মুজাহিদের বিরুদ্ধে সাত অভিযোগ

আপডেট : ১৬ জুলাই ২০১৩, ২২:৩৮
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের আনা একাত্তরে সংঘটিত মানবতা বিরোধী অপরাধের সাতটি অভিযোগে বিচার হচ্ছে। গত বছরের ২১ জুন মুজাহিদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ৭টি অভিযোগ গঠন করে ট্রাইব্যুনাল। এ সাতটি অভিযোগের মধ্যে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে মুজাহিদের সংশ্লিষ্টতারও অভিযোগ রয়েছে। মুজাহিদের বিরুদ্ধে ২০১১ সালের ১১ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপক্ষ প্রথম আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র দাখিল করে। ট্রাইব্যুনাল তা ফেরত দিয়ে অভিযোগগুলো সুবিন্যস্ত করে পুনরায় দাখিল করতে বললে ২০১২ সালের ১৬ জানুয়ারি আবারো অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। ২৬ জানুয়ারি অভিযোগ আমলে নেয় ট্রাইব্যুনাল। ঐ বছরের ২৫ এপ্রিল এ মামলা ট্রাইব্যুনাল-১ থেকে ট্রাইব্যুনাল-২ এ স্থানান্তর করা হয়। এ ট্রাইব্যুনালে নতুন করে অভিযোগের বিষয়ে শুনানি হয়। প্রথম অভিযোগে বলা হয়, দৈনিক ইত্তেফাকের তত্কালীন নির্বাহী সম্পাদক সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেনকে একাত্তরের ১০ ডিসেম্বর রাত তিনটার দিকে মুখঢাকা সাত-আটজন যুবক চামেলীবাগের ভাড়া বাসা থেকে তুলে নিয়ে যায়। ঘটনার বিবরণীতে বলা হয়, সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেন মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তাঁর লেখা ‘ঠগ বাছিতে গা উজাড়’ শিরোনামে একটি প্রবন্ধে পাকিস্তানি সেনাদের এদেশীয় সহযোগীদের হাতে নিরস্ত্র সাধারণ মানুষের নিগ্রহের বিবরণ তুলে ধরেন। এ প্রবন্ধের বিরোধিতা করে ৭১’র ১৬ সেপ্টেম্বর জামায়াতের মুখপত্র ‘সংগ্রাম’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘অতএব ঠক বাছিও না’ একটি প্রবন্ধে তাকে ‘ভারতের দালাল’ উল্লে¬খ করে সমালোচনা করা হয়। এরপর সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেন জামায়াত ও আলবদরের লক্ষ্যে পরিণত হন। দ্বিতীয় অভিযোগে বলা হয়, একাত্তরের মে মাসের মাঝামাঝি মুজাহিদসহ কয়েকজন অবাঙালি ও পাকিস্তানি সেনারা ফরিদপুরের তিনটি হিন্দু-অধ্যুষিত গ্রাম বৈদ্যডাঙ্গি, মাঝিডাঙ্গি ও বালাডাঙ্গিতে হামলা চালায়। ওই হামলায় ৫০ থেকে ৬০ জন হিন্দু নিহত হন। তাদের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়। তৃতীয় অভিযোগ হল, ১৯৭১ সালের জুনের প্রথম সপ্তাহে রাজাকাররা ফরিদপুরের রথখোলা গ্রামের রনজিত্ নাথ ওরফে বাবু নাথকে খাবাসপুর মসজিদের কাছ থেকে ধরে পুরাতন সার্কিট হাউসে নিয়ে যায়। সেখানে উপস্থিত মুজাহিদের ইঙ্গিতে রাজাকার ও অবাঙালিরা তাকে হত্যার উদ্দেশে বিহারি ক্যাম্পের পূর্ব দিকে জনৈক আবদুর রশিদের বাড়িতে নিয়ে আটকে নির্যাতন করে। রাতে রনজিত্ পালাতে সক্ষম হন। চতুর্থ অভিযোগে রয়েছে, ২৬ জুলাই সকালে গোয়ালচামট খোদাবক্সপুর গ্রামের জনৈক মো. আবু ইউসুফ ওরফে পাখিকে মুক্তিযোদ্ধা সন্দেহে রাজাকাররা অপহরণ করে ফরিদপুর স্টেডিয়ামে পাকিস্তানি সেনাদের ক্যাম্পে নিয়ে যায়। বেলা ১১টার দিকে মুজাহিদ সেখানে গিয়ে এক পাকিস্তানি মেজরকে কিছু বললে ইউসুফের ওপর ব্যাপক নির্যাতন শুরু হয়। তিনি সেখানে এক মাস তিন দিন আটক থেকে নির্যাতনের শিকার হন। একপর্যায়ে তাকে যশোর সেনানিবাসে স্থানান্তর করা হয়। নির্যাতনের ফলে আবু ইউসুফ পাখির বুকের ও পিঠের হাড় ভেঙ্গে যায়। পঞ্চম অভিযোগে বলা হয়েছে, ৩০ আগস্ট রাত আটটার দিকে পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসংঘের সেক্রেটারি মুজাহিদ ছাত্রসংঘের সভাপতি মতিউর রহমান নিজামীসহ ঢাকার নাখালপাড়ার পুরনো এমপি হোস্টেলের পাক-আর্মি ক্যাম্পে যান। সেখানে আটক সুরকার আলতাফ মাহমুদ, জহির উদ্দিন জালাল, বদি, রুমি, জুয়েল, আজাদকে দেখে তারা গালিগালাজ করেন। মুজাহিদ একজন পাকিস্তানি ক্যাপ্টেনকে বলেন, রাষ্ট্রপতির সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার আগে এদের মেরে ফেলতে হবে। পরে তাদের অমানবিক নির্যাতন করে হত্যা করেন। তাদের কারো মরদেহ আর পাওয়া যায়নি। ষষ্ঠ অভিযোগে বলা হয়েছে, মোহাম্মদপুরের ফিজিক্যাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে (বর্তমানে শারীরিক শিক্ষা কলেজ) পাকিস্তানি সেনাদের ক্যাম্পে মুজাহিদ দলীয় নেতাদের নিয়ে বাঙালি নিধনের পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্র করতেন। ওই ষড়যন্ত্রের ধারাবাহিকতায় ১০ ডিসেম্বর থেকে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড শুরু হয়। সপ্তম অভিযোগে বলা হয়েছে, ১৩ মে বেলা দুইটা থেকে আড়াইটার মধ্যে রাজাকার কালু বিহারি, ওহাব, জালাল ও অন্যদের সঙ্গে মুজাহিদ গাড়ি (জীপ) করে ফরিদপুরের কোতোয়ালী থানার খলিলপুর বাজারে শান্তি কমিটির কার্যালয়ে যান। সেখানে সভার পর মুজাহিদ সঙ্গীদের নিয়ে হিন্দু-অধ্যুষিত বাকচর গ্রামে হামলা চালান। মুজাহিদের নির্দেশে কয়েকজনকে হত্যা করা হয়।