আগামী নির্বাচনে প্রশ্নবিদ্ধ কাউকে মনোনয়ন দেবে না আওয়ামী লীগ

আপডেট : ১৬ জুলাই ২০১৩, ২২:৫৬
প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা দলীয় এমপিদের প্রতি কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, তৃণমূলের নেতাকর্মীদের কাছ থেকে দূরে থাকা, জনবিচ্ছিন্ন এবং প্রশ্নবিদ্ধ কাউকেই আগামী নির্বাচনে মনোনয়ন দেয়া হবে না। তৃণমূল নেতাদের মতামতের ভিত্তিতেই দেয়া হবে মনোনয়ন। তাই এখনও সময় আছে এলাকার নেতাকর্মী ও সমর্থকদের সঙ্গে যেসব এমপির দূরত্ব রয়েছে তা মিটিয়ে ফেলুন। উপজেলা পর্যায়ের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকসহ তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে বৈঠক ও মতামত নিয়েই আগামীতে মনোনয়ন দেয়া হবে বলেও জানান তিনি। গতকাল মঙ্গলবার বিকালে গণভবনে আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের রুদ্ধদ্বার বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী এসব হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন বলে বৈঠক সূত্র নিশ্চিত করেছে। দলের এমপিদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, বর্তমানে যারা সংসদ সদস্য রয়েছেন, তারা আগামী নির্বাচনেও মনোনয়ন পাবেন- এটা মনে করলে ভুল করবেন। সবার আমলনামা আমার হাতে রয়েছে। তাই নিজ নিজ এলাকায় যোগাযোগ বৃদ্ধি করুন। সরকারের ব্যাপক উন্নয়ন ও সফলতাগুলো জোরালোভাবে জনগণের সামনে তুলে ধরুন। পাশাপাশি বিএনপি-জামায়াত জোটের বল্গাহীন দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও অপকর্মগুলো ফলাও করে ভোটারদের সামনে তুলে ধরুন। আমি তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করছি। শীঘ্রই উপজেলা পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গেও বৈঠক করবো। বিগত সময়ে সকল মন্ত্রী-এমপির আমলনামা বিচার-বিশ্লেষণ ও তৃণমূলের মতামত নিয়েই মনোনয়ন দেয়া হবে। বৈঠকে সদ্য সমাপ্ত পাঁচ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে পরাজয়ের কারণ বিশ্লেষণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সিটি করপোরেশন এলাকার দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে স্বতঃস্ফূর্ততার অভাব ছিল। মেয়র প্রার্থীর পক্ষে ঐক্যবদ্ধভাবে না নেমে নিজ নিজ কাউন্সিলরদের নিয়েই বেশি ব্যস্ত ছিলেন। যেসব মন্ত্রী-এমপি এলাকার নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন না বা দূরত্ব সৃষ্টি করে চলছেন, সিটি নির্বাচন তাদের জন্যও একটি সতর্কবার্তা বলেও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী ছাড়াও দলের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, আবুল কাশেম মাস্টারসহ বেশ ক’জন সংসদ সদস্য বক্তব্য রাখেন। তাদের সবাই পাঁচ সিটি নির্বাচন অর্থাত্ স্থানীয় সরকার নির্বাচনে পরাজয়ে হতাশ না হয়ে অলসতা কাটিয়ে জনগণের কাছে ভোট চাওয়ার কথা বলেন। বৈঠকে সৈয়দ আশরাফ অলসতা কাটিয়ে সংসদ সদস্যদের দ্রুত তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধি করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, যাদের তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে দ্রুত তা মিটিয়ে ফেলুন। আর স্থানীয় নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে হতাশার কিছু নেই। সাড়ে চার বছরে আমরা দেশের যে উন্নয়ন করেছি, জনগণ অবশ্যই আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়ে বিজয়ী করবে। দলের মুখপাত্র পরিবর্তনের দাবি করেছেন সংসদ সদস্যরা সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রীর সামনে দলীয় সংসদ সদস্য আওয়ামী লীগের মুখপাত্র পরিবর্তনের দাবি তোলেন। সংসদ সদস্য খুলনার সোহরাব আলী ছানা ও চট্টগ্রামের শামসুল হক চৌধুরী এ দাবি তোলেন। দলের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বক্তৃতা দিতে গেলে এই প্রথম বৈঠক স্থলে শোরগোল সৃষ্টি হয়। সৈয়দ আশরাফ তার বক্তৃতায় দলের সংসদ সদস্যরা অলস বলে মন্তব্য করলে সংসদ সদস্যরা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করতে থাকেন, সংসদ সদস্যরা অলস নয়, আপনিই (আশরাফ) অলস। পরে শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের দলের যেসব সংসদ সদস্য নেতাকর্মী বিচ্ছিন্ন- এরা বিজয়ী হবে না। তারা মনোনয়নও পাবে না। এ সময় তিনি বলেন, সদ্য সমাপ্ত সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীরা আমাকে ফোন করে জানিয়েছেন আমরা বিশ/ত্রিশ হাজার ভোটে বিজয়ী হবো। আমি তখন তাদের বলেছিলাম, নির্বাচনের আগে বিজয়ী হবো এমন আশাবাদ থাকলে তোমরা কেউ জিতবে না। পরে তাই হয়েছে। সূত্র জানায়, বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী দলের সিনিয়র নেতাদের উদ্দেশ্য করে বলেন, দলকে তো আমরাই ডুবিয়েছি। দলের বড় বড় নেতারা সংসদে দাঁড়িয়ে যেভাবে মন্ত্রীদের সমালোচনা করেন, বিরোধী দলের নেতারাও এমন সমালোচনা করেন না। বিরোধী দল যতটা না আওয়ামী লীগ ও সরকারের ক্ষতি করেছে, তার চেয়ে বেশি ক্ষতি করেছেন আমাদের দলের নেতারা। এরআগে চট্টগ্রামের সংসদ সদস্য আবুল কাশেম ও ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন চট্টগ্রামের রাজনৈতিক অবস্থা তুলে ধরে বক্তৃতা করেন। এরপর সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফজিলাতুন্নেসা ইন্দিরা কথা বলতে চাইলে শেখ হাসিনা বলেন, তোমার কোনো ভোট নাই তোমার কথা বলতে হবে না বলে তাকে বসিয়ে দেন। বক্তব্যে অধিকাংশ সংসদ সদস্যই হতাশার কথাই শোনালেন। তারা বললেন, যত কথাই বলেন সারাদেশে সাংগঠনিক অবস্থা চরম খারাপ। দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল সারাদেশে চরম আকার ধারণ করেছে। এ অবস্থা বিরাজ করলে আগামীতে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের জয়লাভ করা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। এসময় অপপ্রচারে বিএনপি-জামায়াত এগিয়ে দাবি করে শেখ হাসিনা তাদের সমালোচনার জন্যে দলের নেতাকর্মীদের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে নির্দেশ দেন। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে, ঈদের পর তৃণমূলের সাথে ধারাবাহিক বৈঠক শুরু করা হবে। জেলা নেতাদের ডেকে এনে ১০টি করে প্রশ্ন দেয়া হবে। সে প্রশ্নের উত্তরের ওপর নির্ভর করেই দলীয় প্রার্থী ঠিক করা হবে।