ঘরের একটি দেয়াল অনেকদিন আগেই ভেঙে গেছে। এখন তা পলিথিন দিয়ে কোনো মতে ঠেক দেওয়া হয়েছে। টাকার অভাবে সেটা আর মেরামত করা সম্ভব হয়নি। খেজুর পাতার পাটি বিছানো স্যাঁতস্যাঁতে মেঝের এ ঘরে আনমনা হয়ে বসে আছে ষোড়শী কাজলি। পাশেই মা দুল্লা শুয়ে আছে শয্যাশায়ী হয়ে। রক্তশূন্যতার রোগী দুল্লাকে চিকিত্সা করানোর মতো নেই পর্যাপ্ত অর্থ। চুয়াল্লিশ বছরের এ মহিলার শরীর এখন কেবলই হাড্ডিসার। এ ঘরেই থাকে কাজলি, তার মা দুল্লা আর বড় ভাই কল্প। ২২ বছরের কল্পই এ পরিবারটির একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। কল্পর মাসিক আয় মাত্র ৯শ টাকা। রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনে পরিচ্ছন্নতা কর্মী হিসেবে কাজ করেন। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এ বাজারে মাসিক নয়শ টাকার বেতনে মায়ের চিকিত্সার খরচ জোগানো তো দূরের কথা, ঠিকমতো দু’বেলা দু’মুঠো খাবারও সংগ্রহ করতে পারেন না কল্প। রাজশাহীর হেতেম খাঁ এলাকায় অবস্থিত হরিজন (সুইপার) পল্লির কাজলি বা কল্পদের পরিবারের চিত্র এটি। তবে এ চিত্র কেবল কাজলি বা কল্পদের পরিবারের নয়, এখানকার প্রায় সাড়ে তিনশ পরিবারের বেশিরভাগ পরিবারেরই চিত্র এরূপ।
প্রায় তিন একর এলাকা জুড়ে অবস্থিত এ পল্লির ভেতরে রয়েছে একটি পুকুর। পল্লির ভেতরে চার জায়গায় স্থাপিত টয়লেটগুলোর লাইন ও আশেপাশের এলাকার ড্রেনগুলোর মুখগুলো নামিয়ে দেওয়া হয়েছে এ পুকুরে। পুকুরের পানিতে কুচুরিপানা ও বর্জ্য পদার্থ মিলেমিশে এমন অবস্থা দাঁড়িয়েছে, যা দেখলে যে কোনো মানুষেরই গা ঘিনঘিন করার কথা। অথচ এ পুকুরের পানিতেই গোসল, জামা-কাপড়, বাসন-কোসন পরিষ্কারের কাজ চলে হরিজনদের। আর এ কারণে চর্মরোগসহ নানা ধরনের রোগব্যাধি এ পল্লির বাসিন্দাদের কাছে ভাগ্যদেবীর নৈমিত্তিক ‘আশীর্বাদে’ পরিণত হয়েছে।
এ পল্লিতে রয়েছে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ছেলেমেয়েকে লেখাপড়া করানোর ইচ্ছা থাকলেও দারিদ্র্যের কাছে শেষ পর্যন্ত পরাজিত হতে হয় তাঁদের। তখন বাধ্য হয়েই স্কুলে পাঠানোর পরিবর্তে সুইপারি পেশাতে ছেলেমেয়েদেরকে ঠেলে দিতে বাধ্য হন হরিজন বাবা-মা।
হরিজনদের মেলে না কোনো ছুটি। এমনকি গর্ভবতী মহিলারাও কোনো ধরনের ছুটি পান না। সন্তান প্রসব করার আগের দিন পর্যন্ত তাঁদের কাজ করতে হয়। বাচ্চা হওয়ার পরও বদলি অন্য কাউকে দিয়ে কাজ করতে হয়। কারণ একদিন কামাই দিলেই যায় বেতন কাটা। এ পল্লির আবাসন সমস্যার কথা বলতে গিয়ে বিক্ষুব্ধ কণ্ঠে কমেলা জানান, “একই ঘরমে (ঘরে) মাহা (মা)-ছেইলে (ছেলে), মেয়ে-বাপ, ছেইলের বহউ (বউ), মেয়ের জামাই থাইকলে ইজ্জত কাহামে (কোথায়) থাকে?”
হরিজন পল্লির বাসিন্দারা সকলেই হিন্দু সমপ্রদায়ের। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালনের জন্য এখানে রয়েছে একটি মন্দির। পল্লিবাসীর অভিযোগ—ধর্মীয়কাজ ভালোভাবে সম্পন্ন করার জন্য কিংবা মন্দিরটি সংস্কার করার জন্য কেউই কখনো কোনো বরাদ্দ দেয় না। মাদক গ্রহণের বদ অভ্যাস এদের উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া। সর্বনাশা মাদক হরিজন সংস্কৃতিরই একটা অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে, মাদক আর হরিজন যেন একই সুতায় গাঁথা। একজন হরিজন যা আয় করেন তার বেশিরভাগই ব্যয় করেন মাদকের পেছনে। আত্মবিধ্বংসী এ পথ থেকে তাঁদেরকে ফেরানোর কোনো উদ্যোগও কেউ নিতে আসে না।
‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই’—কবির এ কথাটি যেন এ পল্লিবাসীর বেলায় প্রযোজ্য নয়। কারণ এ পল্লির বাসিন্দারা স্বাভাবিকভাবে মিশতে পারেন না সমাজের অন্য শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে। বাজার করতে গিয়েও দোকানের কোনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। আর নাম-পরিচয় জানার পর কোনো হোটেল মালিকই খাবার বিক্রি করতে চান না এদের কাছে। সুইপারের ঘরে জন্মানোর ‘অপরাধে’ সেই ব্রিটিশ শাসনামল থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত এ সমাজ হরিজনদেরকে ভিন্ন জাতের মানুষ হিসেবেই শনাক্ত করে আসছি। এ সমাজের চারপাশ তাঁরা ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করতে সক্ষম হলেও মানুষের মন-মানসিকতাকে আজ পর্যন্ত পরিষ্কার করতে সক্ষম হননি।
ভবিষ্যত্ নিয়ে ওদের কোনো স্বপ্ন নেই। নেই জীবন নিয়ে কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষাও। পূর্ব পুরুষের সুইপারি পেশাকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়াটাই যেন তাঁদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি, বড় প্রত্যাশা। ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ উপন্যাসের কেতুপুর গ্রামের জেলে পল্লির মতো এ পল্লিতেও জন্মের অভ্যর্থনা গম্ভীর ও নিরুত্সব। আর জীবনের স্বাদও এখানে শুধু ক্ষুধা-পিপাসায়, কাম-মমতায় এবং স্বার্থ ও সংকীর্ণতায়। চিরাচরিত সুইপারি পেশাতে যা আয় হয়, তা দিয়ে দারিদ্র্য না ঘুচলেও দিন কেটে যায় এদের। এর চেয়ে বেশি যেন চাওয়া-পাওয়া নেই হরিজনদের। আর এভাবেই যুগের পর যুগ যে আঁধারে হরিজনদের জীবনের সূত্রপাত, সেই আঁধারেই শেষ হয় তাঁদের জীবন।
এ পল্লির বাইরেই বসবাসকারী ‘সভ্য’ নাগরিকেরা নানা সুযোগ-সুবিধা ভোগ করলেও পল্লি বাসিন্দারা এসব সুযোগ-সুবিধা থেকে প্রায় পুরোপুরিই বঞ্চিত। হরিজন পল্লি ও হরিজনপল্লির বাইরের এসব চিত্র দেখার পর অনেকের মনের মাঝে যেন উঁকি দিতে থাকে ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ উপন্যাসের সেই বিখ্যাত উক্তি, ‘ঈশ্বর থাকেন ওই গ্রামে ভদ্র পল্লিতে, এখানে তাহাকে খুঁজিয়া পাওয়া যাইবে না’।
ঢাকা
