিয়ে এই হাসপাতাল ১ হাজার শয্যায় উন্নীত হয়েছে। গড়ে প্রতিদিন আড়াই হাজার রোগী ভর্তি থাকে। আর দেড় হাজার রোগী বহির্বিভাগে চিকিত্সাসেবা গ্রহণ করে। কিন্তু হাসপাতালে কেউ কারও কথা শুনতে চায় না এবং কারও নির্দেশ কেউ মানে না। হাসপাতালের পরিচালকও অধস্তন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিকট অসহায়। তার সিদ্ধান্ত কেউ মানে না। বিশেষ করে ৪র্থ শ্রেণির কর্মচারীরা পরিচালককে মান্য করতে নারাজ। ওয়ার্ডভিত্তিক চিকিত্সকরা যথাসাধ্য সেবা প্রদান করলেও তাদের অনুগত ইন্টার্নিরা ইচ্ছেমতো দায়িত্ব পালন করে। ওয়ার্ডের নার্সরা চিকিত্সকের কোন নির্দেশনা বা আদেশ পালনে মনোযোগ দেয় না। এমনও দৃশ্য প্রতিদিন দেখা যায় যে, ডাক্তাররা ডেকেও নার্সদের সাড়া না পেয়ে নিজেরাই গজ, ব্যান্ডেজ, ক্যাথিটার, ইনজেকশন পুশ, অক্সিজেন লাগানো, স্যালাইন লাগানো কাজগুলো করে থাকে। রোগীর ব্যাপারে চিকিত্সকের বিশেষ নির্দেশনা থাকলেও অধিকাংশ সিনিয়র স্টাফ নার্সকে সেটি মানতে দেখা যায় না। আর নার্সরা তাদের খবরদারী আয়া, বয় বা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের কাছে খাটাতে পারে না। বিভাগীয় প্রধানগণ কোন নির্দেশনা দিলে তা পালন করার তাগাদা থাকে না অধস্তনদের। বহির্বিভাগের চিকিত্সকরা কোন বিধি-নিষেধ না মেনে ইচ্ছামতো রোগী দেখে বা ছাত্রদের দিয়ে দেখায়। তারা কঠোর নির্দেশ উপেক্ষা করে ওষুধ কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধিদের সাথে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্পে মেতে থাকেন। লিফটম্যান, সিকিউরিটি গার্ড, ইমারজেন্সি বিভাগের কর্মচারীরা তাদের খেয়াল-খুশিমত কাজ করে। লিফট চালকরা কোনরকম তোয়াক্কা না করেই পরিচালক, চিকিত্সক, নার্স ও রোগীদের রেখে টাকার বিনিময়ে লোকজন ওঠানামা করায়। ফলে ওই সকল ব্যক্তি বিরক্ত হয়ে সিঁড়িপথে যাতায়াত করেন। এমনও কিছু বিভাগ রয়েছে যেখানে ভাল পোশাক পরে কর্মচারীরা ডাক্তার সেজে বসে থাকে। বিশেষ করে ব্লাড ট্রান্সফিউশন বিভাগে এটা প্রতিনিয়ত ঘটে। নির্দেশনা অমান্য করে পাশ বহির্ভূত দর্শনার্থী যাতায়াতের সুবিধা দিচ্ছে ৪র্থ শ্রেণির কর্মচারীরা। ফলে দর্শনার্থীর সংখ্যা বেড়ে গিয়ে হাসপাতালকে আবর্জনার ডাস্টবিন বানিয়ে ফেলছে। আর জরুরি বিভাগ থেকে ওয়ার্ড পর্যন্ত রোগীর যাওয়া এবং মরদেহ বের করা পর্যন্ত প্রকাশ্যে টাকার দেন-দরবার নতুন কিছু নয়। অপরদিকে ওষুধ ও চিকিত্সা সামগ্রী চুরি, ঠিকাদারের সাথে আঁতাতের মাধ্যমে কাজ না করলেও বিল প্রদান, অর্থের বিনিময়ে চাহিদামতো ওয়ার্ডে দায়িত্ব বণ্টন, রোগীর কাছে ফি নিয়েও চিকিত্সকের সীল-স্বাক্ষরের মাধ্যমে ফ্রি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা, ব্লাড ব্যাংক থেকে রক্ত বিক্রি, বহিরাগত প্যাথলজি দালালদের প্রবেশে সুযোগদানসহ বিভিন্ন অনিয়মের সঙ্গে জড়িত রয়েছে কর্তাব্যক্তি ও অন্যরা। কেউ কারও কথা বা নির্দেশ মানতে চায় না। এই না মানার কারণে সামান্য বিষয় নিয়ে বার বার আন্দোলন করে চিকিত্সাসেবায় অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়। এমন পরিস্থিতিতে রোগীরা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কারও মাথাব্যথা নেই। এ ব্যাপারে হাসপাতাল পরিচালক ডাঃ গোলাম মোস্তফার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, শত প্রতিবন্ধকতার মাঝেও কাজ করে যেতে হবে এটাই বাস্তবতা।