বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের অনুপস্থিতিতে গতকাল সোমবার জাতীয় সংসদে বহুল আলোচিত ‘বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) আইন-২০১৩ পাস হয়েছে। স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে অধিবেশন শুরু হলে বিলটি পাস করার প্রস্তাব উত্থাপন করেন শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী রাজিউদ্দিন আহমেদ রাজু। বিলের উপর বিরোধী দলীয় সদস্যরা জনমত যাচাই ও বাছাইয়ের যে প্রস্তাব করেছিলেন তাদের অনুপস্থিতিতে সংসদে উত্থাপিত হয়নি। ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেননের করা জনমত যাচাইয়ের প্রস্তাব মন্ত্রী গ্রহণ করেননি। পরে জাতীয় পার্টির (এ) মুজিবুল হক চুন্নু ও আওয়ামী লীগের জুনায়েদ আহমেদ পলকের ১২টি সংশোধনী প্রস্তাব মন্ত্রী গ্রহণ করেন। এসব সংশোধনীসহ শ্রম আইন ২০০৬ সংশোধনের লক্ষ্যে আনা এই বিলটি কণ্ঠভোটে পাস হয়।
বিল নিয়ে মন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার শ্রমিক বান্ধব বলে শ্রম আইন সংশোধনে বিল আনা হয়েছে। বিলের উপর জনমত যাচাইয়ের কোন প্রয়োজন নেই। কারণ অনেক আলাপ-আলোচনার পর বিলটি আনা হয়েছে। এই আইন হলে শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ হবে। আর যুক্তরাষ্ট্রের সদ্য স্থগিত করা জিএসপি সুবিধা ফিরে পাওয়া সম্ভব হবে।
পাস হওয়া বিলে ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার নিশ্চিত করতে ৪৬ ধারায় নতুন একটি উপ-ধারা যুক্ত করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, সার্বিক কল্যাণের লক্ষ্যে মালিক সংগঠন বা শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন আন্তর্জাতিক সংগঠন বা কনফেডারেশনের কাছ থেকে সহযোগিতা গ্রহণ করতে পারবে। তবে এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের পূর্বানুমতি নিতে হবে। আইনের ৪ ধারায় যুক্ত ১১ নম্বর উপ-ধারায় বলা হয়েছে, কোন প্রতিষ্ঠানে স্থায়ী কাজের জন্য কোন অস্থায়ী অর্থাত্ সাময়িক, দৈনিকভিত্তিক ও চুক্তিভিত্তিক শ্রমিক নিয়োগ করা যাবে না। কোন শ্রমিকের শিক্ষানবিসকাল শেষে বা তিন মাস মেয়াদ বৃদ্ধিশেষে কনফারমেশন লেটার না দেওয়া হলেও তিনি স্থায়ী বলে গণ্য হবেন। আর চিনিকল, চাতাল প্রভৃতি শিল্প ও মওসুমী কারখানায় শ্রমিক নিয়োগের ক্ষেত্রে আগের বছরের নিয়োগকৃত শ্রমিকদের অগ্রাধিকার দিতে হবে।
বিলের ১৪ ধারায় বলা হয়েছে, শ্রমিকের পাওনা পরিশোধ না করে কোন শ্রমিককে তার বাসস্থান থেকে উচ্ছেদ করা যাবে না। তবে বিলের ১৩ ধারায় বলা হয়েছে, কোন শ্রমিক বিনা নোটিশে ১০ দিনের বেশি কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকলে ১০ দিনের সময় দিয়ে তাকে ছাঁটাই করা যাবে। বিলের ২৭ ধারায় বলা হয়েছে, পাঁচ হাজারের বেশি শ্রমিক চাকরি করেন এমন প্রতিষ্ঠানে স্থায়ী স্বাস্থ্যকেন্দর বেশি শ্রমিক আছেন এমন কারখানায় ‘সেফটি কমিটি’ থাকতে হবে। নিয়মিত অগ্নিনির্বাপণ মহড়া দিতে হবে। কারখানায় আবাসনের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধীদের অগ্রাধিকার দিতে হবে। কোন প্রতিষ্ঠানে ন্যূনতম ১০০ স্থায়ী শ্রমিক থাকলে সেখানে গ্রুপ বীমা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। শ্রমিকদের জন্য কল্যাণ তহবিল গঠনের বিধান রাখা হয়েছে।
বিলের উদ্দেশ্য ও কারণসম্বলিত বিবৃতিতে মন্ত্রী বলেন, সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে শ্রম আইনকে যুগোপযোগী বিশেষ করে পেশাগত স্বাস্থ্য ও সেফিট নিশ্চিত, ট্রেড ইউনিয়ন গঠন প্রক্রিয়া সহজ, মালিক ও শ্রমিকের সম্পর্ক উন্নয়ন এবং শ্রমিকদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির লক্ষ্যে শ্রম আইন-২০০৬ সংশোধন করা প্রয়োজন। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইস্তেহারে এই প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। গত ৫ জুন জাতীয় সংসদে বিলটি উত্থাপন করা হয়। পরে তা অধিকতর পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়। কমিটি সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থা ও সংগঠনের প্রতিনিধির মতামত নিয়ে বেশ কিছু সংশোধনীসহ বিলটি পাসের সুপারিশ করে।
