গোলাম আযমের ৯০ বছর জেল

আপডেট : ১৫ জুলাই ২০১৩, ২২:৫৮
জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমীর গোলাম আযমকে মুক্তিযুদ্ধকালে মানবতা বিরোধী কাজের ষড়যন্ত্র, পরিকল্পনা, উস্কানি, সহযোগিতা এবং হত্যা ও নির্যাতনের পাঁচটি অভিযোগে ৯০ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। গতকাল সোমবার চেয়ারম্যান বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীরের নেতৃত্বাধীন যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ রায় দেন। রায়ে বলা হয়, গোলাম আযমের বিরুদ্ধে আনা রাষ্ট্রপক্ষের পাঁচটি অভিযোগই সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত। এর মধ্যে প্রথম চারটি অভিযোগে গোলাম আযমের সুপিরিয়র রেসপন্সিবিলিটি (ঊর্ধ্বতন কর্তৃত্বের দায়) প্রমাণ হয়েছে। অপরাধের তীব্রতা ও বিস্তার বিবেচনায় তার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হয়। তবে ৯১ বছর বয়সী গোলাম আযম নানা রকম বার্ধক্যজনিত রোগে ভুগছেন। তাই শাস্তি দেয়ার ক্ষেত্রে ট্রাইব্যুনাল পরিস্থিতি বিবেচনা করে দণ্ড হ্রাসের মতো দয়ালু মনোভাব পোষণ করে মানবতা বিরোধী অপরাধ সংঘটনে ষড়যন্ত্র ও পরিকল্পনার এক ও দুই নম্বর অভিযোগে তাকে ১০ বছর করে ২০ বছর, তিন নম্বর উস্কানির অভিযোগে ২০, চার নম্বর অপরাধ সংঘঠনে সহযোগিতার অভিযোগে ২০ এবং একাত্তরে ঢাকার মোহাম্মদপুর থানায় দারোগা সিরু মিয়া ও আরো তিনজনকে হত্যার অভিযোগে তাকে দোষী সাব্যস্ত করে ৩০ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। অভিযুক্ত গোলাম আযম ধারাবাহিকভাবে অথবা আমৃত্যু এ কারাদণ্ড ভোগ করবেন। রায় ঘোষণার সময় গোলাম আযম কাঠগড়ায় ছিলেন। এছাড়া রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের আইনজীবীরা ছাড়াও সাংবাদিক, পর্যবেক্ষক ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা এজলাসে উপস্থিত ছিলেন। এদিকে রায়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষ। ট্রাইব্যুনালে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলিদের প্রধান সমন্বয়ক অতিরিক্ত এটর্নি জেনারেল এমকে রহমান বলেন, আমরা সম্পূর্ণ খুশি হতে পারিনি। আমরা সর্বোচ্চ শাস্তি আশা করেছিলাম। রায়ের কপি হাতে পাওয়ার পর আমরা আপিলের বিষয়টি বিবেচনা করবো। তবে এর মাধ্যমে এক ধরনের ন্যায়বিচারও হয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষের অন্যতম কৌঁসুলি তুরিন আফরোজ বলেন, আমরা এ রায়ে হতাশ। এ রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল বিভাগে আপিল করবে। অন্যদিকে, আসামিপক্ষের প্রধান আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হবে। কারণ এ রায় আবেগ তাড়িত। রায়ের বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন গোলাম আযমের ছেলে আব্দুল্লাহিল আমান আজমী। তিনি বলেন, এটা ন্যায়ভ্রষ্ট রায়। এ রায়ে আমরা বিক্ষুব্ধ কিন্তু বিস্মিত নই। কারণ সরকারের কয়েকজন নেতা ও মন্ত্রী তার রায় সম্পর্কে এ ধরনের মন্তব্য আগে করেছেন। এখানে তাদের ইচ্ছার প্রতিফলন হয়েছে। আমরা উচ্চ আদালতে যাব। রায় নিয়ে গোলাম আযম বিচলিত নন বলে তার ছেলে জানান। গতকাল গোলাম আযমের রায়কে কেন্দ্র করে ট্রাইব্যুনালসহ সুপ্রিম কোর্টের আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা ব্যাপক জোরদার করা হয়। জনাকীর্ণ এজলাসে ১০টা ৪৬ মিনিটে বিচারকরা আসন গ্রহণ করেন। এর আগে ১০টা ৪২ মিনিটে গোলাম আযমকে কাঠগড়ায় আনা হয়। বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীর বলেন, সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই আমরা রায় প্রস্তুত করেছি। মূল রায় হল ২৪৩ পৃষ্ঠার। কিন্তু ট্রাইব্যুনালে পূর্ণাঙ্গ রায় পড়া সম্ভব নয়। এ কারণে রায়ের ৭৫ পৃষ্ঠার সংক্ষিপ্ত কপি পড়া হবে। এর পর ১১টা ২ মিনিট থেকে রায়ের সারাংশ পড়া শুরু করেন ট্রাইব্যুনালের সদস্য আনোয়ারুল হক। এর পর একে একে জাহাঙ্গীর হোসেন ও এটিএম ফজলে কবীর সারাংশ পড়েন। ১টা ৪৪ মিনিটে রায় ঘোষণা করা হয়। সব অভিযোগ প্রমাণিত :গত বছরের ১৩ মে গোলাম আযমের বিরুদ্ধে মানবতা বিরোধী অপরাধ সংঘটনে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্র, সহযোগিতা, উস্কানি, সম্পৃক্ততা ও বাধা না দেয়া এবং ব্যক্তিগতভাবে নির্যাতনের পাঁচটি অভিযোগ গঠন করা হয়। অভিযোগগুলোতে মানবতা বিরোধী অপরাধ সংঘটনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে পরিকল্পনার ছয়টি, ষড়যন্ত্র সংক্রান্ত ৩টি, উস্কানি দেয়ার ২৮টি, অপরাধ সংঘটনে সহযোগিতার ২৩টি এবং হত্যা ও নির্যাতন সংক্রান্ত ১টি ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। রায়ে ষড়যন্ত্র ও পরিকল্পনার অভিযোগের ৯ ঘটনার বিষয়ে তুলে ধরা হয়। এই দুই অভিযোগের বিষয়ে তদানীন্তন পাকিস্তানের সামরিক শাসকদের সাথে গোলাম আযমের কয়েকটি বৈঠক ও তার সাংবাদিক সম্মেলনের বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষ তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করেছে। যা মুক্তিযুদ্ধের সময়ে প্রভাব ফেলেছিল। গোলাম আযম, নূরুল আমীন, মৌলভী ফরিদ আহমেদ, খাজা খয়ের উদ্দিন, একেএম শফিকুল ইসলাম, মাওলানা নুরুজ্জামান, হামিদুল হক চৌধুরী, মোহসিন উদ্দিন আহমেদ, সাদীসহ ১২ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানের ‘খ’ অঞ্চলের সামরিক আইন প্রশাসক টিক্কা খানের সঙ্গে দেখা করে নাগরিক শান্তি কমিটি গঠনের ষড়যন্ত্র করেন বলে যে অভিযোগ রয়েছে, সে বিষয়ে দৈনিক আজাদ পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের কাটিং, দৈনিক পূর্বদেশে প্রকাশিত ছবি, দৈনিক পাকিস্তানের কাটিং রাষ্ট্রপক্ষ দালিলিক প্রমাণ হিসেবে পেশ করে। ১৯শে জুন রাওয়ালপিন্ডিতে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের একটি বৈঠক করেন গোলাম আযম। এ বিষয়ে দৈনিক সংগ্রামের কাটিং পেশ করা হয়। এছাড়া লাহোরে তার প্রেস ব্রিফিংয়ের বিষয়ে দৈনিক ইত্তেফাক ও দৈনিক পাকিস্তানের কাটিং প্রমাণ হিসেবে পেশ করে রাষ্ট্রপক্ষ। এছাড়া রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী মুনতাসীর মামুন, মাহবুব উদ্দিন আহমেদ, সুলতানা কামাল ও তদন্ত কর্মকর্তা মতিউর রহমান এ দুই অভিযোগে সাক্ষ্য দিয়েছেন। অন্যদিকে, গোলাম আযমের পক্ষে ছেলে আব্দুল্লাহিল আমান আজমী তার বাবার পক্ষে সাক্ষ্য দিয়েছেন। তিনি তার বাবার আত্মজীবনী ‘জীবনে যা দেখলাম’ প্রদর্শন করেন। সেখানে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ ঢাকা পরিস্থিতি দেখেন বলে জানান গোলাম আযম। এতে বোঝা যায় পাকিস্তানি সেনাদের নৃশংসতা সম্পর্কে তার পূর্ণ জ্ঞান ছিল। এসব জানা সত্ত্বেও সে পাকিস্তানি সেনা শাসকদের সঙ্গে সাক্ষাত্ করেন, শান্তি কমিটি গঠন করেন। সকল তথ্য-প্রমাণ বিবেচনায় প্রমাণ হয় তিনি ষড়যন্ত্র ও পরিকল্পনা করেছেন যে কারণে মানবতা বিরোধী অপরাধ ও ব্যাপক মাত্রায় গণহত্যার ঘটনা ঘটেছে। মানবতা বিরোধী অপরাধে উস্কানি দেয়ার ২৮টি ঘটনার কথা বলা হয়েছে প্রসিকিউশনের অভিযোগে। ১৯৭১ সালের ৭ এপ্রিল গোলাম আযম এক যুক্ত বিবৃতিতে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী মানুষকে ভারতীয় অনুপ্রবেশকারী আখ্যায়িত করে তাদের ধ্বংস করার আহ্বান জানান। ২২ এপ্রিল শান্তি কমিটির সভা শেষে এক বিবৃতিতে গোলাম আযমের নিয়ন্ত্রণে থাকা সংগঠনগুলোর সদস্যদের দেশপ্রেমিক নাগরিক উল্লেখ করে দেশের সাধারণ নাগরিকদের ধ্বংস করার আহ্বান জানানো হয়। ১৭ মে গোলাম আযম ঢাকায় এক সভায় স্বাধীনতা আন্দোলনকে রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের বিশ্বাসঘাতক আখ্যায়িত করেন। সেই ২৫ মার্চের অপারেশন সার্চ লাইটেরও প্রশংসা করেন তিনি। তার বিরুদ্ধে আরো বেশ কয়েকটি জনসভায় উস্কানিমূলক বক্তব্য দেয়ার অভিযোগ রয়েছে। এ অভিযোগ প্রমাণে রাষ্ট্রপক্ষ দৈনিক ইত্তেফাকসহ কয়েকটি পত্রিকার কাটিং জমা দেয়। এছাড়া কয়েকজন সাক্ষী ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেন। চার নম্বর অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধে সহযোগিতা বা সম্পৃক্ততার ২৩টি ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, গোলাম আযমসহ অন্যরা একাত্তরের ৪ এবং ৬ এপ্রিল টিক্কা খানের সঙ্গে দেখা করে সহযোগিতার আশ্বাস দেন। গোলাম আযমের সহযোগিতায় ৯ এপ্রিল নাগরিক শান্তি কমিটি গঠিত হয়। এরপর ১৫ এপ্রিল এর নাম বদল করে কেন্দ ীয় শান্তি কমিটি করা হয়। শান্তি কমিটির ২১ সদস্যের কার্যকরী কমিটিরও সদস্য ছিলেন তিনি। ১৮ জুন পাকিস্তানের লাহোর বিমানবন্দরে গোলাম আযম বলেন, জনগণ সেনাবাহিনীর সঙ্গে সম্পূর্ণ সহযোগিতা করতে চায়। এ চারটি অভিযোগে রাষ্ট্রপক্ষের পেশ করা ডকুমেন্ট ও মৌখিক সাক্ষীর মাধ্যমে গোলাম আযমের ঊর্ধ্বতন কর্তৃত্বের দায় প্রমাণ হয়েছে। গোলাম আযমের বিরুদ্ধে পঞ্চম অভিযোগে হত্যা ও নির্যাতনের একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেছে প্রসিকিউশন। এতে বলা হয়, কুমিল্লার হোমনা থানার রামকৃষ্ণপুর গ্রামের সিরু মিয়া একাত্তরে ঢাকার মোহাম্মদপুর থানায় দারোগা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ২৮ মার্চ তিনি স্ত্রী আনোয়ারা বেগম ও ১৪ বছরের ছেলে আনোয়ার কামালকে নিয়ে কুমিল্লায় নিজের বাড়িতে যান। সেখানে শরণার্থীদের ভারতে যাতায়াতে সহযোগিতা করতেন সিরু মিয়া। সিরু মিয়া ও তার ছেলেসহ ছয় জন ভারতে যাওয়ার সময় ১৯৭১ সালের ২৭ অক্টোবর সকাল ১০টার দিকে কসবা থানার তন্তর চেকপোস্টের কাছে রাজাকারদের হাতে ধরা পড়েন। স্বামী-সন্তানের ধরা পড়ার খবর পেয়ে সিরু মিয়ার স্ত্রী গোলাম আযমের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। সিরু মিয়ার ভগ্নিপতি ছিলেন গোলাম আযমের দুই ছেলে আজমী ও আমীনের শিক্ষক। তিনি গোলাম আযমের কাছে সিরু মিয়া ও তার ছেলেকে মুক্তি দেয়ার অনুরোধ করেন। বিষয়টি নিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শান্তি কমিটির নেতা পেয়ারা মিয়াকে চিঠি পাঠান গোলাম আযম। যে চিঠিতে সিরু মিয়া এবং তার ছেলেকে ছাড়ার বদলে হত্যার নির্দেশ দেয়া হয়। এই পরিপ্রেক্ষিতে সিরু মিয়াসহ ৩৯ জনকে কারাগার থেকে পৈরতলা রেল সেতুর কাছে নিয়ে যায় পাক বাহিনী। সেখানে হানাদারদের গুলিতে ৩৮ জন মারা গেলেও একজন প্রাণে বেঁচে যান। এ অভিযোগে সিরু মিয়ার বউ আনোয়ারা বেগম ও মেয়ে মুনিয়া ইসলামসহ ৮ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন। ভাই আনোয়ার কামালের লেখা একটি চিঠিও ট্রাইব্যুনালে পেশ করেন মুনিয়া বেগম। সকল সাক্ষ্য প্রমাণ বিবেচনা করে সিরু মিয়াসহ আরো তিন জনের হত্যাকাণ্ডে গোলাম আযমের সম্পৃক্ততা ফৌজদারী অপরাধ হিসেবে প্রমাণ হয়েছে। অপরাধ মৃত্যুদণ্ডের, বয়স বিবেচনায় কারাদণ্ড: রায়ে বলা হয়, সকল সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ হয়েছে গোলাম আযম পাকিস্তান রক্ষায় কার্যত শীর্ষ নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। জামায়াতে ইসলামীর সদস্যদের দিয়ে শান্তি কমিটি, রাজাকার, আল বদর এবং আল শামস গঠনের রূপকার হিসেবে ভূমিকা পালন করেন গোলাম আযম। জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘ মুক্তিযুদ্ধে নয় মাসে পাকিস্তানি সেনাদের নৃশংসতা চালাতে সহায়তা করে। এটা স্বীকৃত যে, এসব প্যারা-মিলিটারি বাহিনীর সহায়তায় পাকিস্তানি সেনারা লাখ লাখ বাঙালি হত্যা করেছে; কিন্তু এসব বাহিনীর ওপর গোলাম আযমের নিয়ন্ত্রণ থাকলেও তিনি তাদের বাধা দেননি। যা আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন, ১৯৭৩-এর ৩(২) ধারা অনুযায়ী অপরাধ। রায়ে আরো বলা হয়, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নৃশংস হত্যাযজ্ঞের বিষয়ে গোলাম আযম জানতেন। তিনি এসব অপরাধ সংঘটনের মূল হোতা (মাস্টারমাইন্ড) সেটি রাষ্ট্রপক্ষ প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে বলে প্রসিকিউটর সৈয়দ হায়দার আলী ট্রাইব্যুনালে সে বিষয়ে বক্তব্য পেশ করেন। তিনি গোলাম আযমের সর্বোচ্চ শাস্তি প্রার্থনা করেন। আমরা ইতিমধ্যেই তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগে তাকে দোষী সাব্যস্ত করেছি। এখন প্রশ্ন হলো- তাকে কী শাস্তি দেয়া হবে। এমন শাস্তি প্রদান করতে হবে যার মাধ্যমে আইনের শাসনের এবং ভিকটিমদের পরিবারের প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটবে। ব্লাস্কিক মামলায় আমরা দেখেছি, কোনো অভিযুক্তের বিরুদ্ধে সামরিক কমান্ড রেসপনসিবিলিটি বা সমান্তরালভাবে সিভিল সুপিরিওর রেসপনসিবিলিটির বিষয়টি প্রমাণ হলে কঠোর শাস্তি প্রদান করা হবে। এমনকি অধীনস্ত প্রকৃত অপরাধীদের চেয়ে তার শাস্তি গুরুতর হবে। অপরাধের ধরন, আইননি অবস্থান, তীব্রতা ও বিস্তারসহ সকল বিষয় বিবেচনা করে ট্রাইব্যুনাল সর্বসম্মতক্রমে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে, আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন ১৯৭৩-এর ২০ (২) ধারা অনুযায়ী গোলাম আযমের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডই প্রাপ্য। কিন্তু একই সময়ে এমন কিছু বিষয় আমাদের সামনে এসে উপনীত হয়েছে যে, আমরা সেগুলো বিবেচনায় না নিয়ে পারি না। গোলাম আযমের বর্তমান বয়স ৯১ বছর এ বিষয়ে কোনো দ্বিমত নেই। ২০১১ সালের ১১ জানুয়ারি তাকে পুলিশি হেফাজতে পাঠানোর পর সেদিনই জেল কর্তৃপক্ষ চিকিত্সার জন্য তাকে বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) প্রিজন সেলে পাঠায়। তার বার্ধক্যজনিত অসুস্থতার চিকিত্সার জন্য সেদিন থেকেই তাকে প্রিজন সেলে রাখা হয়েছে। এখন যে বিষয়টি দেখা হচ্ছে, ৯১ বছর বয়সী গোলাম আযম নানা রকম বার্ধক্যজনিত রোগে ভুগছেন। অভিযুক্ত গোলাম আযমকে শাস্তি দেয়ার ক্ষেত্রে ট্রাইব্যুনাল এ বিষয়গুলোকে বিবেচনায় এনেছে। এ ধরনের ঘটনা ও পরিস্থিতি বিবেচনা করে তার ট্রাইব্যুনাল শাস্তি কমানোর দয়ালু মনোভাব পোষণ করছে। পরে রায়ের আদেশে বলা হয়, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর থানাধীন বীরগাঁও গ্রামের গোলাম কবীরের ছেলে অভিযুক্ত গোলাম আযমের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের আনা অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন ১৯৭৩ এর ৪ (১), ৪ (২)ধারার অধীনে তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃত্বের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। এ কারণে ১ নম্বর অভিযোগ অপরাধ সংঘটনে ষড়যন্ত্র ও দুই নম্বর পরিকল্পনার অভিযোগে তাকে দোষী সাব্যস্ত করে ২০(২) ধারায় ১০ বছর করে ২০ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করা হচ্ছে। উস্কানির বিষয়ে আনা ৩ নম্বর অভিযোগে তাকে একই আইনের ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে ২০ বছর, অপরাধ সংঘটনে সহযোগিতার বিষয়ে ৪ নম্বর অভিযোগে ২০ বছর ও ৫ নম্বর অভিযোগ সিরু মিয়া ও আরো তিনজনকে হত্যাকাণ্ডে দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় তাকে ৩০ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হচ্ছে। এই পাঁচ অভিযোগে তার মোট কারাদণ্ডের মেয়াদ হলো ৯০ বছর। অভিযুক্ত গোলাম আযম ধারাবাহিকভাবে অথবা আমৃত্যু এ কারাদণ্ড ভোগ করবেন। এ আদেশের কপি ঢাকা জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বরাবর পাঠানোর জন্য বলা হয় যাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃত্বের দায় ও বিচারপতির বক্তব্য: ঊর্ধ্বতন কর্তৃত্বের দায় বেসামরিক নেতাদের ওপরও বর্তায়। কারণ, অধঃস্তন বা প্রকৃত অপরাধীদের ওপর তাঁদের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ থাকে। এটা সামরিক কমান্ডারদের মতোই। এক্ষেত্রে সামরিক কমান্ডারদের মতো অধিনস্তদের উপর ডিসিপ্লিনারি ক্ষমতা ও কমান্ড অবস্থান বেসামরিক ব্যক্তিদেরও থাকবে তা জরুরি নয়। এছাড়া ঊর্ধ্বতন অবস্থান দেখানোর জন্য কোনো আনুষ্ঠানিক চিঠি বা ডকুমেন্টেরও প্রয়োজন নেই। আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনের ৪ এর ২ ধারায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃত্বের অপরাধের বর্ণনা রয়েছে। এতে বলা হয়েছে, কোনো কমান্ডার বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা (সুপিরিয়র অফিসার) যে নির্দেশ দেয়, অনুমতি দেয়, সায় দেয় বা বিনা আপত্তিতে মেনে নেয় অথবা মানবতার বিরুদ্ধে যায়- এমন অপরাধ সংঘটনে অংশ নেয়, অথবা এ ধরনের কোনো অপরাধ সংঘটনের পরিকল্পনায় বা কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত থাকে অথবা শৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে তার যে দায়িত্ব তা পালনে ব্যর্থ হয় বা সম্পাদন করতে না পারে, অথবা তার অধীনে বা থাকা ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণ বা তত্ত্বাবধান করতে ব্যর্থ হয়, ঐ ব্যক্তিরা বা অধীনস্তরা বা তাদের কেউ যদি কোনো ধরনের অপরাধ করে এবং এ ধরনের অপরাধ রোধে যদি কেউ ব্যর্থ হয় তবে সে ঐ অপরাধের জন্য দোষী সাব্যস্ত হবে। এ বিষয়ে রায়ের শুরুতে বক্তব্য রাখেন ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীর। তিনি বলেন, এ মামলার একমাত্র আসামি গোলাম আযম। তিনি সুপরিচিত ব্যক্তি। বিশেষ করে ১৯৭১ সালে তার পরিচিতি ব্যাপকভাবে ছিলো। এটা স্বীকৃত যে, ১৯৭১ সালে তিনি তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের জামায়াতের আমির ছিলেন। শান্তি কমিটির প্রভাবশালী নেতাও ছিলেন। এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষ তার বিরুদ্ধে ৫টি অভিযোগ এনেছে। এ মামলার কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে। কারণ এমন কোনো অভিযোগ আনা হয়নি যে, তিনি ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন বা তার নির্দেশে অপরাধ সংগঠিত হয়েছে। বরং তার বিরুদ্ধে ঊর্ধ্বতন কর্তৃত্বের দায়ের অভিযোগ আনা হয়েছে। তিনি বলেন, এটা স্বীকৃত যে, তিনি ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তানে জামায়াতের আমির ছিলেন। তখন জামায়াতের নেতারা আল বদর, আল শামস, রাজাকারের মতো প্যারা মিলিটারি বা আধা-সামরিক বাহিনী গঠন করে। এসব আধা-সামরিক বাহিনী পাকিস্তানি সেনাদের হত্যা, গণহত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের মতো অপরাধে সহায়তা করেছিলো। এসব বাহিনীর উপর গোলাম আযমের কর্তৃত্ব ছিলো। তার কর্তৃত্ব থাকা সত্ত্বেও তিনি তাদের বাধা দেননি। এমনকি অপরাধ করার জন্য কারো বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেননি। যে কারণে তার দায় রয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন, ১৯৭৩ এর ৪ (২) ধারা অনুযায়ী এসব বাহিনীর অপরাধের দায় গোলাম আযমের ওপর বর্তায়। তার বিরুদ্ধে আনা পাঁচটি অভিযোগের মধ্যে চারটিতেই ঊর্ধ্বতন কর্তৃত্বের দায় রয়েছে। তিনি আরো বলেন, এ মামলার প্রকৃতি অনুযায়ী মৌখিক সাক্ষীর প্রয়োজন নেই। এর জন্য দালিলিক প্রমাণই যথেষ্ট। রাষ্ট্রপক্ষ অভিযোগ প্রমাণে ১৯৭১ ও ১৯৭২ সালে প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদপত্রের কাটিং ও কিছু বই ট্রাইব্যুনালে প্রদর্শন করেছে। কিন্তু পত্রিকার সংবাদ অনেক সময় দ্রুত করার জন্য পূর্ণাঙ্গ তথ্য নাও থাকতে পারে। এ কারণে এসব ঘটনার উপর লেখা বই বা গবেষণা অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য। রাষ্ট্রপক্ষ আরো কিছু বই প্রদর্শন করলে তা বিচারের ক্ষেত্রে সহায়ক হতো। এ কারণে ট্রাইব্যুনাল তার এখতিয়ার অনুযাযী জুডিশিয়াল নোটিসের মাধ্যমে আরো কিছু বই যোগাড় করার চেষ্টা করেছি। তবে সন্তোষজনক তেমন কিছু পাইনি। এতে কিছুটা সময় বেশি লেগেছে। তারপরও ট্রাইব্যুনালে প্রদত্ত তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতেই রায় প্রস্তুত করা হয়েছে। মামলার বিচার প্রক্রিয়া: মানবতাবিরোধী অপরাধ তদন্ত সংস্থা ২০১০ সালের ১ আগস্ট গোলাম আযমের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ২০১১ সালের ১২ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করেন। তবে তা ‘অবিন্যস্ত ও অগোছালো’ উল্লেখ করে ট্রাইব্যুনাল অভিযোগ পুনরায় দাখিলের নির্দেশ দেন। রাষ্ট্রপক্ষ অভিযোগ পুনরায় দাখিল করলে ট্রাইব্যুনাল তা আমলে নিয়ে গত বছরের ১১ জানুয়ারি গোলাম আযমকে হাজির হতে বলেন। সে অনুযায়ী তিনি ট্রাইব্যুনালে হাজির হয়ে জামিনের আবেদন জানালে তা খারিজ করে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। তবে পরে বার্ধক্যজনিত কারণে তাকে বিএসএমএমইউর কারাকক্ষে রাখা হয়। ১৩ মে তার বিরুদ্ধে পাঁচটি অভিযোগ গঠন করেন ট্রাইব্যুনাল। গত বছরের ১০ জুন গোলাম আযমের বিরুদ্ধে সূচনা বক্তব্য (ওপেনিং স্টেটমেন্ট) উপস্থাপন করে রাষ্ট্রপক্ষ। ১ জুলাই থেকে শুরু করে ৪ নভেম্বর পর্যন্ত রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীদের সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা সম্পন্ন হয়। তদন্ত কর্মকর্তা মতিউর রহমানসহ গোলাম আযমের বিরুদ্ধে জব্দ তালিকার ৭ সাক্ষীসহ রাষ্ট্রপক্ষের মোট ১৭ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন। তাদের মধ্যে একজন সাক্ষীর তদন্ত কর্মকর্তার কাছে দেয়া জবানবন্দিকেই সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেছেন ট্রাইব্যুনাল। অন্যদিকে, গোলাম আযমের পক্ষে তার আইনজীবীরা দুই হাজার ৯৩৯ জন সাক্ষীর তালিকা জমা দিয়েছিলেন। এর মধ্যে ১২ জন সাফাই সাক্ষ্য দিতে পারবেন বলে নির্ধারণ করে দেন ট্রাইব্যুনাল। তবে একমাত্র সাফাই সাক্ষী হিসাবে ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেন গোলাম আযমের ছেলে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (বরখাস্তকৃত) আব্দুল্লাহিল আমান আজমী। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৮ মার্চ পর্যন্ত এবং ১৭ এপ্রিল ১১ কার্যদিবসে রাষ্ট্রপক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন চিফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপু, প্রসিকিউটর সৈয়দ হায়দার আলী, ড. তুরিন আফরোজ, জেয়াদ আল মালুম ও সুলতান মাহমুদ সীমন। অন্যদিকে, ১২ কার্যদিবসে যুক্তি উপস্থাপন করেন আসামিপক্ষের আইনজীবীরা। আসামিপক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেন ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক, ইমরান সিদ্দিক, মিজানুল ইসলাম, তাজুল ইসলাম প্রমুখ। ১৭ এপ্রিল মামলাটি রায় ঘোষণার জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয়। কড়া নিরাপত্তা: এদিকে, রায়কে কেন্দ্র করে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। ট্রাইব্যুনালকে কেন্দ্র করে র্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) মোতায়েন ও পুলিশের সদস্য সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি এলিট ফোর্স সোয়াত বাহিনীও মোতায়েন করা হয়। এছাড়াও সাধারণ পোশাকে গোয়েন্দারাও ছিল সক্রিয়। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা স্থাপন করা হয়। গতকাল থেকেই ট্রাইব্যুনালের সবগুলো প্রবেশপথ ও আশপাশের পুরো এলাকায় কয়েক স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়। ট্রাইব্যুনালের মূল প্রবেশপথে অবস্থান নেয় বিজিবি’র সদস্যরা। আর র্যাব ও পুলিশ সদস্যরা অবস্থান নেয় শিশু একাডেমীর সামনে দিয়ে ট্রাইব্যুনালের দ্বিতীয় গেটসহ সংলগ্ন এলাকায়। এছাড়াও শিক্ষা ভবন, কদম ফোয়ারা, পুরোনো হাইকোর্ট ও দোয়েল চত্বরসহ পুরো এলাকায় আইন-শৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা অবস্থান করে। যেন কোনো রকম বিশৃংখলা সৃষ্টি বা আইন-শৃঙ্খলা ভঙ্গ না করতে পারে সেজন্যই এ ব্যবস্থা নেয়া হয় বলে পুলিশ কর্মকর্তারা জানান। ট্রাইব্যুনালে চলমান বিচারিক কার্যক্রম নির্বিঘ্ন ও এর সঙ্গে সংশ্লি¬ষ্টদের সুরক্ষা দেয়ার লক্ষ্যে নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা হয়েছে বলে সংশ্লি¬ষ্টরা জানায়।