সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন

কোন জোট লাভবান হলো?

আপডেট : ১৬ জুলাই ২০১৩, ২১:২৯
সব জল্পনা-কল্পনার অবসন ঘটিয়ে সবচেয়ে আলোচিত গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনেও বিএনপি জয়লাভ করলো। সরকারি দল বিরোধী দলের খেলায় ৫-০ তে জয়-পরাজয় হলো। হোয়াইটওয়াশ হয়ে উড়ে গেলো আওয়ামী লীগ অর্থাত্ ১৪ দলীয় জোট। মহাআনন্দে ট্রফি তুলো নিলো বিএনপি অর্থাত্ ১৮ দলীয় জোট। কিন্তু নির্বাচনে লাভ-লোকসান হলো কার? দেশের রাজনীতিতে বামপন্থী-ডানপন্থী দুই শক্তিই লাভ খোঁজার চেষ্টা করছে। আসলে লাভ হয়েছে দুই শিবিরেই। বিএনপি ট্রফি নিয়ে আর আওয়ামী লীগ খালি হতে ফিরেও লাভবান হয়েছে। দেশে নির্বাচন হবে কিনা, কীভাবে হবে, কবে হবে তা নিয়ে সংশয় সৃষ্টি হয়েছে। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী এনে বর্তমান সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা তুলে দিয়েছে। এক দাবি দিয়ে আন্দোলন করে যাচ্ছে ১৮ দলীয় জোট। এ জোটের শীর্ষ নেত্রী তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ছাড়া নির্বাচনে যাবেন না—নির্বাচন হবে না বলে বিভিন্ন সভা-সমাবেশে বক্তব্য দিচ্ছেন। অথচ তাঁরাই একদিন এ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার বিপক্ষে অবস্থা নিয়েছিলেন। আর আওয়ামী লীগ সে দিন আন্দোলন করে এ সরকারব্যবস্থা প্রবর্তন করেছিল। তাই রাজনীতিতে শেষ কথা নেই বলে স্বার্থ আদায়ে আজ হচ্ছে উলটো। বর্তমান সরকারের সময়ে সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন শুরু হয় নারায়ণগঞ্জ দিয়ে। আওয়ামী লীগের স্থানীয় প্রভাবশালী দুই নেতা ও বিএনপির এক নেতা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। বিএনপি যেহেতু তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ছাড়া নির্বাচনে অংশ নেবে না তাই নির্বাচনের রাতে বিএনপির প্রার্থী দলের শীর্ষ নেতার নির্দেশে নাটকীয়ভাবে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেন। আর আওয়ামী লীগের ফাঁকা মাঠেও দলের বিদ্রোহী প্রার্থী গোল দেন। লাখ লাখ টাকা খরচ করেও বিএনপি প্রার্থীতা প্রত্যাহার করে লাভবান হয়েছিল জাতীয়ভাবে। তেমনি উপনির্বাচনে, কুমিল্লা সিটি নির্বাচনে অংশ না নিয়ে তত্ত্বাবধায়কের দাবিটি জোরালো হচ্ছিল। তবে নারায়ণগঞ্জের ঐ নেতাকে বলির পাঁঠা করে এখন কেন দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশ নিলো বিএনপি? এমন কী হলো যে তত্ত্বাবধায়ক ইস্যু বাদ দিয়ে বিএনপি নির্বাচনে গেলো? কোথা থেকে সিগনাল পেয়ে ৫টি নির্বাচনে অংশ নিলো? তবে কি এ জোটটি তাদের দাবি থেকে সরে এসেছে? আসলে তারা নির্বাচনে গিয়ে উপরেরটাও খাচ্ছে তলারটাও কুড়াচ্ছে। দুই দিকেই লাভবান হয়েছে। নির্বাচনে জিতে বলা হচ্ছে মানুষ সরকারের প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করেছে আর পরাজিত হলে কারচুপির অভিযোগ এনে আরো বেশি আন্দোলন করতো। তখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি আরো জোরালো হতো। এখন ধীরে ধীরে দাবিটি গ্রহণযোগ্যতা হারাচ্ছে। তারাও বুঝতে পেরেছে গণজোয়ার সৃষ্টি হলে সরকারের কিছুই করার থাকে না। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে হেরে গিয়েও লাভবান হয়েছে। দলটির শীর্ষ নেতারা বার বার বলে এসেছেন দলীয় সরকারের অধীনেও দেশে দেশে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেসব দেশে শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন আছে, আইনের শাসন আছে। আমাদের দেশেও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন ও মিডিয়া আছে। আইনের শাসন আছে। ফলে ৫টি নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। উত্সবমুখর পরিবেশে ভোটাররা ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। নির্বাচনে পরাজিত হয়েছে ১৪ দলের প্রার্থীরা। তবে বৃহত্ অর্থে নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হওয়ার দিক থেকে লাভবান হয়েছে সরকার। তারা হালে পানি পেয়েছে। বিএনপির এক তরফা আন্দোলন এখন অনেকটাই ফিকে হয়ে এসেছে। সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন স্থানীয় হলেও সেখানে জাতীয় নির্বাচনের ছোঁয়া লেগেছে। দুই শিবিরের প্রার্থীর পক্ষে দলের সিনিয়র নেতারা গিয়ে প্রচারণায় অংশ নেন। দুই দলের প্রচারণা দেখে মনে হয়েছে নির্বাচনটা ডু-অর-ডাই। নির্বাচনে যে জাতীয় বিষয়টি প্রাধান্য পেয়েছে—এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। নির্বাচনে অন্তত ৬৫ ভাগ ভোটার তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। সবকিছু ছাপিয়ে নির্বাচন হয়ে ওঠে জাতীয় নির্বাচনের ছায়া নির্বাচন। নব নির্বাচিত মেয়রদের ব্যক্তি ইমেজ ছাড়িয়ে নির্বাচনের ফলাফলে সরকারের প্রতি মানুষের অনাস্থা প্রকাশ পেয়েছে। মানুষ প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে এ নির্বাচন দেখেছে। সামপ্রতিক সময়ের কিছু ঘটনা ভালোভাবে নেয়নি সাধারণ মানুষ। এ প্রসঙ্গে পদ্মা সেতুর দুর্নীতির ষড়যন্ত্র, হলমার্কের অর্থ লোপাট, শেয়ারবাজার ধস, ছাত্রলীগ-যুবলীগের কর্মকাণ্ড প্রভৃতির উদাহরণ দেওয়া যায়। কোনো ব্যক্তি অপরাধ করলে তার শাস্তি দেবে আইন-আদালত, তার জন্য মিছিল সংগ্রাম করার প্রয়োজন হয় না। মিছিল-সংগ্রাম করার অর্থ হলো আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল না থাকা এবং আইন না মানা। গ্রামের মানুষ মারা গেলে গ্রামের সকলে শাসকের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করবে—এটাই গ্রামের নীতি। সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনের জয়-পরাজয় নিয়ে হিসাব-নিকেশ করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে যে আগামীতে কাদের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনে দুই পক্ষই লাভবান হতে চাইবে। যা হোক ক্ষমতা নামক চেয়ারটিকে নিয়ে আরো রক্ত ঝরতে পারে বাংলা মায়ের কোলে। ঢাকা